দুর্ভিক্ষ প্লেগ মহামারী এবং

বুন্দেলখন্ডে শুরু হয়ে দুর্ভিক্ষ ছড়িয়ে পড়েছে পাঞ্জাব, রাজপুতানা, হায়দরাবাদ, বম্বে, বেরার, মাদ্রাজ, ছোটোনাগপুর হয়ে সারা দেশে। বম্বে পুণেতে প্লেগ। গোটা দেশেই প্রায় দুর্ভিক্ষ আর মড়ক। মহামারীতে প্রায় এক লক্ষ মানুষের জীবনহানি ঘটেছিল।
সন ১৮৯৬
ওদিকে সে-বছরই লুমিয়ের ভাইদের ফিল্ম প্যাকেজ— অ্যারাইভাল অফ দা ট্রেন, লিভিং দ্য ফ্যাক্টরি, দ্য সী বাথ, ডেমোলিশন ইত্যাদি স্ক্রিনিং করতে স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে আমাদের দেশে এলেন ওই কোম্পানির চিত্রগ্রাহক তথা প্রতিনিধি মরিস (এলি জোসেফ) সেস্তি। প্রথম জীবনে এই সেস্তি ছিলেন একজন ফার্মাসিস্ট। লুমিয়েররা তাঁকে সিনেমা দেখানোর দায়িত্ব দিয়ে এদেশে পাঠিয়েছিল।

৭ জুলাই ১৮৯৬। বম্বের ওয়াটসন হোটেলে সেই প্রথম চলচ্চিত্র দেখানো হল। টাইমস অফ ইন্ডিয়ায় প্রকাশিত হল বিজ্ঞাপন।

স্মর্তব্য যে, এটিই প্রথম আমাদের দেশের প্রথম ফিল্ম পাবলিসিটি মেটিরিয়াল। তবে এখানে, ওয়াটসনে, উচ্চকোটির মানুষদের জন্য চলচ্চিত্র প্রদর্শন হত আর ঘরটাও দর্শকসংখ্যার আধিক্যের তুলনায় ছোট ছিল। ব্যবসা ও প্রচারের জন্য সেস্তি খুঁজছিলেন অন্যরকম একটা হল, পেলেনও আরও ভালো একটি প্রেক্ষাগৃহ — নভেলটি থিয়েটার। এটি আদতে ভিক্টোরিয়া থিয়েটার কোম্পানির আদি বাড়ি। সেই সেকালেও এরা দ্বিগুণ দামে টিকিট বেচত। ১৪—১৭ জুলাই ‘নেটিভদের জন্যে’ প্রতিদিন সন্ধে সাড়ে ছ’টায় ও রাত সাড়ে ন’টায় দুটি করে স্ক্রিনিং হবে এবং প্রত্যেক প্রদর্শনীতে ১২টি করে ফিল্ম দেখানো হবে, এই মর্মে বম্বে গেজেটে বিজ্ঞাপনও দেওয়া হল ১১ তারিখ। কিন্তু ১৪ তারিখ বিদ্যুতের অভাবে নভেলটিতে কোনো স্ক্রিনিং হয়নি। ৭ থেকে ২০ পর্যন্ত ওয়াটসন হোটেলেই (চার দিন বাদে) প্রদর্শনী চলে।

১৭ তারিখে আবার বিজ্ঞাপন এবং ২১ জুলাই প্রথম নভেলটিতে স্ক্রিনিং, যা চলে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত। ছবি চলার সময় আড়াল থেকে বেহালা বাজাতেন মেমুর ডোভ নামের এক জন বাজনদার। এই প্রথম আমাদের দেশের মানুষ নড়াচড়া করে এমন চলমান ছবি চাক্ষুস করল। শোনা যায় ফ্রান্সে প্রথম প্রদর্শনের সময়, স্টেশনে ট্রেন এসে থামছে এই দৃশ্যটি প্রত্যক্ষ করে পর্দার সামনের সারির দর্শকেরা ভয়ের চোটে উঠে পালিয়েছিলেন। আমাদের দেশেও সেদিন দারুণ ভাবে আদৃত হয়েছিল এই চলচ্ছবি। উচ্ছ্বাস উদ্দীপনা দেখে টাইমস অফ ইন্ডিয়া লিখল — “অ্যাট দা ডিজায়ার অফ এ লার্জ নাম্বার অফ বম্বে রেসিডেন্টস হু হ্যাভ ফ্লকড রিসেন্টলি ইনস্পাইট অফ ব্যাড ওয়েদার টু সি দা কিনেটোগ্রাফ অফ দা নভেলটি থিয়েটার ফর এ ফিউ মোর নাইটস।”
তখন কলকাতায়
সদ্য প্রয়াত হয়েছেন সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। ব্যোমকেশ মুস্তাফির সম্পাদনায় ‘বসুমতী’ সাহিত্য পত্রিকার প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হচ্ছে ২৫ আগস্ট ১৮৯৫ তারিখে। বেলগাছিয়া পোলের উত্তরে পরেশনাথের মন্দির আর বছর শেষে কারমাইকেল মেডিকেল কলেজ স্থাপিত হচ্ছে। ডা. রাধা গোবিন্দ কর আপ্রাণ চেষ্টা করছেন বাংলায় ডাক্তারি শিক্ষা চালু করতে। গ্রন্থকার রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য সান্যাল জানালেন, এই চেষ্টা সফলও হয়েছিল তবে তা দশ পনের দিনের বেশি গড়ায়নি। মূলত বাংলা ভাষায় লেখা চিকিৎসা সংক্রান্ত গ্রন্থের অভাবে। এই কারমাইকেল কলেজই পরে রাধা গোবিন্দবাবুর নামানুসারে হয় আরজিকর হাসপাতাল তথা কলেজ।
১৮৯৬ সাল।
কলকাতার রাস্তায় মটর গাড়ি চলছে। এসে পড়েছেন চিত্র শিল্পী হ্যাভেল। কলকাতায় বসছে কংগ্রেসের সর্বভারতীয় অধিবেশন আর সেখানে বঙ্কিমচন্দ্রের বন্দে মাতরম প্রথম বারের জন্য পড়ে ও গেয়ে শোনাচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। প্রেসিডেন্সি হাসপাতাল মানে আজকের পিজি কিংবা এসএসকেএম থেকে রোনাল্ড রসের নোবেল পেতে কিংবা বেলুড় মঠে রামকৃষ্ণ মিশন প্রতিষ্ঠা হতে আরও পাঁচ-ছ মাস বাকি এমন এক সময় বঙ্গে বায়োস্কোপ চালু হয়ে গেল।
বঙ্গে বায়োস্কোপ
১৮৯৬ সালের অক্টোবরে মিস্টার ভেনসন, নভেম্বরে মিস্টার হাডসনের হাডসন এন্টারপ্রাইজ কোম্পানি, ভ্যান টাশল প্রমুখ বিদেশি সিনেমার ফেরিওয়ালারা পর্দায় নির্বাক চলন্ত ছবি দেখাচ্ছেন কলকাতায়। রয়েল থিয়েটারে হাডসন যে বায়োস্কোপ দেখিয়ে ছিলেন সে খবর ২৫ নভেম্বর দ্য স্টেটসম্যান পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। সুতরাং, বম্বের দু-মাস পরেই কলকাতায় বায়োস্কোপ দেখানো হয় এ কথা বলা যায় । আদ্যন্ত নাটকের শহর কলকাতায় সেসময় বিনোদিনী দাসী বছর দশেক হল থিয়েটার ছেড়ে দিয়েছেন আর বিডন স্ট্রিটের পুরোনো বাড়ি ছেড়ে হাতিবাগানে উঠে এসেছে স্টার থিয়েটার। জমজমাট নাট্যশালা। নাটকের পর নাটক হচ্ছে। এমনই এক সময় ইংল্যান্ডের শেফিল্ড অঞ্চলের বাসিন্দে জে জে স্টিভেনসন (প্রফেসর স্টিফেনস নামে বেশি খ্যাত) এদেশে এসে সোজা চলে গেলেন স্টার থিয়েটার কর্তৃপক্ষের কাছে, সঙ্গের যন্ত্রটিকে দেখিয়ে সাহায্য চাইলেন চলমান ছবি দেখানোর জন্যে। স্টার রাজি হল। একটা হ্যান্ডবিল ছেপে ছড়িয়ে দিল সারা শহরে।
বয়ান ছিল এরকম —
“পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য! বায়োস্কোপ! আসুন! দেখুন! যাহা কেহ কখনও কল্পনা করেন নাই তাহাই সম্ভব হইয়াছে! ছবির মানুষ, জীবজন্তু জীবন্ত প্রাণীর ন্যায় হাঁটিয়া চলিয়া বেড়াইতেছে।”
বিজ্ঞাপনের একটা অক্ষরও মিথ্যে হয়নি সেদিন। বোবা বায়োস্কোপ তখন চরম উত্তেজনা তৈরি করেছে। স্টারে নাটক দেখানোর ফাঁকে ফাঁকে এগুলি দেখানো হত। কাতারে কাতারে মানুষ টিকিট কেটে এই মজা দেখতে এসেছিল সেদিন। স্টিফেনসের সিনেমা দেখানোর যন্ত্রটির নামছিল বায়োস্কোপ আর তা থেকেই বায়োস্কোপ কথাটির প্রচলন হয়।

ফাদার লাফোঁ
এসবের কিছুদিন আগে থেকেই সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের পদার্থ বিজ্ঞানের অধ্যাপক ফাদার লাফোঁ ছাত্রদের শিক্ষা দানের উদ্দেশ্যে ইংল্যান্ড থেকে প্রজেক্টর মেশিন কিনে এনেছেন এবং ১৮৯৭ সালের জানুয়ারি মাসে রীতিমত সিনেমা দেখাচ্ছেন কলেজের ছাত্রদেরকে। বলা যায় ফিল্ম স্টাডিজের শুরুটা, অন্তত এদেশে তাঁর হাতেই হয়েছিল। বঙ্গদেশে প্রথম সিনেমা দেখানোর ক্ষেত্রে লাফোঁর নাম করতেই হবে। এছাড়াও বঙ্গদেশ তাঁর কাছে ঋণী থাকবে কেননা চলচ্চিত্রের সেই আঁতুরঘরে সেদিন ধাত্রী মায়ের মতো প্রথম বাঙালি চলচ্চিত্র প্রতিভাকে তিনি সাহায্য, পরামর্শ ও সহযোগিতা দিয়ে ঋব্ধ করেন।
কিন্তু সিনেমার ইতিহাসে সর্বসাধারণের ক্ষেত্রটিই যেহেতু বিবেচ্য তাই আমরা বলব ১৮৯৬ সালের শেষ দিকে এবং ১৮৯৭ সালের প্রথমে বঙ্গে বায়োস্কোপ দেখানোর কৃতিত্ব স্টিফেনস সাহেবরই। ১৮৯৭ সালের জুন জুলাই নাগাদ তিনি দেশে ফিরে যান এবং ১৮৯৮ নাগাদ দ্বিতীয় বার কলকাতায় আসেন ছবি দেখাতে। ১৮৯৬-৯৭ সালে যে ছবিগুলি দেখাতেন তা ছিল ১০০-১৫০ ফুটের ছোটো ছোটো ছবি — লোক জন হাঁটছে, গাড়ি ছুটছে, জলে ঢেউ খেলছে ইত্যাদি। মাঝে সাঝে রিল কেটেও যেত আর তখন মনে হত কে যেন পর্দায় কালির দোয়াত উল্টে দিয়েছে। পরের পর্যায়ে এর থেকে বড়ো ছবি দেখালেন স্টিফেনস— বিলিতি ছবির পাশাপাশি নিজের মুভি ক্যামেরায় তোলা পরেশনাথের শোভাযাত্রা, খিদিরপুর ডকে জাহাজ সারানো হচ্ছে, মিউনিসিপাল মার্কেটে কুলিরা তরমুজ খাচ্ছে ইত্যাদি। এসব জানা যাচ্ছে সৌরিন্দ্রমোহন মুখোপাধ্যায়ের লেখালিখি ও রবীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাংলা নির্বাক চলচ্চিত্রের ইতিহাস গ্রন্থ থেকে। ৯ নং বিডন স্ট্রিটে ছিল বিহারিলাল চট্টোপাধ্যায়ের রয়েল বেঙ্গল থিয়েটার যা সমকালে ছিল স্টারের প্রধান চ্যালেঞ্জ। ভ্যান টাশেল গেলেন এখানে তাঁর বায়োগ্রাফ যন্ত্র নিয়ে এবং সেখানে ছবি দেখানোর অনুমতি পেলেন। বিহারিলাল তাবৎ পত্রপত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিলেন, “ ‘বায়োগ্রাফ’’ জীবন্ত চলন্ত মানুষাকার ভারতে একক ও অনন্য এডিসনের ১৮৯৮ মডেল, সর্বাধুনিক আবিষ্কার ... চলমান ছবি দেখানোর পূর্বে ‘ প্রভাস মিলন ‘ নাটক অভিনীত হবে। তবে টাশেলের বোবা ছবি ঠিকঠাক জমেনি। দুদিন হয়েই বন্ধ হয়ে যায়। ওদিকে ঢাকার ক্রাউন থিয়েটারেও ১৮৯৭ সালে বায়োস্কোপ দেখানো হয়েছিল। এছাড়া গ্র্যান্ড হোটেলে ছিল থিয়েটার রয়েল। ফ্লেমিং ও বেশ কয়েকজন ইউরোপীয় ভদ্রলোক সেখানে সিনেমা দেখাচ্ছেন। এই ফ্লেমিং ছিলেন গমোঁ কোম্পানির একজন প্রতিনিধি। প্রফেসর প্রিয়নাথ বসুর সার্কাস পার্টি যখন জাভায় গেছিল সেই সময় ফ্লেমিং বসুর সার্কাসে যোগদান করেন। সেকালের বাংলা সিনেমার বিখ্যাত ক্যামেরাম্যান জ্যোতিষ সরকার তখন এই ফ্লেমিং-এর সহকারি হিসেবে কাজ করতেন।
ব্যাক টু দ্য ফিউচার
একশো একুশ বছর পেছনে আছি আমরা। ভবিষ্যতে ফেরার এই যাত্রাপথে আমরা পেরোলাম মাত্র তিন বছর। আজ স্মার্টফোন, ট্যাব, ডেস্কটপ বা ল্যাপটপের স্ক্রিনে ফিরতি যাত্রায় সওয়ার আপনাকে কেবল মনে করিয়ে দেব কলকাতায় সেদিন কোনও ইলেকট্রিক লাইট ছিল না। রাস্তায় রাস্তায় জ্বলত গ্যাসের বাতি। ইডেন গার্ডেন আর হাওড়ার পোলে ( অধুনালুপ্ত) কেবল বিজলীবাতি জ্বলত। তাই কথা না বললেও ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষে এই বায়োস্কোপে, ...“সাহেব মেমরা ফুটপাথের ওপর দিয়ে ব্যস্ত ভাবে আনাগোনা করছে, গাড়ি নিয়ে ঘোড়াগুলো যাচ্ছে, এদিক ওদিকে, ছোকরারা বেচছে খবরের কাগজ এবং একটা কুকুর ছুটে চলে গেল ল্যাজ নাড়তে নাড়তে —ব্যস ফুরিয়ে গেল একখানা ছবি | … ঐ সব ছবি দেখে দস্তুর মতো বিস্মিত উত্তেজিত ও অভিভূত হয়ে উঠতুম । ...আমাদের পক্ষে তাই ছিল যথেষ্টরও বেশি ।” মাসিক বসুমতী(১৩৫৮)-তে প্রকাশিত যাত্রাপথে চলচ্চিত্র শিরোনামে লেখায় একথা শেয়ার করছেন সাহিত্যিক হেমেন্দ্রকুমার রায়।
উত্তর কলকাতা গ্রে স্ট্রিট ও বাঙালি
না, বাঙালি সেদিন বসে থাকেনি। ১৯৮৭- তেই সে শুরু করে দিয়েছিল। এমারেল্ড থিয়েটার- ক্লাসিক থিয়েটারের অমরেন্দ্রনাথ দত্ত, হীরালাল সেন ও রয়েল বায়োস্কোপ কম্পানি, শ্যামলাল শেঠের শেঠস্ বায়োস্কোপ, অনাদি বসুর অরোরা বায়োস্কোপ, মতিলাল সেন, বসাকদের লন্ডন বায়োস্কোপ, চাটুজ্জে ভাইদের(অনিল ও নলিনী ) ইম্পিরিয়াল বায়োস্কোপ ইত্যাদি অনেক বায়োস্কোপ কোম্পানিই সেদিন তৈরি হয়েছিল কিন্তু ভারতীয়দের মধ্যে প্রথম নিজের ক্যামেরায় ছবি তুলে বাঙালির মাথা উঁচু করে দিয়েছিলেন এক জনই—হীরালাল সেন। ফাদার লাফোঁ হীরালালকেই সাহায্য করেছিলেন।
সেকথা লেখা যাবে আগামী দিনে।