‘কালচার’ অর্থে আনলেন ‘সংস্কৃতি’ শব্দ, স্ত্রী-র মৃত্যুতে অশৌচ পালন করেছিলেন সুনীতিকুমার

কোনও বিষয়েই গোঁড়ামি তাঁর পছন্দ ছিল না৷ অথচ নিজেকে নাস্তিক পরিচয় দিয়ে কোনওরকম বাহাদুরি প্রদর্শনেরও চেষ্টা করেননি৷ ঈশ্বরের অস্তিত্ব সম্পর্কে তাঁর অনুভব এরকম--- হৃদয় দিয়ে বিচার করলে মনে হয় ঈশ্বর আছেন, কিন্তু মস্তিষ্ক দিয়ে বিচার করলে কিছু পাওয়া যায় না৷ তাঁর মতে ঈশ্বর থাকতেও পারেন নাও থাকতে পারেন৷ অথচ জীবনে শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য যথেষ্ট নিষ্ঠার সঙ্গে ধর্মাচরণ করতেন তিনি৷ দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের অমলিন দাম্পত্য জীবন তাঁদের৷ ১৯৬৪ সালের ৮ ডিসেম্বর পত্নীর মৃত্যু তাঁর জীবনে বড়ো আঘাত বয়ে এনেছিল৷ ছেলের সঙ্গে তিনি নিজেও পূর্ণ অশৌচ পালন করেছিলেন৷ তাঁর মতে, স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রীর এত কিছু করণীয় ও ত্যাগের বিধান আছে, সেখানে স্ত্রীর মৃত্যুর পর স্বামীর কোনওরকম নিয়মনিষ্ঠা পালনের বিধান নেই৷ এমনকি স্বামী ইচ্ছে করলে স্ত্রীর মৃত্যুর পরদিনই বিবাহও করতে পারে---এ হল হিন্দু ধর্মের এক প্রকার অবিচার৷ এহেন উদার তথা মুক্তমনা মানুষটির নাম সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়৷
তিনি ভাষাবিদ৷ আবিশ্ব-ভারত তাঁকে ভাষাতাত্ত্বিক হিসেবেই চেনে৷ স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ তাঁকে দিয়েছিলেন ‘ভাষাচার্য’ শিরোপা। রবিঠাকুর তাঁর ‘বাংলা ভাষা পরিচয়’ (১৯৩৮) উৎসর্গ করেছিলেন তাঁকে৷ উৎসর্গপত্রে লিখেছিলেন--- ‘ভাষাচার্য শ্রীযুক্ত সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় করকমলে’৷ ১৯২৭ সালে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ইন্দোনেশিয়া, জাভা, সুমাত্রা, থাইল্যাণ্ড, মালয়, বালি ইত্যাদি স্থান ভ্রমণ করেন সুনীতিকুমার৷ রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘জাভাযাত্রীর পত্র’-এ তাঁর সম্বন্ধে বলেছিলেন, সুনীতিকুমারের ছিল ‘বিশ্ব-ব্যাপারের প্রতি’ মনের সজীব আগ্রহ৷ অসম্ভব স্নেহ করতেন তিনি বয়সে ২৯ বছরের ছোট সুনীতিকুমারকে৷ তাঁর ‘শেষের কবিতা’ উপন্যাসের নায়ক অমিতর হাতে তুলে দিয়েছিলেন সুনীতিকুমারের বাংলাভাষার ‘শব্দতত্ত্ব’৷ যদিও গ্রন্থনামটি রবীন্দ্রকল্পিত৷ কিন্তু এর মাধ্যমে তাঁর প্রতি রবীন্দ্রনাথের যে কতটা শ্রদ্ধাবোধও ছিল তা বোঝা যায়৷
মাস খানেক আগেই আমরা তাঁর ১৩০তম জন্মদিনটি পেরিয়ে এলাম (২৬ নভেম্বর, ২০১৯)৷ তাঁর দীর্ঘ ৮৭ বছরের জীবনে (১৮৯০-১৯৭৭) ক্লান্তি শব্দটি তাঁকে যেন ভয় পেত৷ তাঁর বাংলা ভাষার উৎস ও ক্রমবিকাশ সম্পর্কে বিপুলকায় গবেষণা কর্মটি ভাষাজিজ্ঞাসা ক্ষেত্রে একটি মাইল ফলক৷ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যেটি ১৯২৬ সালে 'The Origin and Development of the Bengali Language' নামে প্রকাশিত হয়৷ তাঁর তত্ত্বে যে যুক্তিবাদিতা ছিল সেটি তদানীন্তন ভাষাবিদদের মুগ্ধ করেছিল৷ ভাষাচিন্তায় নূতন দিগন্ত খুলে দিয়েছিলেন তিনি৷ ভাষার উৎসরূপ নির্ণয়ে যুক্তিনির্ভর ঐতিহাসিক পদ্ধতির কথা তিনি বলেছিলেন৷ তিনি যেমন নিখুঁতভাবে ভাষাকে বিশ্লেষণ করেছেন তেমনি এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তাঁর অসাধারণ গদ্যশৈলী৷ ভাষা ছাড়াও তাঁর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু জুড়ে রয়েছে শিল্প, সংস্কৃতি, ইতিহাস, দর্শন, সংগীত ইত্যাদি৷ অসাধারণ ছবিও আঁকতেন৷ সুকুমারী ভট্টাচার্য তাঁর স্মৃতিচারণায় শিক্ষক সুনীতিকুমার সম্পর্কে বলেছেন যে, শ্রেণিকক্ষে ভাষাসংক্রান্ত আলোচনাকে কীভাবে সরস করে উপস্থাপিত করা যায় তা তিনি ভালো জানতেন৷ আসলে মানুষটি ছিলেন সর্ববিদ্যা বিশারদ৷ তাই বিভিন্নবিদ্যার মধ্যে ওরিয়েন্টেশন-এর একটা সহজ ক্ষমতা ছিল তাঁর৷
Culture শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ ‘কৃষ্টি’, যা নাকি রবিঠাকুরের একেবারেই না-পসন্দ ছিল৷ অতএব সুনীতিবাবুর উপর দায়িত্ব দিলেন একটি যোগ্য শব্দ সন্ধান করতে কালচারের বাংলা হিসেবে৷ কাজেই কাল বিলম্ব না করে সুনীতিবাবুও একটা জুতসই শব্দ খুঁজতে লাগলেন৷ অবশেষে তাঁর এক মহারাষ্ট্রীয় বন্ধুর থেকে জানতে পারলেন যে তাঁরা 'Culture' অর্থে ‘সংস্কৃতি’ শব্দটি ব্যবহার করেন৷ তাই বাংলাতেও সংস্কৃতি শব্দটিকেই কালচারের প্রতিশব্দ হিসেবে পছন্দ করলেন সুনীতিকুমার৷ যা রবীন্দ্রনাথও সাদরে গ্রহণ করলেন৷
বলাবাহুল্য, বিশ্বের দরবারে সুনীতিবাবু ‘ভারতের সাংস্কৃতিক দূত’ হিসেবেই সম্মানিত হতেন৷ তাঁর মতে, এই পৃথিবী--- সম্পর্ক, সংস্কৃতি ও সম্প্রীতির৷ এই পৃথিবী সম্পর্কে তাঁর অভিজ্ঞতার কথা লিখে গেছেন ‘ইউরোপ ১৯৩৮’-এ৷ আবার ভারতীয় সংস্কৃতির প্রতিও তিনি যে কতটা শ্রদ্ধাশীল ছিলেন তার প্রমাণও আছে৷ যেমন, ‘সাংস্কৃতিকী’, ‘ভারতসংস্কৃতি’, ‘সংস্কৃতি শিল্প ইতিহাস’ ইত্যাদি বই৷ এই গ্রন্থগুলির বিভিন্ন প্রবন্ধে তিনি ভারতীয় সংস্কৃতির ইতিহাস পর্যালোচনা করেছেন৷ আলোচনা করেছেন শিল্পকলা তথা ঐতিহ্য পরম্পরা নিয়ে৷ এ দেশের জাতি, ধর্ম ও পুরাণ প্রসঙ্গও তাঁর আলোচ্য বিষয় ছিল৷ সংস্কৃতির সূত্র ধরেই এসেছে সাহিত্যের আলোচনাও৷
আমাদের কাছে তিনি সিরিয়াস ভাষাতাত্ত্বিক বা বহু বিদ্যার আকর৷ তবে মেধার সঙ্গে রসবোধ সহজাতভাবেই থাকে৷ সুনীতিকুমারও এর ব্যতিক্রম নন৷ তাঁর গাম্ভীর্যের আড়ালে সূক্ষ্ম রসবোধের অনেক দৃষ্টান্ত রয়েছে৷ লেখক নারায়ণ সান্যালের ‘লেঅনার্দোর নোটবই এবং...’ গ্রন্থের ‘গোষ্পদে প্রতিবিম্বিত পূষণ’ প্রবন্ধটি তেমনই প্রমাণ দিচ্ছে৷ বেশ আমুদে মানুষকেই আমরা সেখানে খুঁজে পাই৷ সময়টি ১৯৭৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাস৷ নারায়ণবাবুর বড়ো মেয়ের বিয়েতে আমন্ত্রিত হয়ে এলেন সুনীতিকুমার৷ জানালেন সন্ধ্যা ৭ টায় একটা ‘বক্তিমে’ আছে৷ অথচ ‘ঢুঁ’ মেরে না গেলেই নয়, তাই এলেন৷ কনেকে সাজানোর তোড়জোড় চলছে৷ সন্ধ্যা লগ্নেই বিয়ে৷ আহারের দায়িত্বে দক্ষিণ কলকাতার সবচেয়ে বিখ্যাত ক্যাটারার বিজলী গ্রিল৷ তাঁকে আপ্যায়নের জন্য কিছু খাবার নিয়ে আসার কথা জানালে তিনি বললেন---“আসুন৷ অল্প অল্প করে চেখে দেখি!” ক্যাটারারের ম্যানেজার একটি থালায় আহার্য সাজিয়ে নিয়ে এলেন যথারীতি৷ সুনীতিবাবু একটি ভোজ্যদ্রব্য দেখিয়ে বললেন--- “ওটি কী?” নারায়ণবাবু বেশ গর্বের সঙ্গেই জানালেন সেটি ‘ফিশ ওলী’৷
খেতে খেতেই সুনীতিবাবু জানতে চাইলেন ‘ফিশ-এর ওলী’ মানে কী? খাবারের দেশ জাতির পরিচয় দেওয়া উপস্থিত সকলের পক্ষেই বেশ কঠিনতম কাজ হল৷ অগত্যা ম্যানেজারবাবু জানালেন যে সেটি ভেটকি মাছের ফিশ ওলী৷ এবার তিনি বানান জানতে চাইলেন৷ জানানো হল ‘ও’ আর ‘লয়ে দীর্ঘঈ’৷ সুনীতিবাবু জানালেন যে “সেটা তো সাঁত্রাগাছীর ওল ‘স্ত্রীয়াম্ ঈপ্”৷ তিনি রোমান হরফে বানানটা চাইছেন৷ হয় জার্মান নয় ফ্রেঞ্চ এমন উত্তরে তিনি জানালেন, ‘জার্মান ভাষায় ভাজাকে বলে gebacken অথবা gebraten; ফরাসী ভাষায় ভাজা মাছ হচ্ছে frit poissons’৷ তিনি আরো জানালেন, স্প্যানিশে মাছ ভাজা frito pescado, ইতালিয়ান ভাষায় fritte pesce৷ তাহলে ওলীর উৎপত্তি কোথা থেকে? পরিস্থিতি বুঝে নারায়ণবাবুর মেজদা বললেন আপাতত রান্নাঘর থেকে এলো মাছভাজা---এভাবেই ধরতে৷ এহেন রসিকতায় খুশি হয়ে তিনিও রসিকতা করে বললেন--- “তাই বলুন! মাছ ভাজা ! ওলী নয়! তাহলে ওপিঠটা খাওয়া যেতে পারে৷ ওলীর এ-পিঠ ও-পিঠ কিছুই চিনি না, ভাজামাছ উল্টে খেতে জানি!”
আর একবার নারায়ণবাবু তাঁকে ‘আপনি’ সম্বোধন করতে নিষেধ করলেন সুনীতিকুমারকে৷ এতে সুনীতিবাবু বেশ কৌতুককর উত্তর দেন--- “না, না! ওটা আমার ধাতে নেই৷ ‘আপনি-তুমি’ রকমফের করতে হলে ঐ সঙ্গে ক্রিয়াপদগুলোকেও তো বদলাতে হয়৷ সে বড়ো বখেড়া৷ তাই আমার ছাত্রের ছাত্রকেও ‘আপনি’ বলি”৷ স্বাভাবিক কথাবার্তার মধ্যেই একটা রসবোধ ছিল তাঁর৷ এর সঙ্গেই যুক্ত হয়েছিল তাঁর মানসিক উদারতা৷ তাই তো সমসাময়িক অন্য লেখকদের লেখা পড়েও তিনি তাঁদের মতামত দিয়ে উৎসাহিত করতেন৷ অগাধ পাণ্ডিত্যের সঙ্গেই তাঁর ব্যক্তিত্বকে অধিকতর শ্রীমণ্ডিত করেছিল তাঁর মানসিক ঔদার্য ৷