নীলকণ্ঠ পাখি থেকে নীল পদ্ম বা অপরাজিতা — দুর্গাপুজোয় নীল রঙের মাহাত্ম্য

নীল দুর্গা
দুর্গা প্রতিমা বা দুর্গাপুজোর সঙ্গে নীল রঙের অনুষঙ্গ বারবার মিলে যায়। কীভাবে? তাহলে শুরুতেই বিসর্জন প্রসঙ্গে আসা যাক। দেবী দুর্গার বিসর্জনে নীলকণ্ঠ পাখির গুরুত্ব। মহাদেব বিষ পান করেছিলেন, তাই তাঁর অপর নাম নীলকণ্ঠ। সেই থেকে নীলকণ্ঠ পাখিকে মহাদেবের দূত হিসেবে ধরা হল। রূপক অর্থে। লোকবিশ্বাসে এই ঘটনাটি কখন ঘটল, বা এই সমাপতন কখন আচার-আচরণের সঙ্গে এসে মিশল, বলা কঠিন, কারণ এগুলোর কোনো ইতিহাস থাকে না। এগুলো পরম্পরাবাহিত। লোকমুখে প্রচলিত। দুর্গা একই সঙ্গে অনেক রূপে, বিভিন্ন অবয়বে আমাদের কাছে হাজির হন। দুর্গা দশপ্রহরণধারিনী, আবার মঙ্গলময়ী মা এবং তিনি বাংলার আপামর গৃহস্থের কাছে অত্যন্ত কাছের মেয়ে, যাঁকে উমা নামে ডাকা হয়। উমা যখন মর্ত্যে কয়েকটা দিন কাটিয়ে সন্তানদের সঙ্গে করে শ্বশুরবাড়িতে ফেরেন, সেই খবরটা শিবকে গিয়ে জানায় একটি নীলকণ্ঠ পাখি। এই বিশ্বাসকে শ্রদ্ধা জানিয়ে বিসর্জনের প্রথা হচ্ছে সেই লগ্নে একটা বা দুটো নীলকণ্ঠ পাখি নদীর ঘাটে উড়িয়ে দেওয়া। এখন নীলকণ্ঠ পাখি ধরা আইনত দণ্ডনীয়। কিন্তু প্রথার কাছে অনেক সময়ই আইনের বাঁধ ভেঙে যায়। বিখ্যাত জমিদার সাবর্ণ রায়চৌধুরির পরিবার আজও তাঁদের বাড়ির প্রতিমা বিসর্জনের সময়ে দুটো নীলকণ্ঠ পাখি ওড়ায়।
নীলকণ্ঠ পাখি
আরও পড়ুন: শনিবারের কড়চা ৯ – পুজোর আগে ‘পুজোর গান’
নীলকণ্ঠ পাখির প্রসঙ্গ একটু দূরে সরিয়ে রাখলেও নীল রংটা যেন দুর্গার পিছু ছাড়ে না। যেমন, বিসর্জনের আগে হয় অপরাজিতা পুজো। অপরাজিতা ফুলের রং নীল। যদিও সাদাও হয়। এই অপরাজিতা হল দুর্গার আরেক নাম, আরেক রূপ। প্রথাগত দশ হাতের নন, অপরাজিতা দুর্গা হন চতুর্ভুজা, গায়ের রং ঘন উজ্জ্বল নীল। পুরাণ মতে দুর্গা কেন অপরাজিতা, তার ব্যাখ্যা খুব সহজভাবেই বলা আছে। দুর্গা অপরাজিতা, তাঁর পরাজয় হয়নি, যেহেতু তিনি মহিষাসুর দমন করেছেন। কিন্তু তার সঙ্গে অপরাজিতা ফুলের রূপকল্প মিশে গিয়ে তাঁর গায়ের রং নীল হয়ে গেল, এই হল লোকবিশ্বাসের মজা। একই প্রেক্ষিতে এটাও মনে রাখতে হবে যে দেবী দুর্গার গায়ের রং অতসীবর্ণাভাং। অতসী ফুলের বর্ণের মতন তাঁর গায়ের রং, উজ্জ্বল হলুদ বা সোনারং। কিন্তু, পশ্চিমবাংলায় লালমাটির দেশে কিছু জায়গায় নীল রঙের অতসী ফুলও দেখা যায়। বাঁকুড়ার কোনো কোনো জায়গায় নীল দুর্গা পূজিতা হন আজও। অন্যদিকে কৃষ্ণনগরের চট্টোপাধ্যায় বাড়িতে আজও নীল দুর্গার রীতি মানা হয়।
অপরাজিতা
এছাড়াও দেবী দুর্গার সঙ্গে নীল রঙের অন্য অনুষঙ্গও আছে। অকালবোধনের কারণটিতে এই অনুষঙ্গ নিহিত। কিন্তু সেটি আছে কৃত্তিবাসের রামায়ণে। বাল্মিকীর লেখা মূল রামায়ণে এই কারণটি নিয়ে কিছু উল্লেখ করা নেই। সে অর্থে বাঙালির দুর্গাপুজোকে, যা শারদ উৎসব নামেও জনপ্রিয়, তাকে আচার-আচরণ সমেত তাঁর কাব্যে প্রতিষ্ঠা করে গেছেন স্বয়ং কৃত্তিবাস। দেবীকে তুষ্ট করা জন্য বিভীষণ রামকে পরামর্শ দেন, যে তিনি ১০৮টি নীল পদ্ম এনে দেবীর পুজোয় যেন অর্পণ করেন। রামভক্ত হনুমান সেই ১০৮টি নীল পদ্ম তুলে নিয়ে এলো। পুজোর সময়ে দেখা গেল একটি পদ্ম কম পড়ছে। অথচ ১০৮টি পদ্ম না হলে দেবী তুষ্ট হবেন না। তখন রাম নিজের পদ্মলোচনের একটিকে পুজোতে অপর্ণ করার জন্যে প্রচেষ্ট হলেন। এই সময়ে দেবী আবির্ভূত হন আর বলেন তিনিই রামের ভক্তি পরীক্ষা করার জন্যে একটি নীল পদ্ম সরিয়ে রেখেছিলেন। এই আখ্যানে একটি প্রশ্ন বিচলিত করে, যে পদ্মের রং নীল কেন? কেন গোলাপি নয়, বা শ্বেতপদ্ম নয় কেন? এই নীল রং খুবই দুর্লভ বলে? নাকি এই নীল অনুষঙ্গ অন্য কোনো আকারে বা সূত্রে দুর্গার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত বলে? এই প্রশ্নের কোনো নির্দিষ্ট উত্তর নেই। কিন্তু দুর্গাপুজোর নানা প্রথায়, আচারবিধিতে, গল্পে, নীল রঙের এই উপস্থিতি অনস্বীকার্য।
নীল পদ্ম
পুজোর ক’টা দিনে সাধারণ মানুষের কাছে সেই নীল রংই কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারণ আকাশ পরিষ্কার থাকলেই, মেঘলা না হলেই, নীল। পুজোয় বেড়ানোটাও তাই বৃষ্টিবিঘ্নিত হয়নি। স্বচ্ছ নীল আকাশের তলায় দেবীর নীল রঙের ছায়ায় প্রাণবন্ত ছিল এই পুজোর মরশুম।