ধর্মতলার এক পুরোনো গির্জা ও একজন ব্রিটিশ চিত্রকরের গল্প

সারাদিনের ব্যস্ত রাস্তা। লোকজন ভিড় ঠেলাঠেলি। দু-পাশে চিলতে ফুটপাথ। তাতে নতুন পোশাকে পুরোনো দোকান। অটো বাস গাড়ির সম্মিলিত হর্ন। আমাদের লেনিন সরণি। তবে হ্যাঁ, শুধু এটুকুতে লেনিন সরণি আটকে নেই। আছে মাথাতোলা ইতিহাস। সারিসারি পুরোনো বাড়ি। তাদের খড়খড়ি দেওয়া জানলার দৃষ্টিপথ। আজও সেখানে একশো বছর আগেকার সময়। আছে টিপু সুলতান মসজিদ, আছে প্রাচীন লোরেটো স্কুল। আর আছে একটি গির্জা – চার্চ অব সেক্রেড হার্ট অব জিসাস।
ধুরামতোল্লা থেকে ধর্মতলা। একটি মসজিদের নামেই নাকি এই অঞ্চলের এমন নাম। আর ৩ নম্বর ধর্মতলা স্ট্রিটে দাঁড়িয়ে আছে চার্চ অব সেক্রেড হার্ট অব জিসাস। প্রায় দু’শো বছর ছুঁতে চলা এই গির্জাটির অপূর্ব নির্মাণ আজও নির্বাক করে দেয়। ১৮৩৪ সালে ইস্টার স্যাটার ডে-তে গির্জাটিকে উৎসর্গ করা হয়েছিল ঈশ্বরের কাছে। গির্জাটি তৈরি হয়েছিল এক বিশেষ মানতের কারণে। শোনা যায়, ডোনা পাসকোয়া ব্যারেটো ডি’সুজা নামে এক ব্যক্তির ছোটো ছেলের একবার কারাদণ্ড হয়েছিল। খুনের দায়ে বেশ কঠিন সাজা পেয়েছিল সে। কিন্তু হাজতে থাকতে থাকতে তার মানসিক নানান অসুস্থতা শুরু হয়। সে কারণে ছাড়া পেয়ে যায় তাড়াতাড়ি। তার মা মানত অনুযায়ী তাই এই চার্চটি নির্মাণ করেন। পর্তুগালের সম্রাট নাকি গির্জাটির পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। পরে ১৮৪৩ সালে সেটি ভ্যাটিকানের অধীনস্থ হয়। সাহেব পাড়ায় তৈরি হলেও গির্জাটিতে প্রচুর পরিমাণ বাঙালির আনাগোনা ছিল। তার মধ্যে যারা গির্জারই কর্মচারী ছিলেন, অনেক ভোরবেলায় তাদের জন্যে আলাদা করে প্রার্থনার ব্যবস্থা থাকত।
কলকাতা শহরে গির্জার অভাব নেই। কিছু গির্জাকে ঘিরে লোকজনের আবেগও বেশ। তুলনায় চার্চ অব সেক্রেড হার্ট অব জিসাস-এ নিরিবিলি বেশি। বাইরের হট্টগোল পেরিয়ে ভিতরে ঢুকলেই ডানা-মেলা অতীত স্বাগত জানায়। তবে গির্জাটিকে বিশেষভাবে মনে করিয়ে দেয় একটি ছবি। স্যার চার্লস ডি’অলি এঁকেছিলেন এই গির্জাসহ ধর্মতলার রাস্তা। রাস্তায় ঘোড়ার গাড়িতে ইউরোপীয় মানুষ, পথচলতি সাধারণ মানুষ, ফেরিওয়ালা। আর আকাশছোঁয়া গির্জার চূড়া। গ্রাম কলকাতার শহর হয়ে ওঠার ছবি। কলকাতার ইতিহাস শুধু খাতায়-কলমে লেখা হয়নি। ছবিতে জলরঙে বা রেখায় রেখায় পুরোনো কলকাতা গাঁথা হয়ে আছে।
বেঙ্গল সিভিল সার্ভিসের সদস্য স্যার চার্লস ডি’অলি জন্মেছিলেন মুর্শিদাবাদে। সম্ভ্রান্ত পরিবার তাদের। ঢাকা কলকাতা পাটনায় দীর্ঘদিন কাটিয়েছিলেন। ছিলেন অ্যামেচার আর্টিস্ট। ঢাকাতে মুঘল সাম্রাজ্যের নানান ভগ্নাবশেষের ছবি এঁকেছিলেন। আর এঁকেছিলেন শহর কলকাতার ছবি। ১৮৪৮ সালে প্রকাশিত হয়েছিল ‘ভিউজ অব ক্যালকাটা এন্ড ইটস এনভিরন্স’ – লিথোগ্রাফের রঙিন অ্যালবাম। সেখানে আজকের লেনিন সরণির এই দৃশ্যসহ ক্লাইব হাউজের সামনের রাস্তা ও আরো নানান দৃশ্যাবলি ছিল। পাটনাতে তাঁর নিজস্ব লিথোগ্রাফিক প্রেস ছিল। কলকাতার নগরায়নের প্রথম যুগের সেসব ছবি এক অমূল্য সম্পদ। চার্চ অব সেক্রেড হার্ট অব জিসাসের কথায় বারবারই ঝিলিক দিয়ে যায় চার্লস সাহেবের সেই ছবিটি। আজকের ঘিঞ্জি রাস্তায় যে গির্জাটি নজর এড়িয়ে যায়, তাকে তার স্বমহিমায় দেখতে হলে আজ সেই ছবিটাই একটা বড়ো মাধ্যম। কী ছিল আর কী হইয়াছে-এর রঙিন ডক্যুমেন্টেশন।
ছবিসূত্র - ফেসবুক (Sacred Heart Church, Dharamtala, Kolkata)