পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য গাছ ছাতিম : বাংলা উপন্যাস থেকে একালের গানে ছড়িয়ে তার সুবাস

‘অপু বলিল, কি ফুলের গন্ধ বেরুচ্ছে, না দিদি? তাহাদের মা বলিল, তাহাদের জ্যেঠামশায়ের ভিটার পিছনে ছাতিম গাছ আছে, সেই ফুলের গন্ধ। … ছাতিম ফুলের উগ্র সুবাসে হেমন্তের আঁচলাগা শিশিরাদ্র নৈশবায়ু ভরিয়া যায়। মধ্যরাতে বেনুবনশীর্ষে কৃষ্ণপক্ষের চাঁদের ম্লান জ্যোৎস্না উঠিয়া শিশিরসিক্ত গাছপালার ডালে পাতায় চিকচিক করছে।’
১৯২৯ সালে প্রকাশিত ‘পথের পাঁচালি’ উপন্যাসে এমনটা লিখবার পর বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর চতুর্থ উপন্যাস ‘আরণ্যক’-এ (রচনাকাল ১৯৩৭-৩৯ খ্রিষ্টাব্দ) লিখেছেন – ‘কিছুদূর উঠতেই কিসের মধুর সুবাসে মনপ্রাণ মাতিয়া উঠিল। গন্ধটা অত্যন্ত পরিচিত... চারিদিকে চাহিয়া দেখি ধনঝরি পাহাড়ে যে এত ছাতিম গাছ আছে তাহা পূর্বে লক্ষ্য করি নাই। এখন প্রথম হেমন্তে ছাতিম গাছে ফুল ধরিয়াছে, তাহারই সুবাস। ...ছাতিম ফুলের সুবাস আরও ঘন হইয়া উঠিল, ছায়া গাঢ় হইয়া নামিল শৈলসানুর বনস্থলীতে... ভানুমতী একগুচ্ছ ছাতিম ফুল পাড়িয়া খোপায় গুঁজিল।’
শান্তিনিকেতনের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে উপহার হিসেবে দেওয়া হয় ছাতিমের পাতা! বিশ্বভারতীর আচার্যের কাছ থেকে এই ঐতিহ্যপূর্ণ ‘সপ্তপর্ণী’ লাভ শিক্ষার্থীদের কাছে স্বপ্নের মতো। বারবার রবি ঠাকুরের লেখায় উঠে এসেছে ছাতিম গাছের কথা।
বাংলায় লেখা গল্প, উপন্যাস, কবিতা, গানে বারবার জায়গা করে নিয়েছে ছাতিম গাছ। অ্যাপোসাইনেসি গোত্রের অন্তর্ভুক্ত এই গাছের দেহ ধূসর, অসমতল। চারিদিকে ছড়িয়ে থাকে অনেকগুলি শাখা। শাখার একেবারে শীর্ষে সাদা রঙের থোকা থোকা ফুল, তাতে মিশে থাকে সবুজের আভাস। যেন আদি অকৃত্রিম বাংলার নিজস্ব আমেজ। আর অসামান্য তার ঘ্রাণ। রাতের অন্ধকারেও এর সুঘ্রান বলে দেয়, অদূরে দাঁড়িয়ে আছে ছাতিম গাছ। রাতের বেলায় যে গন্ধে এতখানি মাদকতা মিশে থাকে, ভোরের দিকে তা হয়ে ওঠে তীব্র ও ঝাঁঝালো, যা একটানা কিছুক্ষণ নাকে এলে মাথা ঝিমঝিম করতে পারে! এমনকি ছাতিম ফুলের গন্ধে অনেকেরই অ্যালার্জি দেখা যায়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, সকাল হলেই এই তীব্র গন্ধ আর থাকে না। যেন কর্পূরের মতো উবে যায় হাওয়ায়!হেমন্তের দূত হিসেবে প্রকৃতি-মঞ্চে উপনীত হয় ছাতিম, ঠিক যেমন বর্ষার দূত হয়ে আসে কদম ফুল। সাহিত্যিক বিপ্রদাশ বড়ুয়া তাই লিখেছেন, ‘হেমন্ত ও শীতের শূন্যতায় ছাতিম প্রবল প্রাণের প্রতীক।’ বাংলাদেশী প্রকৃতিবীদ দ্বিজেন শর্মা ছাতিমকে চিহ্নিত করেছিলেন “হেমন্তের অঙ্গনে দাঁড়িয়ে দুরন্ত শীতকে অভ্যর্থনা জানানো একমাত্র তরু” হিসেবে। তাঁর ভাষায়, ‘প্রস্ফুটনের এমন অবারিত উচ্ছ্বাস, ফুলের অক্লান্ত নির্ঝর এবং দূরবাহী প্রবল উগ্র গন্ধের ঐশ্বর্য আর কোনো হৈমন্তী তরুরই নেই।’ কবি গোলাম মোহাম্মদ লিখলেন, ‘ছাতিম ফুলের গন্ধে ভাসে পথ/ উঠোন ভরে ভরলো ঘরের কোণ/ জোছনা মেখে হচ্ছে আরো মিহি/ সেই সোহাগে উঠলো ভরে মন। … গন্ধে কাঁপে ছাতিম ফুলের রাত/ হাতের ভেতর মধুমতির হাত।’
তেমনই আবার সমসাময়িক বাংলা গানেও নানাভাবে উঠে এসেছে ছাতিম গাছ, তার গন্ধ ও ফুলের উল্লেখ। যেমন, সাহানা বাজপেয়ী তাঁর ‘ছাতিম ফুল’ গানটিতে লিখেছেন “তোমার দিকে হেঁটে যাওয়ার/ রাস্তাজোড়া ছাতিমফুল/ আরাম-রোদের বিকেল এলায়/ ঠিক যেন কার মনের ভুল/… ছাতিমফুলের গন্ধে মাতাল/ যে রাস্তাটা, তার বাঁকে/ তারার টীপে সন্ধ্যে-আকাশ/ খুব নীরবে হাত রাখে…”। ২০২০ সালে গানটিতে সুর দেন সংগীতশিল্পী স্যমন্তক সিনহা। সেই ‘ছাতিমফুল’ নতুন অ্যারেঞ্জমেন্টে, ২০২৩-এর ভলিউম ওয়ান অ্যালবামে ফিরিয়ে এনেছেন তিনি।
ছাতিম গাছের বীজের এক অদ্ভুত ক্ষমতা রয়েছে। মূল গাছ থেকে সংযোগ ছিন্ন হলেই, অর্থাৎ ফল ফেটে বীজগুলি বাতাসে ছড়িয়ে পড়ার পর তা ওভাবেই বহুকাল ভেসে থাকতে পারে। ছোটো কাঠির মতো বীজের প্রান্তে জুড়ে থাকে পশমের মতো অঙ্গ। ঠিকমতো জায়গায় পড়লে সেখানেই নতুন ছাতিম গাছ গজিয়ে ওঠে। পশ্চিমবঙ্গে ‘রাজ্য উদ্ভিদ’-এর তকমায় ভূষিত করা হয়েছে ছাতিম গাছকে। এই গাছে সাতটি করে পাতা একত্রে একগুচ্ছ ফুলকে ঘিরে থাকতে দেখা যায় বলে সংস্কৃত ভাষায় এর নাম ‘সপ্তপর্ণ’ বা ‘সপ্তপর্ণা’।
ছাতিম যে রবীন্দ্রনাথের হৃদয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করেছিল, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। বিশ্বভারতীর অন্যতম দর্শনীয় স্থানই হল এখানকার ছাতিমতলা আর এ সংলগ্ন পু্রোনো ঘণ্টা’টি। ‘আশ্রমের রূপ ও বিকাশ’ প্রবন্ধটিতে তিনি লিখেছেন, “উত্তরপশ্চিম প্রান্তে প্রাচীন দু’টি ছাতিমের তলায় মার্বেল পাথরে বাঁধানো একটি নিরলংকৃত বেদী। তার সামনে গাছের আড়াল নেই, দিগন্ত পর্যন্ত অবারিত মাঠ, সে মাঠে তখনো চাষ পড়েনি।” বিভিন্ন সময়ে তাঁর জীবনী যারা লিখেছেন, সেখান থেকেই জানতে পারা যায় যে, রায়পুরের জমিদারের নিমন্ত্রণ গ্রহণ করতে যাওয়ার (মতান্তরে, ফেরার) পথে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ক্ষণকাল বিশ্রাম নিয়েছিলেন এই ছাতিম গাছের তলায়। এই ছাতিমতলাকে তাই মহর্ষির সাধনাবেদীও বলা হয়ে থাকে। আশ্রমের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই ছাতিমতলায় দীক্ষা দিবসের অনুষ্ঠান হয়। এমনকি এই ছাতিমতলায় ব্রহ্মোপাসনার মধ্যে দিয়ে সূচনা হয় শান্তিনিকেতনের ঐতিহ্যবাহী পৌষমেলার। এখনও অবধি মহর্ষির প্রয়াণ দিবস উপলক্ষ্যে যে স্মারক বক্তৃতা অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়, তা জায়গা করে নেয় ছাতিমতলাতেই।
আজও প্রথা মেনে শান্তিনিকেতনের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে উপহার হিসেবে দেওয়া হয় ছাতিমের পাতা! বিশ্বভারতীর আচার্যের কাছ থেকে এই ঐতিহ্যপূর্ণ ‘সপ্তপর্ণী’ লাভ শিক্ষার্থীদের কাছে স্বপ্নের মতো। বারবার রবি ঠাকুরের লেখায় উঠে এসেছে ছাতিম গাছের কথা। এক জায়গায় তিনি লিখেছেন, ‘ওই যে ছাতিম গাছের মতোই আছি/ সহজ প্রাণের আবেগ নিয়ে মাটির কাছাকাছি,/ ওর যেমন এই পাতার কাঁপন, যেমন শ্যামলতা,/ তেমনি জাগে ছন্দে আমার আজকে দিনের সামান্য এই কথা।’ আবার গল্পগুচ্ছের ‘ঘাটের কথা’ গল্পে তিনি লিখছেন, “ছাতিম গাছের শাখায় বাদুড় ঝুলিতেছে। মন্দিরের চূড়ায় বসিয়া পেচক কাঁদিয়া উঠিতেছে। লোকালয়ের কাছে শৃগালের ঊর্ধ্বচীৎকারধ্বনি উঠিল ও থামিয়া গেল।” এমনকি ১৯৩০ সালে ২৫ অক্টোবর ইন্দিরা দেবীকে একটি চিঠিতে রবি ঠাকুর লেখেন, ‘‘আমার শ্রাদ্ধ যেন ছাতিম গাছের তলায় বিনা আড়ম্বরে বিনা জনতায় হয়— শান্তিনিকেতনের শালবনের মধ্যে আমার স্মরণের সভা মর্মরিত হবে, মঞ্জরিত হবে, যেখানে যেখানে আমার ভালোবাসা আছে, সেই সেইখানেই আমার নাম থাকবে।’’
তবে শুধু শান্তিনিকেতন নয়, পৃথিবী জুড়ে বহু জায়গাতেই নাকি একদা ছাতিম গাছের ছায়াতলে বসে ছাত্রদের পাঠদান করেছেন শিক্ষকেরা। ছাতিমের কাঠ দিয়ে তৈরি করা হত ব্ল্যাকবোর্ড। আর তাই ইংরেজি ভাষায় এই গাছের নামই হয়ে গিয়েছে ‘ব্ল্যাকবোর্ড ট্রি’! এমনকি এর উদ্ভিদতাত্ত্বিক নামের (Alstonia Scholaris) মধ্যে জায়গা করে নিয়েছে লাতিন ‘স্কলারিস’ শব্দটি। এছাড়াও, ছাতিমগাছ নিয়ে প্রচলিত রয়েছে নানান উপকথা ও কিংবদন্তি। বিভিন্ন অঞ্চলের আদিবাসীরা মনে করে, এর তলায় বসা বা এর ছায়া মাড়ানো উচিৎ নয়। ছাতিমগাছের সঙ্গে শয়তানের যোগসূত্র আছে এমন রটনা থাকার দরুন এর আরেক নাম ‘ডেভিলস ট্রি’ (Devil’s Tree)। অনুমান করা হয়, শয়তান (‘ডেভিল’) শব্দটি অঞ্চলভেদে বিকৃত হয়ে ‘ছয়তাইন্যা’ ‘ছাতিয়ান’, ‘ছাইত্তান’, ‘ছাইত্তান্না’ ও অবশেষে ‘ছাতিম’ হয়ে দাঁড়ায়। যদিও, অনেকে আবার বলেন, এসব নয়, সপ্তপর্ণ-র সাতটা পাতা মিলে ছাতার আকার ধারণ করে থাকে বলেই গাছটির নাম ছাতিম।
বর্তমানের বেড়ে চলা তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে পরিবেশবীদেরা যে সকল গাছ লাগানোর বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন, সেই তালিকায় বট, অশ্বত্থ, আম, কাঁঠালের পাশাপাশি রয়েছে ছাতিমের নামও। এই গাছ একই সঙ্গে দূষণ কমাতে পারে, শব্দ শোষণ করতে পারে এবং রাত্রে আলোর প্রতিফলন আংশিক নিয়ন্ত্রণ করতেও পারে। অথচ প্রায়দিনই খবরের কাগজ খুললে নানান কারণে নির্বিচারে এসব বড় গাছ কেটে ফেলার খবর দেখতে পাওয়া যায়। আমরা আজ এমন এক ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখি, যখন কেবল সাহ্যিতের পাতায় নয়, বাংলার পথঘটও ছাতিমের আশ্রয় পাবে।