ল্যান্ডলাইনে মাসিক আয় বৃদ্ধি, লাভের হারে চমক দিল ক্যালকাটা টেলিফোনস

ছবিঃ নিজস্ব
২৮ জানুয়ারি ১৮৮২, ভারতীয় টেলিফোনের ইতিহাসে স্মরণীয় একটি দিন। ওই দিন গভর্নর জেনারেল’স কাউন্সিলের সদস্য মেজর ই বারিং কলকাতার টেলিফোন এক্সচেঞ্জের উদ্বোধন করেন। আর তার নাম দেওয়া হয় ‘সেন্ট্রাল এক্সচেঞ্জ’। একেবারে গোড়ার দিকে কলকাতায় টেলিফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছিল ৫০। সেটা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। ব্যক্তিগত কাজে কলকাতায় প্রথম টেলিফোন ব্যবহার করেন বাবু সাগরলাল দত্ত। তিনি ছিলেন ব্যবসায়ী। থাকতেন ১৪ গোপালচন্দ্র লেনে। এই রাস্তা মধ্য কলকাতার কলুটোলা অঞ্চলে অবস্থিত। প্রাতিষ্ঠানিক বিচারে একটি মাত্র বাঙালি প্রতিষ্ঠান তখন টেলিফোন ব্যবহার করত- শিবকৃষ্ণ দাঁ অ্যান্ড কোং। সেই টেলিফোনের জল আজ অপরিহার্য মোবাইলে এসে ঠেকেছে। ‘ক্যালকাটা টেলিফোনস’-এর ইতিহাস বেশ গুছিয়েই লেখা রয়েছে http://www.calcutta.bsnl.co.in/-এই ওয়েবসাইটে। তবে ইতিহাস নয়, সাম্প্রতিক সময়ে ক্যাল টেল-এর অবস্থা তুলে ধরতেই এই প্রতিবেদন।
বিএসএনএল-এর মোবাইল পাশে রয়েছে ‘অন’ অবস্থায়। ফোন করলে বলছে, সুইচ অফ। এই অবস্থা যখন ভয়াবহ আকার নিচ্ছে, তখন কলকাতা জুড়ে প্রাইভেট সেলফোন একটু একটু করে তার শাখাপ্রশাখা বিস্তার করছিল। তারপর এখন, বিএসএনএলকে পিছনে ফেলে মোবাইলের বাজার দখল করে নিয়েছে জিও, এয়ারটেল, ভোডাফোন সহ অন্যান্য বেসরকারি মোবাইল নেটওয়ার্ক অপারেটর সংস্থা। তবে এরই মধ্যে সুখবর হল, চলতি আর্থিক বছরের প্রথম ৯ মাসে ক্যালকাটা টেলিফোনস ধারাবাহিক লোকসান কাটিয়ে লাভের মুখ দেখতে পেয়েছে। আর এই লাভ এসেছে মূলত সময়োপযোগী ব্রডব্র্যান্ড স্কিম এনে এবং সংস্থায় স্বেচ্ছাবসর ব্যবস্থা চালু করে, বিএসএনএল ক্যালকাটা সার্কেল সূত্রে এই খবর জানা গেছে। এর ফলে চলতি আর্থিক বছরের প্রথম ৯ মাসে ক্যালকাটা টেলিফোনস আয় বাড়িয়েছে ৬৭.৭ শতাংশ। যা এক কথায় সাম্প্রতিককালে কলকাতা টেলিফোনসের ইতিহাসে নজির সৃষ্টিকারী ঘটনা। আর ক্যালকাটা টেলিফোনস এর এই লাভের পিছনে বড়ো ভূমিকা নিয়েছে প্রায় হারিয়ে যাওয়া বহুস্মৃতিময় সেই ল্যান্ডলাইন টেলিফোন।
ক্যালকাটা টেলিফোনসের গত ৯ মাসের হিসাব বলছে, ল্যান্ডলাইন টেলিফোন দৃঢ়তার সঙ্গে এই লাভ ক্যালকাটা টেলিফোনসের ঘরে তুলতে সাহায্য করেছে। ল্যান্ডলাইনে এখন গ্রাহকপিছু মাসিক আয় ভালো হচ্ছে। আর তাই এন্টারপ্রাইজ, ফাইবার ব্রডব্র্যান্ড, মোবাইলের পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য রকমের ভালো আয় দিয়েছে বিস্মৃতপ্রায় ল্যান্ডলাইন ফোন। ক্যালকাটা টেলিফোনসের হিসাব তাই বলছে।
ছবিঃ নিজস্ব
এবার একটু ক্যালকাটা টেলিফোনসের আয়ব্যয়ের তথ্যের দিকে নজর দেওয়া যাক। চলতি আর্থিক বছরের গত ২০২২-এর এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর এই ৯ মাসে ক্যালকাটা টেলিফোনসের মোট আয় হয়েছে ৪৮৬.৪৭ কোটি টাকা। গত আর্থিক বছরে এই সময়কালে ক্যালকাটা টেলিফোনসের আয় ছিল ২৯০.১০ কোটি টাকা। সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর এই ত্রৈমাসিকে ক্যালকাটা টেলিফোনস আয় করেছিল ১৬৮.৯৯ কোটি টাকা। এই আয় হচ্ছে গত আর্থিক বছরের চাইতে ৭২.২ % বেশি। শতাংশের এই বৃদ্ধির হার হচ্ছে ভারতের সমস্ত বিএসএনএল সার্কেলের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।
বিএসএনএল - এর চেয়ারম্যান ও ম্যানেজিং ডিরেক্টর পি. কে. পুরওয়ার বিএসএনএল- এর সমস্ত সার্কেলের জেনারেল ম্যানেজারদের চিঠি লিখে জানিয়েছেন, চলতি আর্থিক বছরের প্রথম ৯ মাসে বিএসএনএল- এর আয় ৭. ৪২% থেকে বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার ৩৮৮ কোটি টাকায়।
কলকাতা সার্কেলের বিএসএনএল- এর আয় বৃদ্ধির কারণ কী, সেই প্রসঙ্গে আসা যাক।
আমাদের সবার জানা আছে যে বিএসএনএল - এ ভিআরএস বা স্বেচ্ছাবসর প্রকল্প চালু হয় ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে। এই ভিআরএস স্কিমে সংস্থার মোট ৯০ হাজার কর্মী স্বেচ্ছাবসর নিয়ে ২০২০- র জানুয়ারি মাসেই বিএসএনএল ছেড়ে দেন। এর পর শুরু হয় বিএসএনএল- এর ইন্টারনাল রিকনস্ট্রাকশন। বহু বিএসএনএল- এর অফিস পরস্পরের সঙ্গে মিশিয়ে বা একত্রিত করে অফিসের সংখ্যা হ্রাস করা হয়। এই একত্রিকরণ প্রক্রিয়া চলেছে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে।
তবে ক্যালকাটা টেলিফোনসের অভ্যন্তরীণ পুনর্গঠন প্রক্রিয়া এখনও চলছে বলে ক্যালকাটা টেলিফোনস সূত্রেই জানা গিয়েছে। বেশিরভাগ অভ্যন্তরীণ পুনর্গঠন প্রক্রিয়া বছর দেড়েক আগে শেষ হয়েছে। আর এই অভ্যন্তরীণ পুনর্গঠনের পরই ক্যালকাটা টেলিফোনসের পরিচালনগত মুনাফা বা অপারেটিং লাভ বাড়তে শুরু করেছে।
তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, কেন্দ্রীয় সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বিক্রির কাজ শুরু করেছে, তাই এই লাভ ভবিষ্যতে দেশের বিপুল পরিমাণ কর্মপ্রার্থীর কাছে যে অশনিসংকেত বয়ে আনতে পারে, তাতে সন্দেহ নেই।
ক্যালকাটা টেলিফোনস সূত্রে আরও জানা গেছে যে, বিএসএনএল-এর ক্যালকাটা সার্কেলের আয় বৃদ্ধির দু’টি অন্যতম কারণ ব্রডব্যান্ড এবং এন্টারপ্রাইজ ব্যবসা। কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকা জুড়ে ক্যালকাটা টেলিফোনসের ৩১ হাজারের কাছাকাছি ফাইবার ব্রডব্যান্ড কানেকশন আছে। এই প্রজন্মের যুবক-যুবতীদের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরিষেবার উন্নয়ন করার ফলে কলকাতায় বিএসএনএল-এর ব্রডব্র্যান্ড পরিষেবার চাহিদা এখন খুবই ভালো এবং চাহিদাও বেড়েছে।
প্রতীকী ছবি
তবে ক্যালকাটা টেলিফোনসের আয় ও ব্যাবসা যখন বাড়ছে ঠিক এই একই সময় বিএসএনএল-এর ওয়েস্ট বেঙ্গল সার্কেলের ছবিটা বেশ করুণ। সারা ভারতে বিএসএনএল- এর মোট ৩০টি সার্কেলের মধ্যে যে তিনটি সার্কেলের আয় সবচেয়ে বেশি কমেছে, তার মধ্যে ওয়েস্ট বেঙ্গল সার্কেল রয়েছে বলে বিএসএনএল সূত্রে জানা গেছে। চলতি আর্থিক বছরের প্রথম ৯ মাসে বিএসএনএল-এর ওয়েস্ট বেঙ্গল সার্কেলের ব্যয় হ্রাস পেয়েছে ২৫.৮%। এর ফলে বিএসএনএল-এর দিল্লির সদর দফতর থেকে ওয়েস্ট বেঙ্গল সার্কেলকে আয় বৃদ্ধির জন্য নির্দিষ্ট পরিকল্পনা করে সদর দফতরে জানাতে নির্দেশ দিয়েছেন সংস্থার চেয়ারম্যান।
তবে বিএসএনএল-এর ওয়েস্ট বেঙ্গল সার্কেল সূত্রে জানা গেছে, সমগ্র পূর্ব ভারতে পেটিএম-এর মাধ্যমে বিএসএনএল-এর যে রিচার্জ হয়, তার সম্পূর্ণ টাকাটা বিএসএনএল-এর ওয়েস্ট বেঙ্গল সার্কেলের ঘরে আসত। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের একটি নির্দেশিকার ফলে এই পেটিএম পরিষেবা বন্ধ রয়েছে। পেটিএম-এর মাধ্যমে এই রিচার্জ বন্ধ হওয়ার ফলে ১৮ থেকে ২০ কোটি টাকা মাসিক আয় বন্ধ হয়ে রয়েছে। এর ফলেই বিএসএনএল-এর ওয়েস্ট বেঙ্গল সার্কেলের আয় কমেছে বলে বিএসএনএল ওয়েস্ট বেঙ্গল সার্কেল সূত্রে জানা গেছে।
তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বৃহৎ পরিসরে ভিআরএস চালু করে লাভের মুখ দেখাটা সংস্থার কর্মীদের কাছে আশঙ্কার বার্তা নিয়ে আসছে। একেই কেন্দ্রীয় সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বিক্রির কাজ শুরু করেছে, তাই এই লাভ ভবিষ্যতে দেশের বিপুল পরিমাণ কর্মপ্রার্থীর কাছে যে অশনিসংকেত বয়ে আনতে পারে, তাতে সন্দেহ নেই।