কলকাতার ‘ক্যাফে পজিটিভ’ – এশিয়ার প্রথম ক্যাফে, যা সামলাচ্ছেন শুধুমাত্র এইচআইভি আক্রান্তরা

“এইডস হয়েছে? সর্বনাশ! এবার দূরে সরে থাকতে হবে।” – এমন মন্তব্য এখনও অনেকেই হয়তো করে থাকেন। এইচআইভি আক্রান্তদেরও প্রত্যেকটা মুহূর্তে এই কথাগুলোই শুনতে হয়। শুনতে শুনতে ওরা ক্লান্ত হয়নি, বরং নতুন জেদ নিয়ে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, কেউ গান গাইছে, কেউ কবিতা পড়ছে, কেউ হিসেব সামলাচ্ছে। আর তাঁদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন রাষ্ট্রপুঞ্জের প্রাক্তন কর্মী কল্লোল ঘোষ। দক্ষিণ কলকাতার যোধপুর পার্কে ‘ক্যাফে পজিটিভ’-এর যাত্রা শুরু হলেও, বর্তমান ঠিকানা লেক ভিউ রোডে। কেন ক্যাফে পজিটিভ? কারণ ক্যাফের কর্মীদের প্রত্যেকেই নিজের শরীরে এইচআইভি মারণ ভাইরাস বহন করছেন জন্মসূত্রে। ঘটনাচক্রে এটিই এশিয়ার প্রথম ক্যাফে, যা সামলাচ্ছেন শুধুমাত্র এইচআইভি আক্রান্তরা।
কলকাতা নতুন পথ দেখায়। তা দেখে অনুপ্রাণিত হয় বিশ্ব। ‘ক্যাফে পজিটিভ’-ও নিঃসন্দেহে নতুন দিশা দেখানোর মতো একটি উদ্যোগ। পরিসংখ্যান বলছে, এই মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গের এইচআইভি পজিটিভ শিশু এবং প্রাপ্তবয়স্কদের সংখ্যা প্রায় বারো হাজার। কল্লোল ঘোষের নিজস্ব সংগঠন রয়েছে, যারা শিশু অধিকার নিয়ে নিয়মিত কাজ করেন। ২০০০ সালে নরেন্দ্রপুরের কাছে গোবিন্দপুর গ্রামে কল্লোলবাবুর উদ্যোগে তৈরি হয় ‘আনন্দঘর’ হোম। যেখানে শুধুমাত্র এইচআইভি পজিটিভ বাচ্চা, যাদের বাবা-মা মারা গেছেন, তারা সবাই সিডব্লিউসি-র অনুমতিক্রমে হোমে থাকতে শুরু করে। বড়ো হতে থাকে। ক্যাফে পজিটিভের কর্ণধার কল্লোল ঘোষ জানাচ্ছেন, “একটা সময় গেছে, যখন খুব কষ্ট করে বাচ্চাদের স্কুলে ভর্তি করতে হত। কারণ মানুষ সচেতন ছিলেন না। ২০০৬ সালে ব্যক্তিগত কাজে জার্মানির মিউনিখ শহরে গিয়ে দেখি, ওখানে এইচআইভি আক্রান্ত মানুষরা একটা রেস্টুরেন্ট চালাচ্ছেন। তখন মনে হয়, আমার বাচ্চারা যখন বড়ো হবে, তখন কলকাতায় আমরা এরকম একটা ক্যাফেটেরিয়া চালাতে পারি কিনা।”
সেই ভাবনা থেকেই ২০১৪-১৫ সাল নাগাদ কল্লোলবাবুর হোমে তৈরি হয় একটা বেকারি ইউনিট। আইন অনুযায়ী ১৮ বছর বয়সের পর ছেলেমেয়েদের আর হোমে রাখা যাবে না। কারণ তারা প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সেই বাচ্চাটা কোথায় যাবে, সেটা আইনে বলে দেওয়া নেই। তখনই কল্লোলবাবুর মনে হল, এই বাচ্চাগুলোকে কীভাবে নিজের পায়ে দাঁড় করানো যায়। কথা প্রসঙ্গে জানা যায়, এইচআইভি পজিটিভ একজন শিশু পড়াশোনার ক্ষেত্রে খুব বেশি দূর যেতে পারে না। উচ্চ-মাধ্যমিক বা স্নাতক স্তর পড়লেই বিরাট প্রাপ্তি। “নিরন্তর বাচ্চাদের সঙ্গে কথা বলে আমরা ঠিক করি, কলকাতায় একটা ক্যাফে করব। ২০১৮ সালে প্রথম জায়গা খোঁজা শুরু করি। জায়গা খুঁজতে গিয়ে দেখলাম, কাজটা যত সহজ ভাবছি, একেবারেই তত সহজ নয়। লোকজন আমাকে দূর দূর করে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন।” – জানাচ্ছেন কল্লোল ঘোষ।
২০১৮ সালেই দক্ষিণ কলকাতার যোধপুর পার্কে দশ ফুট বাই দশ ফুট একটা জায়গা পেয়েছিলেন কল্লোলবাবুরা। সেখানেই তৈরি হল এশিয়ার প্রথম ক্যাফেটেরিয়া, যা এইচআইভি আক্রান্ত মানুষরা পরিচালনা করছেন। ওঁরাই অ্যাকাউন্ট দেখছেন, ওঁরাই খাবার পরিবেশন করছেন আবার ওঁরাই রান্না করছেন। কোভিডের আগে যোধপুর পার্ক থেকে ক্যাফে পজিটিভ চলে আসে লেক ভিউ রোডে, ২০২০ সালের আন্তর্জাতিক কফি প্রেমী দিবসে। মানুষের সাড়া এককথায় অভূতপূর্ব। সপ্তাহান্তে এলে বসার জায়গা সচরাচর পাওয়া যায় না। ভিড় থাকে উপচে পড়া। এখন এই ক্যাফেতে নিয়মিত আসেন বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ থেকে সংগীতশিল্পী, নাটকের দল থেকে সংস্কৃতিমনস্ক ব্যক্তিত্বরা। প্রত্যেকেই ক্যাফেকে ভালোবাসছেন, সকলের সঙ্গে গল্প করছেন।
কল্লোল ঘোষ জানিয়েছেন, “আমরা আগামী এক বছরের মধ্যে সারা দেশ জুড়ে ৩০টি ‘ক্যাফে পজিটিভ’ তৈরি করছি। কুড়ি-একুশ বছর এইডস আক্রান্ত মানুষদের সঙ্গে কাজ করছি, ওরা কিন্তু কেউই সমস্যার নয়, সমস্যা তৈরি করি আমরাই।”
আরও পড়ুন: লালমাটির ভুবনডাঙায় জাপানি ক্যাফে
ভাইরাস বহন করলেই সমাজ সেই সকল মানুষদের অছ্যুত করে দেয়। এর পিছনে কাজ করে অসংখ্য ট্যাবু এবং নির্দিষ্ট কারণ সম্বন্ধে সচেতন না হওয়া। নিয়মিত রেট্রো ভাইরাল চেকআপের মধ্যে থাকেন এইচআইভি আক্রান্তরা। যথেষ্ট নিয়ম মেনে চলতে হয়। তা হলেই আর এডস সংক্রমণের সম্ভাবনা থাকে না। এইচআইভি শরীরে থাকলেই তিনি সাধারণের চোখে হয়ে যান এইডস রোগী। কিন্তু রক্তের সম্পর্ক তৈরি না হলে, অসুরক্ষিত যৌনসঙ্গম না করলে, একই ছুঁচে বারবার ড্রাগ বা ওষুধ না নিলে এইচআইভি ছড়ানোর কোনো সম্ভাবনাই নেই। কল্লোলবাবু জানান, “একজন জনপ্রিয় প্রতিষ্ঠিত মানুষ দু-তিনদিন ক্যাফেতে এসে ঘুরে চলে গেছেন। আমাকে বলেছেন, তিনি হাই প্রেশারের রোগী, এইচআইভি আক্রান্তদের হাতে খাবার খেলে শারীরিক কোনো অসুবিধা হবে কিনা! এমনকি আমার বাচ্চাদের জন্য যদি কোনো দোকানে ওষুধ কিনতে যাই, আমার দিকে সন্দেহের চোখে তাকান অনেকেই।”
সব বিষয়ে সকলেই সচেতন হবেন – তা ধরে নেবার কোনো কারণ নেই। কিন্তু চেষ্টা অন্তত করা দরকার। এক কাপ কফির মাধ্যমে যদি নাটকের আলোচনা হতে পারে, প্রেম হতে পারে, রাজনীতি হতে পারে – তাহলে এইচআইভির মতো ট্যাবু নিয়ে কেন কথা হবে না! কলকাতা শহর মুখ ফিরিয়ে নেয়নি। গল্প করতে করতে খুশির খবর দিলেন কল্লোলবাবু। বললেন, “খুব শীঘ্রই কলকাতার তিনটি মলে আমাদের কিয়স্ক শুরু হবে। কলকাতা এয়ারপোর্টেও এ নিয়ে কথাবার্তা চলছে। আসলে ক্যাফে পজিটিভ শুধুই একটা কফির দোকান থাকবে না, একটা বিপ্লব হয়ে থেকে যাবে।”
কল্লোল ঘোষের সঙ্গে কথা যেন ফুরোচ্ছিল না। ক্যাফে পজিটিভ নির্দিষ্ট কোনো শ্রেণির নয়, হয়ে উঠেছে সকলের। সেকারণেই একদিন আইটির এক কর্মী কল্লোলবাবুকে ফোন করে বলেছিলেন, ক্যাফে পজিটিভে এসে তিনি বিয়ে করতে চান। তাঁর নতুন জীবনের পথ চলা শুরু হোক এমনই এক ‘পজিটিভ’ এনার্জি নিয়ে। ক্যাফে পজিটিভ আক্ষরিক অর্থেই ইতিবাচক হয়ে উঠেছে মানুষের মননে, সংস্কৃতিতে।
ক্যাফে পজিটিভের ঠিকানা – ৬৪এ, লেক ভিউ রোড, কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ
ছবিঃ কল্লোল ঘোষ (কর্ণধার, ক্যাফে পজিটিভ)