প্রযুক্তির জয়যাত্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে ঐতিহাসিক এইচএমভি!

দমদম নাগেরবাজার থেকে এয়ারপোর্ট যেতে গেলে অনেকেরই চোখ পড়ে এইচএমভি স্টপেজে। এখানে বাস দাঁড়ায়। কারো কারো চোখে পড়ে ভগ্নস্তূপের মতো দাঁড়িয়ে থাকা প্রকাণ্ড লালচে রঙের দেওয়াল যেখানে খোদিত আছে - হিজ মাস্টার্স ভয়েস (His Master’s Voice)। এই স্টুডিওতে সেদিন কল্যাণ সেন বরাটের সুরে মান্না দে ‘আগামী পৃথিবী শোনো’ গানটির রেকর্ডিং করছিলেন। মাত্র আট লাইন ছিল সংগীতশিল্পীর কন্ঠে। অথচ সেদিনই দমদম বিমনবন্দর থেকে ফ্লাইট ধরে তাঁর ব্যাঙ্গালোর রওনা হওয়ার কথা। কিন্তু বারবার করার পরেও কিছুতেই মনঃপুত হচ্ছিল না। শেষে কিনা তাঁর ফ্লাইট মিস করার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল।
এরকম অনেক গল্প জড়িয়ে ৩৩, যশোর রোডের ওপর অবস্থিত এইচএমভির সেই ঐতিহাসিক কারখানা ও স্টুডিও নিয়ে। একদা ঐতিহ্য, গ্ল্যামার, খ্যাতির চূড়ায় ছিল এই সংগীতের সাম্রাজ্য। রেকর্ড ক্যাসেট সিডি অতিক্রম করার পর যখন সাইবার মাধ্যমে মানুষ সংগীত শুনতে লাগল তখন ধীরে ধীরে ইন্টারনেটের সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে লাগলো এইচএমভি। দমদমের এইচএমভি ভগ্নস্তুপ তার গৌরবময় ইতিহাসের কথা বলে।
হিজ মাস্টার্স ভয়েস (HMV) লোগো
গৌরবময় ইতিহাস
কলকাতায় তখন বাবু কালচার। একটা জমজমাট বাবুদের সভায় গিয়ে মার্কিন সাহেব ফ্রেড গেইসবার্গ শুনেছিলেন শাস্ত্রীয় ঘরানার সংগীত শিল্পীদের নৃত্য এবং গান। সেখানেই তিনি গওহর জানের ঠুংরি শোনেন। কলকাতার বিখ্যাত সংগীতশিল্পী গওহর জান (Gauhar Jaan) এরপর রেকর্ডিং করতে রাজি হয়েছিলেন। তাই তাঁর সংগীত অমর হয়ে রয়ে গিয়েছে বিশ্বের ইতিহাসের পাতায়। মার্কিন রেকর্ডিং ইঞ্জিনিয়ার ফ্রেড গেইসবার্গের তত্ত্বাবধানে গ্রামোফোন কোম্পানি (Gramophone Company) গওহর জানের কণ্ঠে খেয়াল রেকর্ড করে। সেই প্রথম কোনো ভারতীয় সংগীত শিল্পীর গান ৭৮ আরপিএম রেকর্ড হিসেবে বের হলো। বাণিজ্যিকভাবে সেই প্রথম ভারতবর্ষের কোনো সংগীতশিল্পীর রেকর্ড বেরোলো। তারিখটা ছিল ১৯০২ সালের ৮ নভেম্বর।
গওহর জান
ধীরে ধীরে সাহেব গেইসবার্গ শাস্ত্রীয় সংগীতের শিল্পীদের নিয়ে প্রায় হাজারটার বেশি রেকর্ডিং করে ফেলেন। সেই তালিকায় ছিলেন রাই চাঁদ বড়ালের বাবা লাল চাঁদ বড়াল, অভিনেত্রী বিনোদিনীদাসী প্রমুখরা। ধীরে ধীরে এইচএমভি প্লেব্যাক গানের নতুন জগৎ তৈরি করল। ততদিনে শিয়ালদহ রেলওয়ে স্টেশনের কাছে একটা ফ্যাক্টরি প্রতিষ্ঠা করা হল কোম্পানির উদ্যোগে। ১৯০৮ সালের জুলাই মাস থেকে সেখানে রেকর্ড তৈরি হতে থাকলো।
এই ছিল কলকাতায় এইচএমভি কোম্পানির যাত্রার শুরুটা। তখন অবশ্য এইচএমভি নামকরণ হয়নি। ১৯০৯ সালে ফেব্রুয়ারি মাসে গ্রামোফোন কোম্পানি হিজ মাস্টার্স ভয়েস বা এইচএমভি (HMV) নামে ট্রেডমার্ক প্রকাশ্যে আনে।
১৯২৮ সালে দমদম এলাকায় যশোর রোডের বুকে তৈরি হলো এইচএমভির নতুন কারখানা। পরবর্তীকালে ৮০ বছর ধরে যা এইচএমভির ঘর বলেই পরিচিত ছিল।
ধীরে ধীরে ভারত ছাড়িয়ে এইচএমভি বার্মা ও শ্রীলঙ্কায় ডানা মেললো। পড়শি দেশ কলকাতাকে বাজাখানা (গান বাজনার আড়ত) বলে ডাকতে শুরু করল। শিয়ালদহ এইচএমভি ফ্যাক্টরি (HMV Factory) তখন রমরমিয়ে চলছে। ১৯২০ পরবর্তী সময় তখন। ১৯২৬ সালে শিয়ালদহ ফ্যাক্টরিতে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে আনা হল। তাঁর বিখ্যাত ১৪০০ সাল কবিতাটা রেকর্ডিং করা হলো।
এর পর ধীরে ধীরে দেখা গেল আধুনিক রেকর্ডিং প্রযুক্তি আয়ত্তে আনা বাকি রয়ে গেছে। তখনই ১৯২৮ সালে দমদম এলাকায় যশোর রোডের বুকে তৈরি হলো এইচএমভির নতুন কারখানা। পরবর্তীকালে ৮০ বছর ধরে যা এইচএমভির ঘর বলেই পরিচিত ছিল। গ্রামোফোন কোম্পানি দেশের অনেক জায়গায় যেমন বোম্বে, দিল্লি, মাদ্রাজ প্রভৃতি স্থানে নিজেদের রেকর্ডিং স্টুডিও প্রতিষ্ঠা করলেও সমস্ত জায়গার প্রেসিং অর্থাৎ রেকর্ডের গায়ে লেবেল করা হতো এই দমদমের এইচএমভি কারখানায়। অথচ আগে গওহর জানের রেকর্ডিং জার্মানি পাঠানো হতো রেকর্ডের গায়ে লেবেল করার জন্য।
ষাটের দশকের মাঝামাঝি বাজারে অডিও ক্যাসেট রমরমিয়ে চলতে শুরু হয়। প্রযুক্তি কেবলই এগিয়ে যাচ্ছিল। সংগীতের জগতে যুগান্তকারী সব প্রযুক্তি ব্যবহার হচ্ছিল। এইচএমভি তাই অডিও ক্যাসেটের ব্যবসায় ঝাঁপিয়ে পড়ল। এইচএমভির ১৯৮২ সালের একটি হিসেব দেখে জানা যায়, প্রতি মাসে প্রায় পঞ্চাশ হাজার থেকে এক লাখ চল্লিশ হাজার অব্দি বিক্রি হতো ক্যাসেট। আশির দশক সংগীতের জগতে প্রতিযোগিতায় আনলো কম্প্যাক্ট ডিস্ক অর্থাৎ সিডি। আরপিজি গ্রুপ ১৯৮৫ সালে এইচএমভি কিনে নিল। নাম হল, সারেগামা (Saregama)।
আজকের বাস্তব
আজ এইচএমভি রেকর্ডিং কোম্পানি (HMV Recording Company) প্রায় ভগ্নস্তূপের মতো দাঁড়িয়ে আছে। স্টুডিও আছে বটে, সেখানে বাইরের কিছু কাজকর্মও হয়। কিন্তু সেই স্বর্ণযুগ আর নেই। আরপিজি গ্রুপ প্রযুক্তি ব্যবহার করে কোম্পানির পুনরুজ্জীবনের চেষ্টা করলেও তা ফলপ্রসূ হয়নি। মাঝখানে এইচএমভির ফ্লোরগুলোকে বিভিন্ন সিরিয়ালের শুটিংয়ের প্রয়োজনে ব্যবহার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেটাও খুব লাভজনক হয়নি। একদা কলকাতার সেরা স্টুডিও প্রায় কিছু না হওয়ার জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে বর্তমানে। অনেকে আশঙ্কা করছেন যেকোনো দিনই এইচএমভি স্টুডিও সমেত কারখানা বিরাট আবাসনে রূপান্তরিত হতে পারে।
বর্ণময় এইচএমভি কয়েক বছর আগে (বাঁদিকে), এইচএমভি-র বর্তমান অবস্থা (ডানদিকে)
সুরকার কল্যাণ সেন বরাট ব্যথিত হৃদয়ে বঙ্গদর্শন.কম-কে বলেন, “এক সময় এই এইচএমভি আমাদের পথ দেখিয়েছে, সংগীত জগৎকে পথ দেখিয়েছে। যখন ওরা বলল আমরা আর নতুন কোনো প্রোডাকশন করব না, তখনই আমাদের সংগীত জগতের একটা মস্ত ক্ষতি হয়ে গেল।”
অতীতের এইচএমভির স্মৃতিচারণায় তিনি বলেন, “অনেক গানের রেকর্ডিং করতেই আমরা ওখানে যেতাম। সে সব দারুণ অভিজ্ঞতা। সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, হৈমন্তী শুক্লা, সুবীর সেন, মান্না দে এঁদের সঙ্গে ওখানে কাজ করেছি। কলকাতা শহরে এরকম উচ্চ প্রযুক্তির স্টুডিও আর দ্বিতীয়টি ছিল না। অসাধারণ মাইক্রোফোন, অসাধারণ মেশিনপত্র নিয়ে খুবই উচ্চ পর্যায়ের স্টুডিও ছিল এই সারেগামা এইচএমভির। সময়টাই ছিল আলাদা।”
কেমন ছিল সেই সময়টা? তিনি বলেন, “আজকের মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির মতো তখন পরিবেশ ছিল না। আমরা গান রেকর্ডিং করে চলে এসেছি। কোম্পানি প্রোমোশনের কথা ভেবেছে। আমরা রয়্যালটি পেয়েছি। যেটা এখনও পাচ্ছি। এইচএমভির সঙ্গে আমাদের অন্য সম্পর্ক ছিল।”
এইচএমভি-র স্টুডিওতে সত্যজিৎ রায়
শোনা যায়, বিশ্ববরেণ্য পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের খুবই প্রিয় জায়গা ছিল যশোর রোডের এইচএমভি স্টুডিও ও ফ্যাক্টরি। তাঁর বহু ছবির আবহ সংগীত এখানেই রেকর্ড করা হয়েছিল। শিল্পী, সুরকার, গায়কদের আত্মার সঙ্গে সম্পর্ক ছিল এইচএমভির। কল্যাণবাবুর কথায়, “একদিন ১৯-২০ জন যন্ত্রশিল্পী নিয়ে আমি এখানে কাজ করছিলাম। সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় রেকর্ডিং করতে এলেন আমাদের সবার জন্য বেলফুলের মালা আর টফি নিয়ে।”
একদা কলকাতার সেরা স্টুডিও প্রায় কিছু না হওয়ার জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে বর্তমানে। অনেকে আশঙ্কা করছেন যেকোনো দিনই এইচএমভি স্টুডিও সমেত কারখানা বিরাট আবাসনে রূপান্তরিত হতে পারে।
প্রয়াত শিল্পী জটিলেশ্বর মুখোপাধ্যায়ের স্মৃতিচারণায় একদা উঠে এসেছিল এইচএমভির এককালের প্রতিচ্ছবি। তিনি বলেছিলেন, “আমাদের সময় এইচএমভির স্টুডিওতে কোনো শীতাতপ যন্ত্র ছিল না। শীতের দিনেও স্টুডিওতে বসে ঘামতে হতো। আর গরমের দিনে তো জামা-কাপড় খুলে বসতে হতো। আমি নিজে দেখেছি, শ্যামল মিত্র খালি গায়ে বসে বসে গান করছেন, গায়ের গেঞ্জিটা কাঁধে। তার ওপর স্টুডিও ছিল দমদম এয়ারপোর্টের পাশে। যখন উড়োজাহাজ উড়ান দিত, তখনই মাঝপথে কাজ বন্ধ হয়ে যেত। আবার নতুন করে শুরু করতে হতো।”
আরও পড়ুন: ইন্দুবালা দেবীর প্রথম রেকর্ডিং
শ্যামল মিত্রের পুত্র সংগীতশিল্পী সৈকত মিত্র বঙ্গদর্শন.কম-কে বলেন, “ছোটোবেলায় বাবার সঙ্গে প্রথম এইচএমভিতে যাই ১৯৭০ সালে। কলকাতার সেরা রেকর্ডিং স্টুডিও ছিল নিঃসন্দেহে এইচএমভি। বাবার রেকর্ডিংয়ের সূত্রে বহুবার গিয়েছি। তারপর ১৯৮৮ থেকে ১৯৯৩ পর্যন্ত যখন আমার সঙ্গে এইচএমভির চুক্তি হলো তখন নিয়মিত যাতায়াত করেছি। রেকর্ড থেকে যখন ক্যাসেটের যুগ এলো, তখনই মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি পড়তির দিকে। তবুও এইচএমভি একটা আলাদা নাম ছিল।”
এইচএমভি-র বাইরের রাস্তা কিছু বছর আগে (বাঁদিকে), বর্তমান অবস্থা (ডানদিকে)
পঞ্চাশ থেকে আশির দশকে সব স্তরের বাঙালি এইচএমভি-র পুজোর গানের রেকর্ড কেনার জন্য অপেক্ষা করত। এইচএমভির পুজোর গানের বই ‘শারদ-অর্ঘ্য’ কেনার জন্য হুড়োহুড়ি কম কিছু ছিল না। শারদ-অর্ঘ্যের ভিতরে প্রতি পাতায় থাকত দুটি করে গান, সঙ্গে শিল্পীর ছবি। সে সময় শারদ-অর্ঘ্যের চাহিদা ছিল তুঙ্গে। অডিশন নিয়ে রীতিমতো গায়ক বাছাই করা হতো। লোকসংগীত শিল্পী ও গবেষক শুভেন্দু মাইতি বলেন, “পুজোর আগে আমরা ওখানে ভিড় করতাম, যদি একটু নতুন গান শোনা যায়।”
সমস্যাটা শুধু এইচএমভির নয়, সারা পৃথিবীর। প্রযুক্তির কল্যাণে সমগ্র সংগীত জগতের চেহারাটাই বদলে গেছে। তাই খারাপ লাগলেও শিল্পীরা মেনে নিয়েছেন। সৈকত মিত্র বলেন, “ব্যবসাটার ধরনটা পুরো পাল্টে গেছে। এখন বাড়িতে বাড়িতেই রেকর্ডিং স্টুডিও। সারা পৃথিবীতেই সিডি, ক্যাসেট এসবের বিক্রি শূন্য। অনলাইনের মাধ্যমেই এখন এইচএমভির মতো কোম্পানিগুলো তাদের গান বিক্রি করে। সেটাই তাদের রোজগার। আজকাল শুধু সংগীত বেচে কেউ আর টিকে থাকতে পারবে না বাজারে। তাই তাদের অন্য পথ ভাবতে হচ্ছে। এজন্য বেদনা তো হয়ই। তবে এটা অবশ্যম্ভাবী।”