সনাতন দিন্দার বোধিবৃক্ষ : পৃথিবীর আসন্ন সংকট ও গভীরতর অসুখের প্রতীক

“পথে চ’লে পারে—পারাপারে
উপেক্ষা করিতে চাই তারে;
মড়ার খুলির মতো ধ’রে
আছাড় মারিতে চাই, জীবন্ত মাথার মতো ঘোরে
তবু সে মাথার চারিপাশে,
তবু সে চোখের চারিপাশে,
তবু সে বুকের চারিপাশে;
আমি চলি, সাথে-সাথে সেও চ’লে আসে।
আমি থামি—
সেও থেমে যায়;”
কে থামে আর কে থামে না, এ এক জটিল প্রশ্ন। সভ্যতা কি চলেছে সামনের দিকে? না কি সভ্যতা থেমে গেছে? আমরা জানি না। অনুষ্টুপ আয়োজিত ‘সভ্যতার সংকট’ শীর্ষক আলোচনাসভায় শমীক বন্দ্যোপাধ্যায় একটি কথা বলেছিলেন, এই সভ্যতার কোনো সংকট নেই, কারণ সংকট থাকার জন্য সভ্যতাটা টিকে থাকা প্রয়োজন, কিন্তু সভ্যতাটাই এখন আর বেঁচে নেই। শিল্পী সনাতন দিন্দা যেন প্রায় একই সুরে একটি শিল্প সৃষ্টি করেছেন। তিনি এই শিল্পকর্মটির নাম দিয়েছেন ‘বোধি বৃক্ষ’ বা ‘বোধি ট্রি’। সম্প্রতি অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস-এর নর্থ গ্যালারিতে শিল্পীর একক প্রদর্শনীতে এই শিল্পকর্মটি প্রদর্শিত হয়।
প্রতি দু-এক বছর অন্তর পুরোনো মোবাইলটা যে পাল্টে ফেলা হচ্ছে, সেই মোবাইল, তার চার্জার, আরও কত কী, সেগুলো দিনের শেষে কী হচ্ছে? সেগুলোর ভবিষ্যত কী? জানা নেই। এগুলিই হল E-waste. এই ইলেকট্রনিক্স ওয়েস্ট বা E-waste পৃথিবীতে এক আসন্ন সমস্যা, আসন্ন অসুখ।
সম্পূর্ণ নর্থ গ্যালারিতে একটি মাত্র শিল্পবস্তু। এটি স্কাল্পচার না ইন্সটলেশন না কম্বাইন ঠিক করা কষ্টের। শিল্পবস্তুটির উপর নীল আলো ও কিছু ন্যাচারাল লাইটসোর্সের খেলা, সঙ্গে হৃদস্পন্দনের মত একটি বিশেষ অ্যাম্বিয়েন্স মিউজিক। এতগুলি এলিমেন্ট একসঙ্গে একটা প্রাথমিক প্রতিতি তৈরি করবে দর্শকের মনে। প্রাথমিক চমক কাটিয়ে উঠতে সময় লাগবে বেশ কিছুটা। এবার যদি একই খুঁটিয়ে দেখা যায়, বোঝা যাবে মাশরুমের মত (বা আণবিক বোমার ধোঁয়ার মত) একটি প্রাথমিক স্ট্রাকচারকে ঘিরে দানা বেঁধেছে শিল্পীর কল্পনা। সেই স্ট্রাকচারটিকে ঘিরে মাটিতে একটি বিশাল বৃত্তাকার অংশ, সেটিতে লক্ষ-লক্ষ এলেক্ট্রিকের তার, পুরোনো ল্যান্ড লাইন ফোন, টিভি-ডিভিডি-এসির রিমোট এবং প্রচুর পরিমানে মাউস। এই তারের কালো জঙ্গলটি উঠে গেছে মাশরুমটির দেহে। তার ক্রমে হয়ে গিয়েছে রিমোট, এবং রিমোট পরিবর্তিত হয়েছে সবুজ মাদার বোর্ডে। সেই মাশরুমের উপর থেকে নেমে এসেছে প্যাঁচানো টেলিফোনের তার (গাছের ঝুরি যেন…)। যেকোনো মানুষের ওই মাদারবোর্ডের সবুজকে দেখলে ভয় হবে, খুব ভয় হবে, মনে হবে যেন শাক্যমুনি সিদ্ধার্থ যে বোধি বৃক্ষের তলায় বসে বুদ্ধ হয়েছিলেন, সেই বোধিবৃক্ষের সবুজকে খেয়ে ফেলেছে এই মাদারবোর্ডের যান্ত্রিক সবুজ।
সনাতনের এই ‘বোধি বৃক্ষ’ নামটিও খুবই স্যাটায়ারধর্মী। একসময় মানুষের বোধ নিয়ন্ত্রণ করেছে জ্ঞান (যদিও শে অনেক যুগ আগের কথা), তারপর বোধ নিয়ন্ত্রিত হয়েছে ধর্মের দ্বারা, এখন বোধ সম্পূর্ণভাবেই নিয়ন্ত্রিত হয় প্রযুক্তির দ্বারা। ধীরে ধীরে প্রাথমিক প্রযুক্তি পরিবর্তিত ও পরিবর্ধিত হয়েছে হাল আমলের আর্টিফিশিয়াল ইন্টালিজেন্সে, আমাদের হোয়াটস্যাপ’এও চলে এসেছে মেটা এ-আই। কিন্তু এই বিজ্ঞানের জয়যাত্রা কি সম্মুখগামী না পশ্চাৎগামী? এখন আর কটা বাড়িতে ল্যান্ড-লাইন আছে? কজন ডিভিডি প্লেয়ার ব্যবহার করেন? কারা আর পুরোনো আমলের ডেক্স-টপ কম্পিউটার ব্যবহার করেন? এ সবই তো এখন বাতিলের দলে। প্রতি দু-এক বছর অন্তর পুরোনো মোবাইলটা যে পাল্টে ফেলা হচ্ছে, সেই মোবাইল, তার চার্জার, আরও কত কী, সেগুলো দিনের শেষে কী হচ্ছে? সেগুলোর ভবিষ্যত কী? জানা নেই। এগুলিই হল E-waste. এই ইলেকট্রনিক্স ওয়েস্ট বা E-waste পৃথিবীতে এক আসন্ন সমস্যা, আসন্ন অসুখ। এর সঙ্গে জুড়ে আছে পুঁজিবাদ। পৃথিবীর বৃহৎ অংশ এই E-waste-কে ঠেলে দিচ্ছে তৃতীয় বিশ্বের দিকে, তাতে তাদের সাময়িক অসুবিধা কমলেও পরের প্রজন্ম বা তার পরের প্রজন্মকে মুখোমুখি হতেই হবে এই বিপদের। যার কোনো রিসাইকেলের যথাযথ উপায় নেই, এমনকী পরিকল্পনাটুকুও নেই, সেটি কী ব্যাপক থাবা মারতে পারে পৃথিবীর বুকে?
এই E-waste দিয়েই সনাতন বানিয়েছেন তাঁর বোধি বৃক্ষ। সনাতন এই বোধি বৃক্ষটিকে কীভাবে দেখেন? তাঁর কথাও –
“e-waste দিয়ে তৈরি গাছটি নিছক একটা রূপক মাত্র। ‘বোধি বৃক্ষ’।
আধুনিকতার যোগাযোগ নিরাপত্তা আরাম ও বিলাসিতাকে হাতের মুঠোয় এনে দিয়ে এই প্রযুক্তি আজ বিশ্বের সবথেকে ভয়ংকর। অনিয়ন্ত্রিত কর্মযজ্ঞে নিমজ্জিত সভ্যতা কখন যে ধীরে ধীরে চোরাবালিতে পা ফেলেছে তা তারা নিজেও বোঝেনি। একসময়ের নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার রিমোট, মাউস ইত্যাদি ব্যবহারের অক্ষমতার দরুন e-waste-এ পরিণত হয়েছে। গতকালের প্রশংসিত ইলেকট্রনিক্স বস্তুগুলো পুনর্ব্যবহারযোগ্য না হওয়ায় বর্জ্যে পরিণত হচ্ছে। আমাদের চারপাশকে শ্বাস রুদ্ধ করে তুলেছে এরা। সবুজ প্রকৃতির সৌন্দর্য কম্পিউটারের মাদারবোর্ডের সবুজ রঙে প্রতিস্থাপিত করা দৃশ্যমান পরিবেশগত অবক্ষয়ের পরিণামকে দৃশ্যমান করে তুলেছে।
আমরা যখন comfort-zone-এ বসে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও প্রকৃতির উপর নিয়ন্ত্রণ পেতে মত্ত, তখনই এই শিল্পকর্মটি মনে করিয়ে দেবে অবস্থার বেগতিক পরিস্থিতির কথা। অগ্রগতির নামে e-waste নিরলস উৎপাদন আমাদের অস্তিত্বকে গভীর সংকটের মুখে ফেলেছে। পৃথিবীর এই অসুখের জন্য আমরাই দায়ী। আমরা ‘ঋণী’ পৃথিবীর কাছে...
আমরা কি পুনঃবিবেচনা করব! স্থায়িত্ব ও মননশীল অনুশীলনকে স্বীকৃতি দেব!
সবুজের সৌন্দর্য কি শুধুমাত্র মাদারবোর্ডে-ই সীমাবদ্ধ থাকবে?
কিছু প্রশ্ন হাওয়ায় ছুঁড়ে দিলাম!”
জীবনানন্দ লিখেছিলেন, ‘পৃথিবীর গভীর গভীরতর অসুখ এখন;
মানুষ তবুও ঋণী পৃথিবীরই কাছে।’
আমরা বেঁচে আছি, ভাবছি, লিখছি, আঁকছি, শিল্পসৃষ্টি করছি, এ সবই পৃথিবীর দান। কিন্তু আমরা কী ফেরত দিয়েছি পৃথিবীকে? কিছুই না। কেবল তার বুকের উপর বোঝা বাড়িয়ে গেছি, তার জল-হাওয়া-মাটিকে বিষিয়ে দিতে থেকেছি প্রতিনিয়ত। পৃথিবী নিজের সবুজের তলায় আমাদের আগলে রেখেছে এতকাল, এবার আমাদের পালা সেই সবুজকে আগলে রাখার, কিন্তু সেটি কখনওই মাদারবোর্ডের সবুজ দিয়ে নয়। এই শাশ্বত রাত্রির বুকে অনন্ত সূর্যোদয় ঘটানোর দায় একমাত্র আমাদের, আমাদেরই।