বক্সা দুর্গে কি বন্দি করে রাখা হয়েছিল নেতাজি সুভাষকে?

এখন বক্সা জাতীয় উদ্যানের মধ্যেই রয়েছে বক্সা দুর্গ, তবে জাতীয় উদ্যানের থেকে দুর্গ অনেক অনেক পুরোনো। ১৯৮৩ সালে এখানে বক্সা টাইগার রিসার্ভ তৈরি হয়েছিল, আর পশ্চিমবঙ্গ সরকার জায়গাটাকে ১৯৯৭ সালে জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষণা করে। অন্যদিকে, বক্সা দুর্গ যে কে বানিয়েছিলেন তা জানা যায় না। সে কেল্লা এতটাই পুরোনো যে এখন জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। কেউ কেউ বিশ্বাস করেন, তিব্বতের রাজা সংস্তান গাম্পো বক্সা দুর্গ তৈরি করিয়েছিলেন খ্রিস্টীয় সপ্তম শতকে। তবে এটা ঠিক যে প্রাচীনকালে যখন ভুটানের মধ্য দিয়ে ভারত আর তিব্বতের রেশমের বাণিজ্য চলত, তখন সেই বাণিজ্যপথকে পাহারা দিতে এই দুর্গে ভুটানি রাজার সৈন্য মোতায়েন থাকত।
তার অনেক পরে ১৭ শতাব্দীর দ্বিতীয় ভাগে ইংরেজদের সঙ্গে ভুটানিদের যুদ্ধ লাগে। প্রথম ডুয়ার্স যুদ্ধে ইংরেজরা হেরে যায়, তারপর ১৮৬৫ সালে দ্বিতীয় ডুয়ার্স যুদ্ধে ব্রিটিশ সৈন্যরা ভুটানি রাজাকে হারিয়ে কোচবিহারের রাজাদের আমন্ত্রণে দখল করে নিয়েছিল এই বক্সা দুর্গ। সিঞ্চুলা চুক্তি মারফত ১৮৬৫ সালের ১১ নভেম্বর এই দুর্গ আনুষ্ঠানিকভাবে ব্রিটিশদের অধীনে এসেছিল। ‘বক্সা’ নামটা কীভাবে এসেছে, তা নিয়ে রয়েছে বির্তক। কেউ কেউ মনে করেন ভুটানি শব্দ ‘বক্সার’ মানে ‘পিঠে নিয়ে খাও’। ওই শব্দ থেকেই জায়গাটার নাম বক্সা। আবার কারো মতে, বক্সাইট খনি থেকে এসেছে বক্সা নাম।
ব্রিটিশরা যখন বক্সা দুর্গ দখল করেন, তখন সেটা ছিল বাঁশের তৈরি। পাথর দিয়ে এটাকে আরও মজবুত আর দুর্ভেদ্য বানিয়ে তোলে ব্রিটিশরা। বক্সা দুর্গ হয়ে ওঠে সাম্রাজ্যবাদী শাসকদের ডিটেনশন ক্যাম্প আর কারাগার। এখানে বন্দিজীবন কাটিয়েছেন অনিল রায়, প্রফুল্ল গুপ্ত, যতীন দাস, সুনীল লাহিড়ী, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, পুলিন দা্সের মতো স্বাধীনতা সংগ্রামীরা। একটা গল্প প্রচলিত আছে যে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে বক্সা দুর্গে বন্দি রাখা হয়েছিল। নেতাজিকে এখানে রাখার ৬ দিন পর তিনি নাকি লামাদের সহযোগিতায় লামার ছদ্মবেশে বক্সা দুর্গ থেকে পালিয়ে যান। যদিও এই গল্পের সত্যতা নিয়ে কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। হিজলি জেলে গুলি চালানোর প্রতিবাদে এখানকার বন্দি স্বাধীনতা সংগ্রামীরা অনশন করেছেন। একবার বক্সা জেলের রাজবন্দিরা রবীন্দ্রজয়ন্তী পালন করেন। রবীন্দ্রনাথ তখন ছিলেন দার্জিলিং-এ। সেখান থেকে তিনি লিখে পাঠালেন, “অমৃতের পুত্র মোরা কাহারা শোনাল বিশ্বময়, আত্মবিসর্জন করি আত্মারে কে জানিল অক্ষয়”।
আরও পড়ুন
ঢাকার ঔরঙ্গাবাদ আর লাল গোলাপের দুর্গ
বক্সা দুর্গ ছিল সেলুলার জেল বাদে ব্রিটিশ ভারতের সবথেকে কুখ্যাত কারাগার। এমনি স্বাধীনতার পরও কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়, বিনয় চৌধুরী, সতীশচন্দ্র পাকড়াশী, ননী ভৌমিক, পারভেজ শাহেদী, চিন্মোহন সেহানবীশের মতো মার্কসবাদী আন্দোলনকারীদের এখানে বন্দি রাখা হয়েছিল। ১৯৫৯ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী চিনের বিরুদ্ধে তিব্বতিদের স্বাধীনতা আন্দোলন ব্যর্থ হলে প্রচুর তিব্বতি সন্ন্যাসী ভারতে পালিয়ে এসেছিলেন। তখন পরিত্যক্ত বক্সা কারাগার তিব্বতি বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের পঠনপাঠনের কেন্দ্র এবং শরণার্থী শিবির হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। পরে ১৯৭১ সালে তাঁরা বক্সা দুর্গ ছেড়ে কর্ণাটকে চলে যান। এখন পর্যটকদের কাছে আলিপুরদুয়ার জেলার বক্সা দুর্গ ভ্রমণের একটা জনপ্রিয় স্থান হয়ে উঠেছে।