সদলবলে বাগনানের বাস্তুতন্ত্রকে রক্ষা করে চলেছেন চিত্রক প্রামাণিক

শিল্পায়ন ও প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে এগিয়ে দিচ্ছে প্রগতির পথে। দুনিয়া এখন হাতের মুঠোয়। সবকিছু শুধুমাত্র একটি ক্লিক বা একটি ফোন কলেই পাওয়া যায়। কিন্তু জীবন আদতে এতটা সহজ নয়। এখনকার প্রজন্ম হয়তো জীবনের কঠিন স্তরগুলির আন্দাজও করতে পারবে না। একদিকে আমাদের জীবনযাত্রার মান সহজ হচ্ছে, অন্যদিকে প্রকৃতি তার ভয়াল-ভয়ংকর রূপে সামনে আসছে। দশকের পর দশক ধরে মানুষ প্রকৃতিকে অবহেলা করে এসেছে। তার ফল হয়েছে ভয়ংকর। তাপমাত্রা ক্রমশই বাড়ছে। এতটাই, যা জীবজগতের বেঁচে থাকার উপরেই প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে। এই বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে প্রাথমিক প্রশ্ন হল কীভাবে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা কমানো যাবে এবং পৃথিবীকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা যাবে। এই লক্ষ্যে প্রাথমিক কর্তব্য হল সবুজের সংরক্ষণ এবং বাস্তুতন্ত্রকে রক্ষা করা।
হাওড়ার বাগনান-এর বাসিন্দা চিত্রক প্রামাণিক প্রকৃতি এবং জীবজন্তু রক্ষায় ব্রতী রয়েছেন। হাওড়ার শহরাঞ্চল কলকারখানায় পরিপূর্ণ। আর তার অনুষঙ্গ হিসাবে দূষণেও। বাগনান, আমতা, শ্যামাপুর প্রভৃতি অঞ্চলে এখনও কিছু কিছু গাছপালা এবং জীবজন্তু রয়েছে। কিছু চাষবাসের কাজও হয়। বাগনান শহরটি হাওড়া জেলার একেবারে প্রান্তে অবস্থিত। এর দু-দিক দিয়ে বয়ে চলেছে দামোদর এবং রূপনারায়ণ নদী। বঙ্গদর্শন.কম-কে চিত্রক জানান, “কলকারখানার জন্য বাগনান অঞ্চলে প্রচুর গাছ কাটা পড়েছে। এর ফলে, বাঘরোল, যা পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য পশু, এই স্থান থেকে দ্রুতহারে অবলুপ্ত হচ্ছে। আমি দেখেছি, স্থানীয় মানুষ অনেক সময় বাঘরোলগুলিকে মেরে ফেলেন। বাঘরোল (বা মেছোবিড়াল) সরাসরি জল থেকে মাছ ধরতে পারে। সেই কারণে জেলেরা অনেকসময় তাদের বিষপ্রয়োগ করে মেরে ফেলেন। নিজেদের ধরা মাছ সুরক্ষিত রাখার জন্য। আরেকটি কারণ হল অজ্ঞানতাজাত ভয়। অনেকেই এদেরকে মাংসাশী প্রাণী মনে করেন এবং ভয়ে মেরে ফেলেন। এই ভুল ধারণা সাধারণত জন্মায় এদের নামের কারণেই। এখন মাত্র কয়েক হাজার বাঘরোল বেঁচে আছে। আমার পূর্বপুরুষেরা আগে এই অঞ্চলে প্রচুর বাঘরোল দেখতে পেতেন, কিন্তু এখন আর প্রায় দেখাই যায় না।”
চিত্রকের মতে, বন্যপ্রাণ ও পরিবেশ সংরক্ষণ আমাদের প্রতিদিনের অভ্যেস হয়ে উঠতে হবে। তাঁর দলে ৪০ থেকে ৫০ জন সদস্য আছেন, যাদের মধ্যে ১০-১৫ জন প্রতিনিয়ত সক্রিয়ভাবে কাজ করেন। সুমন্ত দাস, রঘুনাথ মান্না, ইমন ধারা, সুমন পাঠক তাঁদের মধ্যে অন্যতম। প্রতি বছর বর্ষার সময়ে চিত্রকরা ১০০-র বেশি সাপকে উদ্ধার করেন।
২০২০ সালের জানুয়ারি মাসে বাগনানে কয়েকটি বাঘরোলকে মৃত অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল। স্থানীয় মানুষেরা চিত্রককে খবর দেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই চিত্রক ও তাঁর দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে তিনটি মৃতদেহ খুঁজে পান। প্রতিটিই ছিলো মেয়ে বাঘরোল। বাঘরোল প্রাণীটি বন্যপ্রাণ (সংরক্ষণ) আইনের শিডিউল ১ তালিকাভুক্ত। ফলে তারা বাঘ, হাতি, সিংহের মতন সর্বোচ্চ সুরক্ষা পাওয়ার যোগ্য। তারপরেও এমন ঘটনায় পরিবেশরক্ষকেরা স্তম্ভিত হয়ে পড়েন। চিত্রক জানান, “বাঘরোলের বাসযোগ্য পরিবেশ নষ্ট হয়ে গেলে তারা আর বাঁচতে পারে না। তাদের বাসস্থানের জলাভূমি ক্রমশ বুজিয়ে ফেলা হচ্ছে। বাঘরোল রাতচরা প্রাণী। মাঝেমধ্যেই রাতে রাস্তা পার হওয়ার সময় তারা গাড়ির ধাক্কায় মারা পড়ে। ২০২২ এবং ২০২৩ সালে, ১২ থেকে ১৪টি বাঘরোলের মৃতদেহ খুঁজে পাওয়া গেছে। বাঘ সংরক্ষণে এখন যথেষ্ট নজর দেওয়া হয়। তাহলে কেন বাঘরোল সংরক্ষণ-এ একইরকম নজর দেওয়া হবে না? আমরা সচেতনতা প্রসারের জন্য প্রচুর অনুষ্ঠান করি। আমরা মানুষকে বোঝানোর চেষ্টা করি যে এই প্রাণীটি একেবারেই নিরীহ। আমরা মানুষকে বোঝানোর জন্য তাঁদের ছবি, ভিডিও দেখাই।”
চিত্রকের মতে প্রতিটি প্রজাতির প্রাণীর সংরক্ষণই যথেষ্ট নয়। তিনি বলেন, “আমরা যতক্ষণ জঙ্গলের পরিমাণ বাড়ানো যাচ্ছে, এইসব প্রাণীদের জন্য বাসযোগ্য পরিবেশ তৈরি করে দেওয়া যাচ্ছে, শুধুমাত্র বিপন্ন প্রাণীকে উদ্ধার করে বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ করা যাবে না। কয়েকটি নির্দিষ্ট দিনে, যেমন বিশ্ব পরিবেশ দিবস বা বিশ্ব বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ দিবসে, রাজ্যের বনদপ্তর থেকে কয়েকটি গাছের চারা সংগ্রহ করে রাস্তার দুইধারে লাগিয়ে দিলেই কাজ শেষ হয়ে যায় না। গাছগুলি বাঁচলো কি না, সে ব্যাপারে প্রায় কেউই আর খোঁজ নেয় না। আমরা গত ২-৩ বছর ধরে একটা নতুন উদ্যোগ নিয়েছি। আট বা দশ ফুট উঁচু কিছু গাছ রোপন করছি। তারপর মানুষকে রাজি করছি সেগুলিকে দত্তক নেওয়ার জন্য। ৫ জন শিশু বা প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ মিলে একটি গাছের দেখভাল করছেন। এখনও পর্যন্ত এই উদ্যোগ খুবই সফল। অনেক মানুষ সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসছেন।
আরেকটি সমস্যা হলো এলাকা থেকে প্যাঁচার সংখ্যা কমে আসা। মানুষের প্রচুর কুসংস্কার রয়েছে। যেমন- রাতে প্যাঁচার ডাক না কি এলাকায় দুর্ভিক্ষের সূত্রপাতকে সূচিত করে। এইসব কুসংস্কারের বশবর্তী হয়ে অনেকেই প্যাঁচাদের মেরে ফেলেন। প্যাঁচার প্রজননের সময়ে, অর্থাৎ দুর্গাপুজো আর তার আশেপাশের সময়ে অনেকেই প্যাঁচার ছানাদের বাসা থেকে তুলে এনে জলে বা মাটিতে ফেলে দেন। চিত্রক ২০২২ সালে ৫২টি প্যাঁচার ছানা উদ্ধার করেছেন। প্যাঁচা কমে যাওয়ার অর্থ ইঁদুরের উপদ্রব বেড়ে যাওয়া। প্যাঁচার অন্যতম খাদ্য হলো ইঁদুর। একটি প্যাঁচা এক বছরে ৫০০-৭০০টি ইঁদুর ভক্ষণ করতে পারে।
“প্যাঁচাদের বাসস্থান-ও নষ্ট করা হচ্ছে। প্যাঁচা সাধারণত বড়ো, প্রাচীন গাছের কোটরে বাস করে। সেই গাছগুলিকে কেটে ফেলা হচ্ছে। আমরা প্রতি বছর ১০০-২০০টি পাম বীজ রোপণ করি, এলাকায় প্যাঁচা, ঈগল, শকুন ফিরিয়ে আনার জন্য। খেজুর গাছও লাগানো হয়। আমরা মূলত ফলগাছ লাগাই, যাতে মানুষ এবং পশুপাখি, উভয়েই উপকৃত হয়। ভবিষ্যৎ খুবই ভয়াবহ হতে চলেছে। বিশ্ব উষ্ণায়নের কুফল পড়বে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উপর”, বলেন চিত্রক।
চিত্রকের মতে, বন্যপ্রাণ ও পরিবেশ সংরক্ষণ আমাদের প্রতিদিনের অভ্যেস হয়ে উঠতে হবে। তাঁর দলে ৪০ থেকে ৫০ জন সদস্য আছেন, যাদের মধ্যে ১০-১৫ জন প্রতিনিয়ত সক্রিয়ভাবে কাজ করেন। সুমন্ত দাস, রঘুনাথ মান্না, ইমন ধারা, সুমন পাঠক তাঁদের মধ্যে অন্যতম। প্রতি বছর বর্ষার সময়ে চিত্রকরা ১০০-র বেশি সাপকে উদ্ধার করেন। স্থানীয়দের অনেকে এই কাজটি নিয়ে ব্যঙ্গ করেন, জিজ্ঞেস করেন তাঁরা সাপগুলিকে বা তাদের বিষ বিক্রি করবেন কি না। চিত্রকরা প্রাণীগুলিকে সেখানেই ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন, যেখান থেকে তাদের উদ্ধার করা হয়েছে। অনেকে আছেন যাঁরা বিভিন্ন প্রাণীকে উদ্ধার করে বনদপ্তরের হাতে তুলে দেন। চিত্রক ও তাঁর দল তাদের সেবা শুশ্রুষা করে তাদের আবার নিজেদের পুরোনো বাসস্থানে ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। এর ফলে এলাকার বাস্তুতন্ত্র অক্ষত থাকে।
এলাকার শিশুরা চিত্রকদের প্রভূত সাহায্য করে। যেমন- কেউ যদি বাড়িতে খাওয়ার জন্য জলাভূমি থেকে কচ্ছপ ধরে আনেন, তাহলে বাচ্চারা চিত্রকদের খবর দেয়। তারা এলাকায় আসা নতুন মানুষদের দিকে নজর রাখে এবং খোঁজ নেয় তাদের কেউ চোরাশিকারি না কি। তেমন কারোর খোঁজ পেলে শিশুরা চিত্রকদের খবর দেয় এবং পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হয়। মাত্র ১১ বছর বয়স থেকেই চিত্রক পরিবেশের জন্য কাজ করা শুরু করেছিলেন। তাঁর অভিভাবকেরাও প্রকৃতিপ্রেমী। পরিবেশ এবং জীবজন্তুর প্রতি ভালোবাসা চিত্রক তাঁদের থেকেই আত্মস্থ করেছেন। চিত্রক বাগনান উচ্চ বিদ্যালয় থেকে স্কুলের পড়াশোনা করেছেন। তারপর সোদপুরের এলিট ইন্সটিটিউট অফ ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়েছেন। তিনি বাগনানের বাইরে প্রচুর চাকরির সুযোগ পেয়েছেন। কিন্তু তিনি ভয় পান যে, যদি তিনি বাগনান ছেড়ে চলে যান, তাহলে তাঁর এতদিনের সব কাজ বৃথা হয়ে যাবে। তাই তিনি বাগনানেই চাকরি খুঁজছেন। এতে হয়তো তিনি অপেক্ষাকৃত কম উপার্জন করবেন, কিন্তু নিজের প্রাণীসংরক্ষণের উদ্যোগ-গুলি নিয়ে এগিয়ে যেতে পারবেন এবং খুশি থাকবেন। চিত্রক এবং তাঁর দলের সদস্যরা এই কাজ থেকে কিছু উপার্জন করেন না। শুধুমাত্র প্রকৃতি এবং জীবজগতের প্রতি ভালোবাসাই তাঁদের এই কাজে প্রেরিত করে।