চুরিবিদ্যা মহাবিদ্যা...কোথা থেকে এল এই কথা?

চুরিবিদ্যা মহাবিদ্যা যদি না পড় ধরা। এই কথা আমাদের খুব চেনা। এই চুরিবিদ্যা নিয়েই আস্ত একটি বই লিখেছেন সংস্কৃত কাব্য ও কাব্যতত্ত্ব বিষয়ে তরুণ পণ্ডিত (জন্ম-১৯৮৮) অধ্যাপক পুরীপ্রিয়া কুণ্ডু। সংস্কৃত পুস্তক ভাণ্ডার প্রকাশিত (মূল্য-৬৫০টাকা) এই বইয়ের নাম, ‘চৌর্য সমীক্ষা’। এই বইয়ের সবটা হয়তো সাধারণ পাঠকের বুঝতে অসুবিধা হবে, কিন্তু যতটুকু বোধগম্য হবে তাতেই পাঠক আলোকিত হবেন, বিস্মিত হবেন, তৃপ্ত হবেন। এই বইয়ের প্রাক কথনেই আমাদের তিন জন সংস্কৃত জানা চোরের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিয়েছেন অধ্যাপক বিজয়া গোস্বামী। প্রথম জন শর্বিলক, শূদ্রক রচিত ‘মৃচ্ছকটিক’-এর চোর। এই শর্বিলকের সূত্রেই তিনি প্রথম চুরিবিদ্য বা চৌর্যশাস্ত্রের কথা প্রথম জানতে পারেন। দ্বিতীয় চোর সজ্জলক। তাকে পাওয়া যাবে ভাসের খণ্ডিত নাটক ‘চারুদত্ত’তে। তৃতীয় চোরের নাম অপহারবর্মা। তাকে পাওয়া যাচ্ছে দণ্ডীর ‘দশকুমারচরিত’-এ। অপহারবর্মার সঙ্গে অপহরণ শব্দের কোনও যোগ আছে কি না, তার অবশ্য কোনও উল্লেখ নেই।
পুরীপ্রিয়া তাঁর বইয়ে লিখেছেন, প্রাচীন ভারতে চৌর্যবিদ্যা একটি কলা হিসেবে স্বীকৃত হত। বাৎসায়ণ তাঁর ‘কামসূত্রম্’-এ এই কথা স্বীকার করে বলেছেন - “হস্তলাঘবম্,...ইতি চতুঃষষ্টিরঙ্গবিদ্যাঃ কামসূত্রস্যাবয়বিন্যঃ”। চুরি যেহেতু এক প্রকারের কলা বা আর্ট, সেজন্য চোরেরা গৃহস্থের বাড়িতে এমনভাবে সিঁদ কাটবে, যা এক প্রকারের দৃষ্টনন্দন স্থাপত্য রূপে বিবেচিত হবে এবং নগরবাসীরা সকালে ঘুম থেকে উঠে সেই চৌর্যকর্ম দেখে চোরের নিন্দা করলেও তার শৈল্পিক গুণের প্রশংসা না করে পারবে না। আবার চুরি যেহেতু আর্ট, ফলে চোর যখন জনসমক্ষে আসবে, নিজেকে অত্যন্ত সুন্দর ও আকর্ষণীয় করে নিজেকে সকলের সামনে উপস্থাপন করবে। পুরীপ্রিয়া লিখেছেন, এই চৌর্যকলাবিদ্যার প্রবর্তক হলেন স্বয়ং ষণ্মুখ বা কার্তিক। যদিও বেদে রুদ্রকে চোরদের উপাস্যরূপে বন্দিত হতে দেখা যায় এবং বঙ্গদেশে চোরদের আরাধিতা হলেন কালী, তথাপি ‘ষণ্মুখকল্পম’ চৌর্যশাস্ত্রে তস্করদের উপাস্যরূপে পাওয়া যায় চৌরকার্তিক বা ষণ্মুখের নাম। মনে করা হয় যে তিনি তাঁর শিষ্য তস্করদেরর চৌর্যবিদ্যা শিক্ষা দিয়েছিলেন; কিন্তু তখন তা লিপিবদ্ধ করা হয়নি। গুরুশিষ্যপরম্পরায় স্মৃতিতে রক্ষিত হত। এর বহু পরে মঙ্গল নামে কোনও এক আচার্য এই অবলুপ্তপ্রায় চৌর্যশাস্ত্রটি লিপিবদ্ধ করার তাগিদ অনুভব করেন। চৌর্যশাস্ত্র সংক্রান্ত দুটি পুঁথির অস্তিত্ব পাওয়া যায়। এর মধ্যে একটি কলকাতার এশিয়াটিক সোসাইটিতে রক্ষিত ‘ষণ্মুখকল্প’ অপরটি পুণের ভাণ্ডারকর অরিয়েন্টাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট-এ রক্ষিত ‘চৌরচর্য্যা’। চৌর্যশাস্ত্রের প্রবর্তক ও তস্করাধিপতি কার্তিক ছয় মুখ দিয়ে ছয় কৃত্তিকার স্তন পান করার জন্য তিনি ষণ্মুখ। সুধীরচন্দ্র সরকার সংকলিত পৌরাণিক অভিধান অনুসারে, সপ্তর্ষি, মানে ব্রহ্মার মানসপুত্র সাত জন ঋষি – মারীচ, অত্রি, পুলহ, পুলস্ত্য, ক্রতু, অঙ্গিরা ও বশিষ্ঠ, যাঁরা সপ্তর্ষিমণ্ডল নামে অবস্থান করেন আকাশের ঈশান কোনে, এই ঋষিদের মধ্যে বশিষ্ঠর স্ত্রী অরুন্ধতী বাদে, বাকি ছয় জনের স্ত্রী হলেন কার্ত্তিকের ছয় মা। ছয় কৃত্তিকা। এঁরা একদিন সকালে গঙ্গাস্নানে গিয়ে অগ্নি সেবন করেন। সেই অগ্নির তেজে তাঁরা গর্ভবতী হন। পরে তাঁরা সকলেই সেই তেজ হিমালয় শিখরে পরিত্যাগ করেন। সেই মিলিত তেজঃপুঞ্জ থেকে জন্ম হয় কার্তিকের। কার্তিকের ছয় মায়ের নাম যথাক্রমে কলা, অনসূয়া, ক্ষমা, হবির্ভূ, সন্নতি এবং শ্রদ্ধা। ছয় মায়ের স্তন্যপান করতে হবে বলেই কার্তিকের ছয় মস্তক, দ্বাদশ কর্ণ, দ্বাদশ চক্ষু, দ্বাদশ বাহু, এক গ্রীবা এক জঠরবিশিষ্ট। তাই তিনি ‘ষড়ানন’।
কার্তিকের ১২ হাতে যে অস্ত্র থাকে তা চুরির কাজে লাগে, এমনই মত পুরীপ্রিয়ার। আর কার্তিকের যে বাহন ময়ূর, সেটা কার্তিককে দিয়েছিল ঋষি কাশ্যপ এবং তার স্ত্রী বিনতার পুত্র ও বিষ্ণুর বাহন গরুড়। এই কার্তিকের স্ত্রী হলেন দেবসেনা, যিনি ষষ্ঠীরূপে পরিচিত। তবে এটাও বলার কার্তিকের ভাই গণেশও কোথাও কোথাও চৌরগণেশরূপে পরিচিত। সেইজন্য বলা হব, জপের সময় অঙ্গুলিসন্ধি ছাড়লে চৌরগণেশ জপের ফল হরণ করে।
এই চৌর্যশাস্ত্রে রয়েছে কী করে চুরি করতে হবে, কী করে জলের উপর দিয়ে যেতে হবে, কী করে গৃহস্থের চোখে ধুলো দিতে হব, বা কী করে দরজা খুলতে হয় ইত্যাদি। আমরা এখন যেমন দেখি অপরাধ জগতের অদ্ভুত ভাষা, সেই ভাষারও উল্লেখ রয়েছে ‘ষণ্মুখকল্পম’-এ। সেইসব দুর্বোধ্য শব্দের একটি তালিকাও দেওয়া হয়েছে পুরীপ্রিয়ার এই বইয়ে। যেমন - আধাতোত্তরতত্রকস্য, পুন্সয়িত্বা ষুণ্ডডিকো, পচান্তরীক্ষে, ভূলূপ ক্ষৌমেন, ছিদ্রামেংদিনী, দামাদামিনিষুর, চারুকুন্দে, দণন্তুত, রিষিঙক্রাদিপ্যস্তু, তবরঙ্কুদিদম, বস্তৈ, প্রল্য, বির্লে, মাসনে, দানোরসে, সাপেরুরে, কাকমাচি, বত্রং, ল ইত্যাদি। এই বইয়ে এর সঙ্গে আছে, ‘রামায়ণ’, ‘মহাভারত’, পুরাণ, সংস্কৃত সাহিত্যে চুরি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা।
বই - চৌর্য সমীক্ষা
লেখক - পুরীপ্রিয়া কুণ্ডু
প্রকাশনা - সংস্কৃত পুস্তক ভাণ্ডার
মূল্য - ৬৫০টাকা