‘মেঘে ঢাকা তারা’র নীতারা সবার মধ্যে বেঁচে থাকতে চায়, সাক্ষী থাকে পাহাড়

প্রবল বেঁচে থাকার তাড়না নিয়ে দাদাকে চিৎকার করে নীতা বলেছিল, “দাদা, আমি বাঁচতে চাই দাদা।” পাহাড়ে ইকো হয়ে বারবার ফিরে আসছিল বোনের সেই আকুতি। বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে যে সংলাপ অমর হয়ে আছে। ঋত্বিক ঘটক জাদু জানতেন। জানতেন বলেই অভিনেতা-অভিনেত্রীদের ব্যবহার করে জাত চেনাতে থাকতেন বারবার। কালী বন্দ্যোপাধ্যায়, মাধবী মুখোপাধ্যায়, অনিল চট্টোপাধ্যায়রা ঘটকবাবুর ছবিতে প্রাণ ফিরে পেয়েছিলেন। সেই সঙ্গে ছিলেন সুপ্রিয়া চৌধুরীও।
ঋত্বিক ঘটক পরিচালিত কোমল গান্ধার চলচ্চিত্রের কয়েকটি দৃশ্য । সৌজন্যে- ম্যাক্স কলকাতা প্রোমো
পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় ধরে অভিনয় করা এই ‘অসামান্যা’ অভিনেত্রী ২০১১ সালে বঙ্গভূষণে সম্মানিত হয়েছেন, ২০১৪ সালে পেয়েছেন পদ্মশ্রী। বাবার নির্দেশিত নাটকের মাধ্যমে মাত্র সাত বছর বয়সে অভিনয় জগতে পা রাখেন। এই অভিনয় জগতই তাঁকে চিনিয়ে দিয়েছিল ‘রং’ মাখার নেশা কত শক্তিশালী হতে পারে। শুটিং স্পট হয়ে উঠেছিল দ্বিতীয় বাড়ি। কারণ আজীবন অভিনয়ই করতে চেয়েছিলেন সুপ্রিয়া। ১৯৫২ সালে ‘বসু পরিবার’ ছবির মাধ্যমে রূপোলি পর্দায় আত্মপ্রকাশ। তারপর আর ফিরে টাকাতে হয়নি। ভারতীয় চলচ্চিত্র পেয়েছিল গোল্ডেন ডিভাকে। যিনি রূপে এবং গুণে সবেতেই বাজিমাত করতে পারতেন। তবে মানুষ তাঁকে চিনল ঋত্বিক কুমার ঘটকের ‘মেঘে ঢাকা তারা’র (১৯৬০) মাধ্যমে।
ঋত্বিক ঘটক পরিচালিত মেঘে ঢাকা তারা চলচ্চিত্রে সুপ্রিয়া দেবী
বিংশ শতকের পাঁচের দশকে কলকাতার এক বাঙালি পরিবার ঘিরে ‘মেঘে ঢাকা তারা’ কাহিনির আবর্তন। ১৯৪৭-এর দেশভাগের পর এই শরণার্থী পরিবার আশ্রয় নেয় কলকাতা শহরের বিভিন্ন প্রান্তে। ছবির মূল চরিত্র নীতা, পরিবারের বড়ো মেয়ে। পড়াশোনার পাঠ চুকানোর আগেই পরিবারের হাল ধরতে হয় তাকে। নীতার বৃদ্ধ বাবা স্কুলে পড়ায়, মা ঘরবাড়ি দেখাশোনা করে। নীতার চূড়ান্ত অসুস্থতা নজরে পড়ে তার দাদার। পাহাড়ের ওপর হাসপাতালে ভর্তি করানো হয় নীতাকে। জীবন-মৃত্যুর দোলাচলে এসে, শংকরকে (দাদাকে) জানায়, সে বাঁচতে চায়। আকাশে, পাহাড়ের গায়ে প্রতিধ্বনি হয় নীতার আকুতি। সুপ্রিয়া হয়ে উঠলেন জীবন্ত নীতা। বাঙালি আর ভুলতে পারল না তাঁকে। ঋত্বিকের ‘কোমল গান্ধার’-এও কাজ করেন সুপ্রিয়া। একে একে ‘লাল পাথর’, ‘কাল তুমি আলেয়া’, ‘তিন অধ্যায়’, ‘চৌরঙ্গী’, ‘সন্ন্যাসী রাজা’, ‘বাঘবন্দি খেলা’, ‘দেবদাস’ ইত্যাদি ছবিতে অভিনয় করেছিলেন।
বিভিন্নরকম ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে সুপ্রিয়া নিজেকে ভেঙেছেন গড়েছেন। কিন্তু হার মানেননি। সেকালে সুচিত্রা-মাধবী-সাবিত্রীদের মধ্যেই উজ্জ্বলতমা হয়ে উঠেছিলেন। আর ইন্ডাস্ট্রির কাছে ‘বেণুদি’। আজ সুপ্রিয়া দেবীর ৮৭তম জন্মদিন।