“বড়দা যে পথ দেখিয়ে দিয়েছেন, সেই আমার পথ”

উপেন্দ্রকিশোর বা সুকুমাররা শিশুসাহিত্যে যে পথটা দেখিয়েছিলেন, সেই পথের আরেক দোসর লীলা মজুমদার। রায় পরিবারের সদস্য হয়েও লীলা মজুমদার ছিলেন সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। লীলার বাল্যজীবন কাটে শিলং-এ। লরেটো কনভেন্টে পড়াশোনা করেন। তাঁর শৈশবের স্বভাব বড্ড ডানপিটে। গাছে চড়া, পাহাড় বাওয়া, অবাধ্যতা, মারামারি, ঝগড়া আর জেদের কোনো কমতি ছিল না তাঁর। জীবনের সব দস্যিপনাগুলো সাহিত্যকে ভিন্নমাত্রা দিয়েছে। লেখাপড়ায় মেধাবী লীলা মজুমদার বি-এ এবং এম-এ দুই পরীক্ষাতেই ইংরেজিতে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়েছেন এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে ইংরেজিতে স্বর্ণপদক পেয়েছেন। পাশাপাশি বিশ্বভারতী ও আশুতোষ কলেজে শিক্ষকতা, আকাশবাণীর প্রযোজকের চাকরি, আর নিজের লেখালেখি তো ছিলই।
খুব ছেলেবেলায় মায়ের চিকিৎসা করাতে বাবা সবাইকে নিয়ে এসে উঠেছিলেন গড়পাড়ের বিখ্যাত বাড়িতে। একতলায় প্রেস, দিনরাত লোকজনের আসা যাওয়া। তখনই গম্ভীর-সুরসিক মেজো জ্যাঠামশাইয়ের কাগজ নিয়ে মেতে উঠলেন লীলা, যার নাম ‘সন্দেশ’। লীলা মজুমদার লিখছেন, “নিচে প্রেস চলত, তার একটানা ঝমঝম শব্দ কানে আসত, মনে হত বাড়িটা বুঝি দুলছে, যে কোন সময় পাখির মতো ডানা মেলে উড়ে যাবে। সে বাড়ির রোমাঞ্চের কথা মুখে বলার সাধ্যি নেই আমার’। শেষমেশ লেখা হল সন্দেশে। বড়দা সুকুমার রায়ের নির্দেশে একখানা ছোটো গল্প লিখে দিলেন, তা ছাপাও হল। নাম দিয়েছিলেন ‘লক্ষ্মীছাড়া’। তবে বড়দা সুকুমারের তা পছন্দ হল না। বদলে গল্পের নাম রাখলেন ‘লক্ষ্মী ছেলে’। সেই শুরু। উপেন্দ্র, সুকুমারের পর বাংলা শিশুসাহিত্য রাজ করতে পা রাখলেন লীলা রায় (বিবাহের পূর্ব পদবি)। ধীরে ধীরে লীলা প্রচুর চিঠি পেতে থাকলেন পাঠকদের। প্রত্যেকের অনুরোধ ছোটোদের জন্য গল্প লিখতে হবে। তারপর সন্দেশে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হতে থাকল কালজয়ী গল্প, নানান কীর্তিকলাপের চরিত্র। পরে লীলা মজুমদার লিখেছেন, “সেদিন আমার পনের বছর বয়স, স্কুলে পড়ি। শুধু এটুকু বুঝতে পারছিলাম বড়দা যে পথ দেখিয়ে দিয়েছেন, সেই আমার পথ। আমাকে দিয়ে অন্য কোনো কাজ হবে না।”
আজ আমাদের প্রিয় মানুষ লীলা মজুমদারের ১১১ তম জন্মদিন। আমরা আজও কি ভুলতে পেরেছি ‘টং লিং’, ‘হলদে পাখির পালক’, পদিপিসির বর্মিবাক্স’, সব ভুতুড়ে’ ? লিখেছেন ‘পাকদণ্ডী’ নামকরণে আত্মজীবনী। বাংলা সাহিত্যের মালঞ্চে একা একাই হেঁটে বেরিয়েছেন লীলা। আজও তাঁর জন্মদিনে মেতে ওঠেন সন্দেশীরা। তাঁকে প্রণাম, শ্রদ্ধা।