গল্প-কল্প, বিজ্ঞান-কমিকস, রহস্য-ভূত – বইমেলায় ছোটোদের বইপত্র

‘তিনটি জিনিস মানুষের জীবনে বিশেষ ভাবে প্রয়োজন, বই, বই এবং বই’। কথাসাহিত্যিক লিও তলস্তয়ের একটি উক্তি। অজানাকে জানা ও অচেনাকে চেনার যে চিরন্তন আগ্রহ মানুষের আছে, সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণের সবচেয়ে সহজ রাস্তা হল বই পড়া, এ প্রসঙ্গেই বোধহয় তলস্তয়ের উক্তিটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। রবিবার, ৫ ফেব্রুয়ারি কলকাতা বইমেলায় চোখে পড়ার মতো ভিড় ছিল ছোটোদের প্যাভিলিয়নে। এদিন ছিল বইমেলায় ‘শিশু দিবস’। উপলক্ষ্য আবোল-তাবোল’-এর শতবর্ষ। শিশুদের জন্য যে যে প্রকাশনীগুলো বইমেলায় রয়েছে, সেগুলির উপর রীতিমতো দখল নিয়েছিল খুদেরা। যাঁদের মতে এ যুগে বইমেলা নিয়ে শিশুদের আগ্রহ নেই, তাঁদের জন্য এদিন ছোটোদের প্যাভিলিয়ন একটি দৃষ্টান্ত হয়ে রইলো। শুধু খাওয়া-দাওয়া, মজা করা নয় বই কেনায়ও ছোটোদের উৎসাহ এখনও অবশিষ্ট আছে তা বইমেলায় গেলেই টের পাওয়া যাচ্ছে।
আনন্দ, দে’জ, বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ, ডি এম লাইব্রেরি সহ বেশ কিছু প্রকাশনীতে ছোটোদের মনমতো বই পাওয়া যায় এছাড়া, বহু প্রকাশনী রয়েছে শুধুমাত্র ছোটোদের বই প্রকাশ করে। যেমন- শিশু সাহিত্য সংসদ, শিশুমেলা, জ্ঞান বিচিত্রা ইত্যাদি। বইমেলায় হল ২-এর ভিতর প্রবেশ করলেই দেখা যাবে কচিকাঁচাদের একাধিক বুক স্টল। পেঙ্গুইন চিলড্রেনস, বিজ্ঞান প্রসার, চিলড্রেন বুক সেন্টার, অমর চিত্রকথা। পেঙ্গুইন চিলড্রেনস-এর তরফে অনিন্দিতা মুখার্জি বলছিলেন, “আমাদের স্টোরে অনেকগুলো বেস্টসেলার বই আছে, যেমন- শুভা মুর্তি আছে, রাসকিন বন্ড আছে। গ্রাফিক স্টোরি, কমিকস ইত্যাদিও আছে। ছোটোরা আমাদের স্টলে এসে খুশি হবে, এটুকু বিশ্বাস আছে। বিক্রিবাট্টা তো ভালোর দিকেই।”
অমর চিত্রকথা-র ম্যানেজার অরিজিৎ ঘোষ বলেন, “আমাদের অনেকগুলো বিভাগ রয়েছে। যেমন ‘ভিশনারি’, ‘হিস্ট্রি’ ‘এপিক-মাইথোলজি’ ইত্যাদি, এভাবে বাচ্চাদের পড়ার ক্ষেত্রে একটা দিক নির্দেশ দিতে পারছি আমরা। অমর চিত্রকথা বরাবরই ছোটোদের পচ্ছন্দসই বিষয়বস্তু নিয়ে কাজকর্ম প্রকাশ করে জনপ্রিয়তা পেয়েছে।”
গল্প, কল্প, বিজ্ঞান, ইতিহাস, ভূগোল, কমিকস, হাস্যরস, রহস্য, ভূত-প্রেত সব মিলিয়ে এবছর বইমেলায় ছোটোদের বইয়ের বিপুল সম্ভার চোখে পড়ার মতো। শিশু সাহিত্য সংসদের এবছরের নতুন বইয়ের তালিকায় রয়েছে আশীষ লাহিড়ীর ‘বঙ্গেবিকাশ’ (বিকাশ পর্ব), অলক চট্টোপাধ্যায়ের ‘ক্রিকেট মনের মাঠে’, অমিতা চট্টোপাধ্যায়ের ‘কল্পগল্পে মনোদর্শন’, প্রদীপ্ত সেনের ‘সন-তারিখের পাঁচালী’, সন্দীপন সরকারের ‘জঙ্গলের নোটবুক’, চিত্ররেখা গুপ্তের ‘বাঙালি মুসলমান লেখিকা’, গৌতম বাগচির ‘অদ্বিতীয় ইম্প্রেসারিও হরেন ঘোষ’, সুবীর ঘোষের ‘New Age Public Relation’ ইত্যাদি। আবার, ‘জ্ঞান বিচিত্রা’ প্রকাশনায় রয়েছে মূলত বিজ্ঞান নির্ভর বইই।
রবিবার, অফিস ছুটির দিনে লেকটাউন থেকে নিজের ক্লাস ফাইভের ছেলেকে সঙ্গে করে বইমেলায় এসছিলেন পেশায় শিক্ষক সুবীর প্রামানিক। ছেলেকে যা যা বই কিনে দিয়েছেন, সে কথা প্রসঙ্গে তিনি বলছিলেন, “পুণ্যলতা চক্রবর্তীর ‘ছোট্ট ছোট্ট গল্প’-র মতো বইগুলো থেকে গল্প পড়ে শোনানো উচিত ছোটোদের। সুকুমার রায়ের ‘আবোল তাবোল’-এর ছড়া বা ‘হ য ব র ল’-ও নিজে পড়তে পারবে আরও একটু বড়ো হয়ে। ছ’-সাত বছর বয়সে বাচ্চাকে রাসকিন বন্ডের ছোটদের বইগুলো পড়তে দিন। এতে গল্পের মধ্য দিয়েই ও নিজের চারপাশটা তাকিয়ে দেখতে শিখবে। রোয়াল্ড ডাল-এর ‘চার্লি অ্যান্ড দ্য চকলেট ফ্যাক্টরি’ বা ‘মাটিল্ডা’ আট-দশ বছরের ছেলেমেয়েদের জন্য চমৎকার।”
দু -তিন দশক আগেও স্কুল, কলেজ বা ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসের সবুজ ঘাসে নিজেদের পড়া কোনও বই নিয়ে তর্ক- বিতর্ক, আলোচনা সভা, সাহিত্যসভার জমজমাট আসর বসত। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের হাত ধরে সে দৃশ্য আজ বিরল। আরও একটি বিষয় লক্ষণীয় এই যে, বর্তমান সময়ে দেশের নানা প্রান্তে প্রচুর পাঠাগার ছড়িয়ে রয়েছে, যেখানে বইয়ের সংখ্যাও অগুনতি, টেবিল চেয়ারও রয়েছে। কিন্তু তেমন ভাবে পাঠক নেই। এ বড়ো দুশ্চিন্তার ব্যাপার! আসল কথা হল, আজকের এই ‘ডিজিটাল যুগে’ হাত বাড়ালেই তথ্যের ভাণ্ডার, যেখানে জ্ঞানের দ্বার উন্মুক্ত। কিন্তু সেখানে মননশীলতার প্রকাশ নেই, মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ নেই। এই অবস্থার পরিবর্তন করতে হলে সবার সদর্থক ভূমিকা প্রয়োজন। তাই ছোটোদের হাত ধরে নিজেও সরাসরি বইয়ের কাছে পৌঁছে যান, কিছুক্ষণ সময় কাটান বইমেলায়, বই ছুঁয়ে। ভার্চুয়াল জগৎ তো রইলোই!
ছবি নিজস্ব