বিবাদী বাগের আনাচে কানাচে পুরোনো কলকাতা

কলকাতা সফরের দ্বিতীয় দিনে আমরা বিবাদী বাগ অঞ্চলের বাকি অংশ ঘুরে দেখব। গত সপ্তাহে অল্প কিছু জায়গায় গিয়েছি। এবার যে অনেকটা হাঁটব তা নয়, বরং মজা উপভোগ করব বেশি। যত হেরিটেজ বাড়ি দেখবেন, কল্পনা করুন তৈরি হওয়ার ঠিক পর কেমন দেখতে ছিল সেগুলো! চারপাশ কেমন ছিল! তবেই বুঝতে পারবেন, ‘ব্রিটিশ শহর’ হিসেবে কতটা খ্যাতি এবং গৌরবের শীর্ষে পৌঁছেছিল আমাদের তিলোত্তমা।
পুরোনো মুদ্রাভবন
উনিশ শতকের স্মৃতি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে পুরোনো মুদ্রাভবন। সেন্ট অ্যান্ড্রু’স চার্চের দিকে থেকে ওল্ড কোর্ট হাউজ স্ট্রিট গিয়ে যেখানে সুরেন্দ্রমোহন ঘোষাল সরণিতে মিশেছে, ঠিক সেখানেই। প্রধান ফটক পশ্চিমে বিবাদী বাগের দিকে মুখ করা। উত্তর-পশ্চিমে মোটামুটি ১০০ মিটার দূরেই লালদিঘি। ১৮৩৩ সালে আগ্রা ব্যাংকের কলকাতা শাখা হিসেবে এই ভবন গড়ে ওঠে। ১৮৬৮ সালে হয়ে ওঠে ইস্যু অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অফ গভর্নমেন্ট কারেন্সির দপ্তর। ভারতের রিজার্ভ ব্যাংক প্রথম কেন্দ্রীয় কার্যালয় ছিল এখানে ১৯৩৫ থেকে ৩৭ অবধি। পরে সেন্ট্রাল পাবলিক ওয়ার্কস ডিপার্টমেন্টের গুদাম হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে। ১৯৯৪ সালে নিরাপত্তার জন্য বাড়িটি পুরো ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
আরও পড়ুন: পায়ে হেঁটে জানুন কলকাতার ইতিহাস
এই তিনতলা প্রাসাদ কীভাবে শেষ পর্যন্ত বেঁচে গেল, তার ইতিহাসও বেশ রোমাঞ্চকর। ভেঙে ফেলার কাজ শুরু হয়েছিল ১৯৯৬-তে। চলল ১৯৯৮ অবধি। সেন্ট্রাল হলের তিনটি গম্বুজ পুরো গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল ট্রাস্ট ফর আর্ট অ্যান্ড কালচারাল হেরিটেজ এবং কলকাতা পুরসভা তখন এগিয়ে আসে বাড়িটি রক্ষা করতে। ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণের দায়িত্বে এটিকে তুলে দেওয়া হয় ২০০৩ সালে। তাঁরাই সংস্কার করেন ২০০৫ থেকে ১৯ পর্যন্ত। পাশাপাশি আঞ্চলিক সদর দপ্তর হিসেবেও ব্যবহার করতে থাকেন। ২০২০ সালের ১১ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এখানে জাদুঘরের উদ্বোধন করেন।
ইতালীয় রীতির এই স্থাপত্যের মেঝে তৈরি হয়েছে মার্বেল এবং চুনার বেলেপাথর দিয়ে। সামনের প্রবেশপথে দেখতে পাবেন তিন ভাগে বিভক্ত ঢালাই লোহার দরজা। গম্বুজ ভেঙে দেওয়ার পর সেন্ট্রাল হল এখন খোলা বা ‘ওপেন এয়ার’ প্রাঙ্গণ। আগে ব্যাংকনোট, সোনা, রুপো ইত্যাদি বিনিময়ের কাউন্টার ছিল এখানে। সংস্কারের পর থেকে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের জন্য কাজে লাগে।
পোস্টাল সর্টিং এবং সেন্ট্রাল টেলিগ্রাফ অফিস (সিটিও)
মুদ্রা ভবনের ডান দিকে রাস্তা পার হলে রিটার্নড লেটার-পোস্টাল সর্টিং এবং সেন্ট্রাল টেলিগ্রাফ অফিসের সামনা-সামনি দাঁড়াবেন। পাশাপাশি দু’টো জমকালো বাড়ি – যুগের পর যুগ ধরে একই রকম রয়েছে। বারান্দা এবং উঠোন জুড়ে এখন প্রচুর ফেরিওয়ালার আনাগোনা। তা বলে পুরোনো গরিমা ম্লান হয়নি।
দু’টি বাড়ি একই সময়ে গড়ে ওঠেনি। ১৭৫৭-র পলাশি যুদ্ধের সময় একটা বিশাল পুকুর ছিল এখানে। কয়েক বছর পর উইলিয়াম টুলো নামের এক কুখ্যাত নিলামদার পুকুর বুজিয়ে তার ওপর নিলামের কারবার চালাতে থাকেন। ইংরেজ সরকার ১৭৭০ সালে ওই জমি কিনে নেয়। তুলে দেয় হিন্দুস্তান ব্যাংক এবং আরও ৩টি বাণিজ্য সংস্থার হাতে। হিন্দুস্তান ব্যাংক ছিল ভারতের প্রথম ইউরোপীয় ধাঁচের ব্যাংক। প্রায় একশো বছর পর ১৮৬৮ সালে জমিটি পরিষ্কার করা শুরু হয় ১২০ ফুট লম্বা মিনার-সহ আদি এসটিও ভবন গড়ে তোলার লক্ষ্যে। নানান বাধাবিপত্তি পেরিয়ে ১৮৭৬ সালে নির্মাণ শেষ হয়। সেই ভবন এখন ডেড লেটার অফিস নামে পরিচিত।
আরও পড়ুন: দুয়ারসিনি – অরণ্যের মাঝখানে লুকোনো খাজানা
যে বছর প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হল, সেই ১৯১৪ সালে গড়ে ওঠে সিটিও-র নতুন শাখা। তখন একে স্টেট-অফ-দ্য-আর্ট প্রতিষ্ঠান মনে করা হত। টেলিফোন, টেলিগ্রাফ এবং বার্তা প্রতিলিপি গ্রহণ এবং প্রেরণ করা হত এই অফিস থেকে। কলকাতার সঙ্গে গোটা বিশ্বের যোগাযোগে এক নতুন দিগন্ত খুলে যায়। এখন চিঠি বাছাই এবং মজুত করা হয় নিচের তলাগুলোয়। ওপরের তলাগুলো ডাক বিভাগের কর্মীরা অতিথিশালা হিসেবে ব্যবহার করেন। বহু শতাব্দীপ্রাচীন আসবাব এবং অন্যান্য জিনিসপত্র আজও দেখা যায়।
ওয়েলেসলি প্লেস
ওয়েলেসলি প্লেস এখন রেড ক্রস প্লেস। ওল্ড কোর্ট হাউজ স্ট্রিটের ডানদিকে ঘুরলে দেখতে পাবেন স্ট্যান্ডার্ড লাইফ অ্যাসিওরেন্স বিল্ডিং। বা সংক্ষেপে স্ট্যান্ডার্ড বিল্ডিং। বাড়িটির নকশা করেন ফ্রেডরিক উইলিয়াম স্টিভেনস। মুম্বাইয়ের বিখ্যাত ভিক্টোরিয়া টার্মিনাস রেলওয়ে স্টেশনের নকশাও তাঁর করা। যেটি এখন ছত্রপতি শিবাজি টার্মিনাস নামে পরিচিত। ১৮৯৪ সালে স্ট্যান্ডার্ড বিল্ডিং নির্মাণ শুরু হয়। শেষ হয় ১৮৯৬ সালে। স্থাপত্যের গড়ন রাজকীয় – জাঁকজমকে ভরা। দারুণ সব রিলিফ ভাস্কর্যের কাজ, যেরকমটি ভারতে ব্রিটিশদের তৈরি স্থাপত্যে খুব কমই দেখা যায়।
১৮২৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় লাইফ ইনসিওরেন্স কোম্পানি অফ স্কটল্যান্ড, ১৮৩২ সালে নাম পালটে হয় স্ট্যান্ডার্ড লাইফ অ্যাসিওরেন্স। তাদের অফিস ছিল এই ভবনে। আজও দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। তবে চারদিকে ঘিরে থাকা তারের জটাজাল এবং ঘিঞ্জি দোকান-বাজার অনেকটা দৃশ্যদূষণ করেছে। চোখ বুজে কল্পনা করতে পারেন, এই অফিস যখন খ্যাতির শিখরে, তখন ঠিক কেমন দেখতে ছিল। তিনতলা বাড়ির দুটি অংশ জোড়া হয়েছে একটা ছোট্ট সেতু দিয়ে। তলা দিয়ে গিয়েছে ভ্যানসিটার্ট রো। এই রাস্তায় এক সময় ছিল অস্ত্র ব্যবসায়ী সংস্থা ‘রডা অ্যান্ড কোম্পানি’-র সদর দপ্তর। ১৯১৪ সালে অনুশীলন সমিতির সদস্যদের দ্বারা সংঘটিত ‘রডার অস্ত্র লুণ্ঠন’-এর পর সংস্থাটির নাম কলকাতায় মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে।
স্ট্যান্ডার্ড বিল্ডিংয়ের সূক্ষ্ম কারুকাজ করা গম্বুজ এবং বায়ুপতাকা আজও মুগ্ধ করে। প্রধান ফটকের দেওয়ালে রয়েছে দু’টি অবয়ব। জীবনের প্রতিনিধি বাতি হাতে এক যুবতী। মৃত্যুর রূপক নরকরোটি নিয়ে গ্রিম রিপার। দুইয়ে মিলিয়ে হয়ে উঠেছে বিমা সংস্থার প্রতীক।
বাড়িটি জীর্ণ হয়ে পড়ায় কয়েক বছর আগে সংস্কার করা হয়। রং করা হয় নতুন করে। তবে বেশির ভাগ রিলিফ স্থাপত্য অক্ষত রয়েছে। দেখতে ভুলবেন না।
গ্রেট ইস্টার্ন হোটেল
রেড ক্রস প্লেস থেকে রাজভবনের দিকে হাঁটলে রাস্তার দু’দিকে বেশ কয়েকটি পাথরের বাড়ি দেখতে পাবেন। ১৯১২ সালে ভাইসরয়ের আস্তাবল হিসেবে এগুলো গড়ে তোলা হয়েছিল। নবীন কর্মচারীরাও থাকতেন। শতাব্দীপ্রাচীন এই বাড়িগুলো এখন রাজভবনের স্টাফ কোয়ার্টার হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
রাজভবনকে ডাইনে রেখে হাঁটতে থাকলে পৌঁছে যাবেন কলকাতার প্রাচীন সুন্দরীর কাছে – গ্রেট ইস্টার্ন হোটেল। এখন যার নাম ললিত গ্রেট ইস্টার্ন কলকাতা। ১৮৪০ বা ৪১ নাগাদ স্থাপিত হয়। এই হোটেলকে এক সময় বলা হত ‘দ্য জুয়েল অফ দ্য ইস্ট’। ডেভিড উইলসন নামের এক রুটিওয়ালা গড়ে তোলেন এটি, নাম রাখেন অকল্যান্ড হোটেল। তখনকার গভর্নর জেনারেল লর্ড অকল্যান্ডের নামে। ১৮৮৩ সালে বিদ্যুৎ পরিষেবা চালু হয় অকল্যান্ডে, সারা ভারতে হোটেলগুলোর মধ্যে প্রথম।
আরও পড়ুন: ছুটি কাটান বাংলার ঐতিহ্যবাহী সব রাজবাড়িতে
প্রথমে একশোটি ঘর ছিল। ১৮৬০-এর দশকে অকল্যান্ডের নিয়ন্ত্রক সংস্থার নাম পালটে গিয়ে হল গ্রেট ইস্টার্ন হোটেল ওয়াইন অ্যান্ড জেনারেল পারভেয়িং কোম্পানি। তখন ঘরের সংখ্যাও বাড়ে। অন্যতম প্রথম সংস্থা, যার পরিচালক মণ্ডলীতে একজন ভারতীয় ছিলেন ১৮৫৯ সালে। ১৯১৫ সালে শেষমেশ নাম হয় গ্রেট ইস্টার্ন হোটেল। নিকিতা ক্রুশ্চেভ, নিকোলাই বুলগানিন, রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ, মার্ক টোয়েন, ডেভ ব্রুবেক, হো চি মিনের মতো আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্বরা এখানে থেকেছেন।
২০০৫ সালে সংস্কারের জন্য হোটেল বন্ধ করা হয়। সেই বছরই বিক্রি করা হয় একটি বেসরকারি সংস্থাকে। তখন পর্যন্ত এটি ছিল এশিয়ার মধ্যে একটানা সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে চালু থাকা হোটেল। ২০১৩ সালের নভেম্বরে নতুনভাবে যাত্রা শুরু করে গ্রেট ইস্টার্ন।
পরের সপ্তাহে আমরা হাঁটব এসপ্ল্যানেড অঞ্চলে। ততক্ষণ সফর শুভ হোক।