‘রসিক’ উত্তমকুমার থেকে ‘বেপরোয়া’ ঋত্বিক ঘটক – অজানা ‘সিনেমাপাড়া দিয়ে’ হাঁটলেন তরুণ মজুমদার

সিনেমাপাড়া দিয়ে হেঁটে চলেছেন অবিস্মরণীয় এক যুবক। যার চোখে স্বপ্নের পাগলামি। সিনেমা সিনেমা আর সিনেমা – নতুন কিছু করতে চাওয়ার অদম্য ইচ্ছায় একসময় স্বপ্নের মুখোমুখি। তারপর সে কত কত কথা! তরুণ মজুমদার (Tarun Majumdar)। বাংলা চলচ্চিত্রে চির-তরুণ। কারণ তাঁর ছবিতে বারবার মুখ্য ভূমিকা নিয়েছে গ্রামবাংলা ও তার মন-মানসিকতা-মেজাজ-পট পরিবর্তন। পৃথিবীর বিপুল বিস্তৃত আকাশ আমাদের এক করে বেঁধে বেঁধে রাখতে চাইছে যেন। বারবার ঘরে ফেরার টান অনুভব হচ্ছে শিরায় মজ্জায়। শাপলা শালুক ভরা টলটলে পুকুর। নারকেল গাছের সারি, বাঁশবন। মাঝে মাঝে রোদ ঢুকছে, মাঝে মাঝে ছায়া। খড়ের চালের বসতবাড়ির মাঝে মাঝে টিনের চাল। মাচায় লাউ ডাটা ঝুলছে। আর রয়েছে বাঙালির চিরন্তন প্রেমের কিস্সা। এ কথা হলফ করে বলা যায়, একমাত্র তরুণ মজুমদারের ছবিতেই উঠে এসেছে হাজার রঙের গ্রাম – পলাশবুনি, কীর্ণাহার, মন্দিরা, বাতাসপুর, খণ্ডগ্রাম, বাতিকর, খয়রাশোল...।
সিনেমার পাশাপাশি তরুণ মজুমদারের দু-খণ্ডের স্মৃতিকথাধর্মী গ্রন্থ ‘সিনেমাপাড়া দিয়ে’ (Cinemapara Diye) বাংলা সাহিত্যকে ঋদ্ধ করল। এমন লেখনীর মায়াজাল সচরাচর দেখাই যায় না। পরিচালক/লেখক তাঁর সুবিস্তৃত জীবনের যাত্রাপথ বর্ণনা করছেন – অথচ স্বল্প কথায়। চলচ্চিত্রের পরিচালক বলেই হয়তো কম কথায় মহাজাগতিক ক্যানভাস তিনি বুনতে পেরেছেন। অথবা ভিতরে ভিতরে তিনি পরিপূর্ণ একজন কবি। দুই খণ্ডের এই বইয়ে রয়েছে পথের প্রান্তে ছড়ানো রঙের বিস্তার আর রয়েছে একজন সিনেমা-প্রেমী তরুণের দু-চোখ ভর্তি স্বপ্ন। রয়েছে সিনেমাপোকার জ্বালাতন আর প্যাশন প্যাশন এবং প্যাশন।
দে'জ থেকে প্রকাশিত তরুণ মজুমদারের স্মৃতিকথাধর্মী গ্রন্থ সিনেমাপাড়া দিয়ে
“আমার এই ক্ষুদ্র তুচ্ছ জীবনের সত্যিকারের সঞ্চয় বলতে এই সামান্য অভিজ্ঞতাগুলি ছাড়া আর তেমন কিছুই নেই। এর কোনওটা ছোটো, কোনওটা বড়ো। কিছু কিছু হয়তো কৃষ্ণপক্ষের আকাশপটে উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো, আবার এমনও আছে, অগণিত, যারা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্রমশ দূরবর্তী আবছা ছায়াপথে আশ্রয় নিয়েছে। কিন্তু হারিয়ে যায়নি কিছুই।” – একজন মহান কবি ছাড়া এ-কথা এমনভাবে কেই বা বর্ণনা করতে পারেন! লিখতে গিয়ে বলছেন, “...বাস্তবজীবনের আপাত-গদ্যময়তার আড়াল থেকে কাব্যেরাও জায়গা করে দেয় আমাদের জীবনযাত্রায়। মেকি মনে হলেও সেটাই সত্যি। অতএব নির্দোষ হওয়া সত্ত্বেও ক্ষমাপ্রার্থী।”
বইয়ের শুরুতেই শিশুমন জনসাধারণের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিল। আমরাও অতঃপর বুঁদ হতে থাকলাম এমন লেখনীর ভাষ্যে। ‘সিনেমাপাড়া দিয়ে’ এমনই এক গ্রন্থ – যেখানে চলচ্চিত্র ইতিহাসের পাশাপাশি জায়গা নিয়েছে সমকাল। অক্ষর-শব্দ দিয়ে যেন একজন পরিচালক তথ্যচিত্র নির্মাণ করছেন। জীবনের মতোই পাল্টে পাল্টে যাচ্ছে অধ্যায়। কখনও লংশট, প্যান, মিডশট। কখনও এক্সট্রিম ক্লোজআপ, স্লো মোশন, মন্তাজ। তরুণ মজুমদারকে সিনেমা কখনোই ছেড়ে গেল না। বইয়ে স্বমহিমায় রয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। রয়েছে নিউ থিয়েটার্স, বীরেন্দ্রনাথ সরকার, কাননদেবী, সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, সুচিত্রা সেন, উত্তমকুমার।
দুই খণ্ডের এই বইয়ে রয়েছে পথের প্রান্তে ছড়ানো রঙের বিস্তার আর রয়েছে একজন সিনেমা-প্রেমী তরুণের দু-চোখ ভর্তি স্বপ্ন। রয়েছে সিনেমাপোকার জ্বালাতন আর প্যাশন প্যাশন এবং প্যাশন।
কোনও এক জরুরি দরকারে সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে তরুণ মজুমদারের সাক্ষাৎকারের কথায় লিখেছেন, “গোদার আর ত্রুফোর ছবি সহজেই পাওয়া গেল। সত্যজিৎবাবুর (Satyajit Ray) ছবিও চারপাশে অঢেল। শুধু বেছে নেওয়ার ওয়াস্তা। কিন্তু ফেলিনির ছবি জোগাড় করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হল। কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না, হাজার চেষ্টা করা সত্ত্বেও। হঠাৎ মনে হল, এ ব্যাপারে যদি কেউ সাহায্য করতে পারেন তিনি একমাত্র একজনই। সত্যজিৎবাবু।” তারপরেই তাঁদের ফোনালাপ এবং সাক্ষাৎ হওয়া। তরুন লিখছেন, “যিনি একাধারে লেখক, চিত্রকর, চলচ্চিত্র নির্মাতা ও আরও অনেক কিছু, দেশ-বিদেশের বহু কীর্তিমানদের সঙ্গে যাঁকে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতে হয়, সময়ের দাম যাঁর কাছে অনেক- তিনি আমার জন্যে খুঁজেপেতে একটা ছবি বের করে দিলেন- অথচ ইন্ডাস্ট্রিতে বদনাম আছে তিনি নাকি অসম্ভব নাক-উঁচু আর দাম্ভিক। এর চেয়ে হাসির কথা আর কী হতে পারে?”
'বন্ধু' সত্যজিৎ রায়
ঋত্বিক ঘটক (Ritwik Ghatak) প্রসঙ্গে শ্রী মজুমদার লিখছেন, “সিনেমা যে মনোরঞ্জনের বস্তু নয়, সমাজসচেতনতা বাড়াবার হাতিয়ার – এটা প্রমাণের জন্যে এমন এমন বিষয়বস্তু বেছেছেন, এমন সাহস দেখিয়েছেন, যা দেখে শ্রদ্ধায় মাথা নিচু হয়ে যায়। তীক্ষ্ণ, সাহসী আর বেপরোয়া। এক কথায় শাণিত তরোয়াল যেন। দেশভাগের মর্মান্তিক জ্বালা নগ্ন নির্মম করে ফোটানোর তাগিদ আর কে অনুভব করেছেন ওঁর মতো? ধীবরদের জীবন আর নকশাল আন্দোলনের বিশ্লেষণ কার ছবিতে এমন করে স্থান পেয়েছে?”
আরও লিখছেন, “লাঞ্চের পর ঘরভর্তি আমার শিল্পীরা। গানের ঠোঁট মেলানোর রিহার্সাল চলছে। হঠাৎ আমার এক সহকারী, নাম পুনু সেন, দৌড়ে এসে বলে
- সর্বনাশ হয়েছে।
- মানে? আমি জানতে চাই।
- ঋত্বিকদা।
- মানে?
- ঋত্বিক ঘটক। কোন ফাঁক পেয়ে আমাদের সেট-এ ঢুকে পড়েছে। একবার এই অ্যাঙ্গেল থেকে দেখছে, একবার ওই অ্যাঙ্গেল থেকে। আমাকে দেখতে পেয়ে বলল, ‘কী রে...’ তারপর খুব একটা খারাপ গালাগাল দিয়ে ‘তোদের ডিরেক্টর কোথায়? ডাক শালাকে।’
'বেপরোয়া' ঋত্বিক ঘটক
এ বই পড়তে পড়তে মনে হয়েছে তরুণ মজুমদারের পরিমিতিবোধ। কোথাও মাত্রাতিরিক্ত আলোচনা নেই, কথার পিঠে কথার দ্বন্দ্ব নেই, বরং প্রকাশিত হয়েছে লেখকের স্বভাবলাজুক দিক। গ্রন্থের শুরুতেই জনসাধারণের উদ্দেশ্যে বলেছেন, এ তাঁর আত্মজীবনী নয়। বরং এ গ্রন্থে একজন শিল্পীর চেয়ে বড়ো হয়ে উঠেছে শিল্প। শিল্পীর দেখার চোখ যে কী তীব্র হতে পারে, তার উচ্ছ্বাস শোভা পেয়েছে কয়েকটি কথায়, “নদীর এপারে আমি, আর আমার বানানো ছবির ফ্রেমগুলো সব নদীর ওপারে। মাঝখানে দাঁড়িয়ে আধুনিক টেকনোলজি— দুর্লঙ্ঘ্য একটা ব্যবধান তৈরি করে দিয়ে মিটিমিটি হাসছে।”
অযথা খ্যাতি বা প্রচারের আলোয় ছোটেননি তরুণ মজুমদার। বড়ো বড়ো ফিল্মি পার্টি চিরকাল এড়িয়ে গেছেন। তাঁর ছোটোবেলা কেটেছে বগুড়া নামের একটা ছোট্ট শহরে। এখন তা বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্ত। দেশভাগের পর চলে আসেন এপার বাংলার উত্তরবঙ্গে। ভুটান বর্ডারের কাছাকাছি প্রায়। বাংলাদেশের (Bangladesh) বগুড়ার স্কুল, কলকাতার স্কটিশ চার্চ ও সেন্ট পলস কলেজের ছাত্র তরুণ ধীরে ধীরে নিজের মতো খুব সাধারণ ছবিই বানাতে চেয়েছিলেন। চেয়েছিলেন বাংলার ঘরে ঢুকে সেই ঘরের মানুষদের কথাই বলবেন। কিন্তু হঠাৎ করে সিনেমায় কেন? সে কথা নিজেই স্বল্প পরিসরের মাধ্যমে ব্যক্ত করেছেন, “কলেজের পাট চুকিয়ে যখন ভাবছি এবার কী করব, কোন পথ ধরা যায়, এমন সময় বলা নেই কওয়া নেই মনের মধ্যে একটা পুরোনো পোকা কুটুস করে কামড় বসালো। এই পোকাটির নাম যে সিনেমা পোকা তা বুঝতে সময় লাগছে।”
এ বই পড়তে পড়তে মনে হয়েছে তরুণ মজুমদারের পরিমিতিবোধ। কোথাও মাত্রাতিরিক্ত আলোচনা নেই, কথার পিঠে কথার দ্বন্দ্ব নেই, বরং প্রকাশিত হয়েছে লেখকের স্বভাবলাজুক দিক। গ্রন্থের শুরুতেই জনসাধারণের উদ্দেশ্যে বলেছেন, এ তাঁর আত্মজীবনী নয়।
মৌসুমী চট্টোপাধ্যায় থেকে তাপস পাল – এমন অনেক অভিনেতাই তাঁর চলচ্চিত্রে প্রথম অভিনয় করেছিলেন। বহু অভিনেতার আসল নাম বদলে নিজে নামও দিয়েছেন। যেমন ইন্দিরা চট্টোপাধ্যায়ের মৌসুমী চট্টোপাধ্যায় হয়ে যাওয়া। এমন অসংখ্য উদাহরণ আছে। এ গ্রন্থেও তাঁদের কথা উল্লিখিত আছে। যেমন কাননদেবীর (Kanan Devi) কথা তিনি একটিমাত্র শব্দে বর্ণনা করেছেন – ‘থিরবিজুরি’। পরে সেই কাননদেবীরই প্রযোজনা সংস্থায় শিক্ষানবিশ হয়ে ঢোকেন যুবক-তরুণ। সেখানেই আলাপ দিলীপ মুখোপাধ্যায় আর শচীন মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে। সেই আলাপ থেকে সূত্রপাত ‘যাত্রিক’ গোষ্ঠীর। পরিচালনার জগতে পদার্পণ ঘটে তরুণ মজুমদারের। নির্মিত হয় যাত্রিকের প্রথম ছবি ‘চাওয়া পাওয়া’। তারপর সেই যাত্রিক ছেড়ে শুরু হল ‘একক’ তরুণ মজুমদারের মহাযাত্রা।
এ বই পড়লে জানা যাবে কথায় কথায় উত্তমকুমারের (Uttam Kumar) ‘হরিবোল’ বলা, সুচিত্রা সেনের (Suchitra Sen) কঠিন ব্যক্তিত্বের আড়ালে রয়ে যাওয়া মমত্ববোধ। শুটিং ইউনিটের লোকজন সামান্য বন্ধু থেকে হয়ে ওঠে আত্মীয়। আবার লিখেছেন, উত্তমকুমার শীতের সকালে ইঁদারার হিম জল বালতি বালতি ঢেলে স্নান করিয়ে দিচ্ছেন ইউনিটের সকলকে। এক জনের পালা শেষ হলে হাঁক দিচ্ছেন— ‘নেক্সট...’। আবার ‘সংসার সীমান্তে’ ছবির জন্য প্রয়োজন ছিল যৌনপল্লির। আস্ত একটা যৌনপল্লি নিজের হাতে নির্মাণ করেছিলেন। আজকের ঝাঁ চকচকে স্টুডিওর যুগে এ হয়তো কিছুই নয়। কিন্তু সেকালে এই অসম্ভবকে সম্ভব করেছিলেন শ্রী মজুমদার এবং তাঁর টিম। কিছু দূর এগিয়ে আবার লিখছেন সাত সকালে হাফ প্যান্ট পরে শচীন দেব বর্মনের (SD Burman) জগিং করা এবং যুবক রাহুল দেব বর্মন প্রসঙ্গে তরুণ মজুমদারকে বলা সাবধানবাণী “তুমি কি অর লগে মেশো নাকি রে ভাই? মিশবা না, মিশবা না। বান্দর হইসে একডা।’ রয়েছে পাহাড়ি সান্যাল নামে এক উদাসী গায়কের কথন।
ম্যাডাম মিসেস সেন
‘পথের পাঁচালি’ (Pather Panchali) মুক্তির পর ছবি দেখে মুগ্ধ হয়ে যাওয়ার অমলিন স্মৃতি লিখতে গিয়ে বলছেন সারা শহরে ব্যানার হাতে করে ঘোরা। মিছিলে পা বাড়িয়েছেন কত কত সিনেপ্রেমী যুবক। তরুণের হাতের ব্যানারে লেখা ‘পথের পাঁচালি দেখুন’। একজন পরিচালক আরেক পরিচালকের ছবি দেখতে বলছেন মিছিলের মধ্যে দিয়ে, এই সততা আজকের ওটিটি আর মোবাইল নির্ভর যুগে প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তরুণ মজুমদার আজীবন মানুষের কথাই বলে এসেছেন। ‘আমি’সর্বস্ব চিরাচরিত দুনিয়ার বাইরে গিয়ে এ গ্রন্থে পরিচালক তরুণ মজুমদারের নিজের পরিচয়ের থেকেও বড়ো হয়ে উঠেছে সাধারণ মানুষ। বাংলা সাহিত্যে ‘সিনেমাপাড়া দিয়ে’ এক পরমপ্রাপ্তি। এ গ্রন্থ পড়লে উপলব্ধি হবে তরুণ মজুমদার কত বড়ো মাপের একজন লেখক।
তরুণ মজুমদার
লাইট-ক্যামেরা-অ্যাকশনের পিছনে দৌড়ে বেড়ানো তরুণ এক জাদুঘরের সন্ধান দিচ্ছেন এ গ্রন্থে। যেখানে উঠে আসছে মণিমাণিক্য। যেন রূপকথার গল্প পড়ছি। ৯০০ পাতার দু-খণ্ডের এই বই হয়ে উঠেছে আস্ত চিত্রনাট্য। শুধু তরুণ মজুমদারের হাতে ক্যামেরার বদলে রয়েছে কলম।
তরুণ মজুমদার দেখুন। তরুণ মজুমদার পড়ুন।
____________________________
ব্যবহৃত ছবিগুলি মূল গ্রন্থ থেকে গৃহীত। শিল্পীঃ রঞ্জন দত্ত
সিনেমাপাড়া দিয়ে (দুই খণ্ড) - তরুণ মজুমদার - দে’জ পাবলিশিং – মুদ্রিত মূল্য ৯৯৯