No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    বেনারসি পানবাহারেই কলকাতার নতুন অতিথি— চকোলেটি পান

    বেনারসি পানবাহারেই কলকাতার নতুন অতিথি— চকোলেটি পান

    Story image

    পান বাদ দিলে কলকাতার থুড়ি বাঙালির ইতিহাসে বারো আনাই ফাঁকি পড়ে যাবে। না না, পান বলতে তরল কোনো পদার্থের দিকে ইঙ্গিত করছি না। সে তো ছিলই। এ পান ঠোঁট রাঙানোর, জর্দা, খয়ের, সুপুরি সহযোগে তৃপ্তিতে চিবোনোর জিনিস। সেই পানের মশলার কত্ত বাহার, কত্ত গপ্প। গপ্পের শেষ নেই পানের, জর্দার, মশলার কিংবা সুপুরি কাটার জাঁতি ঘিরেও। শৌখিন বাঙালির পান-চর্চা নিয়ে বিরাট গবেষণা হতে পারে। তবে, শুধু কলকাতাবাসীর কথাই বলি কেন? গোটা বাংলাদেশ, বিহার, উত্তরপ্রদেশও পান ছাড়া অচল। বেনারসের পান তো অমৃত-সমান। তাই, কলকাতার অলিতে-গলিতে বাঙালিদের পাশাপাশি দিব্যি পানের পসরা সাজিয়ে বসেছেন বেনারস থেকে আসা মানুষরাও। বেনারসি পানের মেজাজই আলাদা। সেই মেজাজের অনেক গুপ্ত হদিশ উত্তর কলকাতার পথ-ঘাট-অন্দরমহলরা জানে।

    সেইসব পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতেই আপনি এসে পড়লেন বিবেকানন্দ রোড আর বিধান সরণির কাটাকুটিতে। আপনার ডানদিকে মানিকতলা আর বাঁহাতে সেন্ট্রাল এভিনিউ। বাঁহাতে, ক্রসিং-এর গায়েই লাগানো বড় দোকানটির দুই ভাগ। একটি পানের দোকান, অন্যটি সরবতের। সরবতের হরেক ভ্যারাইটি মিলবে এখানে। কলকাতায় দশ মাস গরমকাল। ভিড়ও তাই ভালোই হয়। কিন্তু দোকানের আসল ছাতা থুড়ি মূল সাইনবোর্ডটি কিন্তু পানের নামেই। ‘শিবশঙ্কর বেনারসি পান ভাণ্ডার’। খাঁটি বেনারসি পানের জন্য এই দোকানের খ্যাতি নেহাত কম দিনের নয়।

    এই দোকানই নিঃশব্দে আবিষ্কার করে ফেলেছে এক নতুন পানবাহার। বঙ্গীয় পানভাণ্ডারের নতুন অতিথি-- ‘চকোলেটি পান’।

    শুনলে চমকে উঠতে পারেন। চকোলেট কেক, চকোলেট মিষ্টি মায় চকোলেট মোমো পর্যন্ত চেখে দেখা হয়ে গেছে আম বাঙালির। কিন্তু, পানও চকোলেটি হয়? হয় যে, তার প্রমাণ এই দোকানে হাজির হলেই দেখতে পাবেন। রেকাবিতে সারি সারি সাজানো বাদামি রঙের পানের সাজি। গাঢ় বাদামি রঙের প্রলেপটি যে চকোলেটের তা বুঝতে বিশেষ বেগ পেতে হবে না। পাশেই সাজানো নানা সাইজের, নানা জাতের আরো পান। আইসক্রিম পান, বেনারসি মিষ্টি পান। মশলার পরিমাণ অনুযায়ী দাম কম-বশি। দশ থেকে তিরিশ। মুখে দিলে গলে যায় সেই সমস্ত রহস্যময়ী পানেরা। ওস্তাদি ঢঙে পানের পাতা ভাঁজ করেন এখানকার দুই কর্মী। আপনি যেমন বলবেন, সেইভাবেই তৈয়ার হয়ে যাবে পানের সাজ। তবে, চকোলেটি পান কিন্তু অর্ডারে নিজের চেহারা বদলাবে না। এই পান রেডিমেডই খেতে হবে আপনাকে।

    চকোলেটি পান আদতে বেনারসি পান। মিষ্টি পাতা, ভিতরে বাহারি সুগন্ধি মশলা। সুপুরি নেই। পানের ফালি সাজিয়ে তাকে তরল চকোলেটে চুবিয়ে নেওয়া হয়। সেই চকোলেটের ঘনত্বেই আসল ম্যাজিক। তারপর, চকোলেট একটু শুকিয়ে এলে দিব্যি প্রলেপ পড়ে যায় পানের বাইরে। অথচ, পানের ভিতরে একচুলও চকোলেটের অনুপ্রবেশ ঘটেনি। বাইরের স্বাদের সঙ্গে সঙ্গতি রেখেই ভিতরের মশলার পুর ঠিক হয়। যাতে, চকোলেটের আস্তরণকে আরোপিত মনে না হয়। সবটা মিলিয়ে পান-দুনিয়ায় এক্কেবারে নতুন এক রেসিপি চকোলেটি পান।

    বাহাত্তর বছর আগে শিবশঙ্কর চৌরাশিয়া তৈরি করেছিলেন এই দোকান। বেনারসের মানুষ। খাঁটি বেনারসি পানের ঠেক হিসেবে এই দোকান বিখ্যাতও হয়ে পড়ে রাতারাতি। অনেক নামকরা বাঁধা খরিদ্দার ছিল শিবশঙ্কর বেনারসি পান ভাণ্ডারের। বড়ো বড়ো লোকের বাড়িতে অনুষ্ঠানে অর্ডার আসত পান সাপ্লাইয়ের। সেইসব সোনার দিন কিন্তু বিগত নয়। শিবশঙ্করের মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে সঞ্জয় চৌরাশিয়া হাল ধরেছেন দোকানের। স্থানীয়রা বলেন, পানের স্বাদে কোনো খামতি জিভ এখনো ধরতে পারেনি। 

    দোকানের কর্মীরা বলছিলেন, এই ‘চকোলেটি পান’ তাঁদের আবিষ্কার। মাত্র মাস দেড়েক বয়স। এর মধ্যেই বিপুল হিট। রোজ শ’খানেক চকোলেটি পান অনায়াসে বিকোয়। দাম—পঁচিশ টাকা। অন্যদের তুলনায় কিঞ্চিত দামি। তাতে কী! তবে, রোজের বাঁধা খদ্দেররা খুব একটা পছন্দ করেননি এই নতুন অতিথিকে। তাঁদের নিজস্ব টেস্টই আসল। কারো জর্দা-সুপুরি, কারো খয়ের, কারো সামান্য মশলা এবং এলাচ। চকোলেটি পান সেই ঘরানার অন্দরমহলে এখনো স্বাগত নয়।

    কে, কীভাবে এই পানকে নেবেন তা বলা কঠিন। কেউ বলবেন, এইসব ফিউশন গা-জোয়ারি। সাবেক পানের স্বাদই আসল। সেখানে, চকোলেট, আইসক্রিম ইত্যাদি জোড়কলম আসলে আবহমান পানের ঐতিহ্যকেই নষ্ট করা। কেউ বা তক্ক জুড়বেন—তা বলে নতুন কিছু জন্মাবে না? নতুন বৈচিত্র আসবে না স্বাদে? চকোলেট পান কতখানি সাড়া ফেলবে, তা নির্ভর করবে তার স্বাদের ম্যাজিকের ওপর। চমকদার তো ঠিকই, কিন্তু স্বাদে যদি রসিকের মন না ভরে তাহলে সব মাটি।

    স্বাদ নিয়ে অবশ্য, সঞ্জয়বাবুরা নিঃসংশয়। তাঁদের একটাই ভয়, এই নতুন পানেরও নকল বেরোল বলে। আর, আসল-নকল বোঝার মতো কজন রসিক পান-প্রেমীই বা আছেন শহরে!

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @