“ফ্যাঁৎ ফ্যাঁৎ সাঁই সাঁই”— নবারুণের ফ্যাতাড়ু যেন বাংলার সুপারহিরো

“একটা কথায় ফুলকি উড়ে শুকনো ঘাসে পড়বে কবে/ সারা শহর উথাল পাথাল, ভীষণ রাগে যুদ্ধ হবে”
সাধারণত, সিনেমার পর্দায় যখন অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক পেনশনের টাকা নিতে গিয়ে অপদস্থ হন, বা টিউশনি ফেরত মেয়েটি যখন ইভটিজিংয়ের কবলে পড়ে, অথবা বাড়ির বউটি যখন গৃহহিংসার শিকার হন, তখন তাকে রক্ষা করতে মাটি ফুঁড়ে হাজির হন সিনেমার নায়ক। এবং চূড়ান্ত পিতৃতান্ত্রিক পদ্ধতিতে দুষ্টের দমন ঘটে। কিন্তু বাস্তবে এমনটা হয় না। আমজনতার আত্মার শুকতলা ক্ষয়ে যায় জীবন অতিবাহিত করতে করতে। অপমানিত হতে হতে, অপমানিত হতে হতে, গায়ের চামড়া বাদামি হয়ে যায়, কথা কমে আসে, রাতের অন্ধকারে সাধারণ মানুষের চোখ হায়নার আশ্লেষে ধিকিধিকি জ্বলে।
“আট জোড়া খোলা চোখ আমাকে ঘুমের মধ্যে দেখে
আমি চিৎকার করে উঠি/ আমাকে তারা ডাকছে অবেলায় উদ্যানে সকল সময়/ আমি উন্মাদ হয়ে যাব
আত্মহত্যা করব/ যা ইচ্ছা চায় তাই করব।”
আমরা এমনই পোড়খাওয়া যে, যেকোনো সংবাদ আমাদের মনে এমনি “এমনি এসে ভেসে যায়”। কষ্ট হলেও একটু মনে করা যাক, এক বছর আগে, লকডাউনের গোড়ার দিকে সবাই যখন “বাড়ি থেকে কাজ”, “ডালগোনা কফি”, “শাড়ি চ্যালেঞ্জ” ইত্যাদিতে ব্যতিব্যস্ত, ঠিক তখনই মহাভারতীয় এক প্রব্রজন ঘটছিল। দলে দলে অসংখ্য ভিনরাজ্যবাসী শ্রমিক ফিনফিনে চটি জুতো পরে, যৎসামান্য পুঁজি সম্বল করে, মাথার উপর গণগণে একটা সূর্যসমেত নিজের ঘরের দিকে ফিরছিলেন। কেউ হয়তো পাঁচশো, কেউ বা হাজার- আঠারশো কিলোমিটার পার করে তবে কাছের মানুষের দেখা পাবেন। কেউ ভোর পাঁচটার সময় রাজস্থান থেকে, কেউ বা হিমাচলপ্রদেশ থেকে রাত বারোটায় যাত্রা শুরু করেছেন। কারোর সঙ্গে আছেন স্ত্রী, কারোর সঙ্গে একরত্তি সন্তান। বড়ো রাস্তায় পা রাখলে আছে পুলিশের লাঠি। সর্বোপরি আছে করোনা অথবা রেলদুর্ঘটনা অথবা অত্যধিক ধকলের বশে মৃত্যুর হাতছানি। কিন্তু কোথাও কোনো প্রতিশ্রুতি নেই, ছায়া নেই, আশ্বাস নেই। সাধারণ মানুষের কোনো সুপারহিরো কোনোদিনই নেই। সংবাদকর্মীদের তোলা ভিডিওতে দেখা মানুষগুলোর মুখে তখন কথা কমে এসেছে। তাদের স্তব্ধ চোখজোড়া তখন হায়নার আশ্লেষে ধিকিধিকি জ্বলছে। ভিডিওতে না থাকলেও একটু কান পাতলেই কোথা থেকে যেন চুপিসারে শোনা যাচ্ছে “ফ্যাঁৎ ফ্যাঁৎ সাঁই সাঁই”। এবং এই মন্ত্র আমাদের অচেনা নয়। এই মন্ত্র অপেক্ষা করতে বলে, এই মন্ত্র একটা নতুন সূর্যের অভ্যুদ্বয়ের গান শোনায়।
“কিছু একটা পুড়ছে/ আড়ালে, বেরেতে, তোষকের তলায়, শ্মশানে/ কিছু একটা পুড়েছেই/ আমি ধোঁয়ার গন্ধ পাচ্ছি”
১৯৯৫-এর যে রাতে ডি.এস. অর্থাৎ ডিরেক্টর স্পেশাল “ফিনিফিনে পাঞ্জাবি পরা, ফরসা, রোগা, কলপ করা কালো কুচকুচে ঘাড় ঢাকা চুল, টিকালো নাক” এবং সম্পূর্ন দাঁতহীন মদনের খপ্পরে পড়লেন, সে রাত থেকে কলকাতা নগরীর আকাশবাতাসে ভাসছে এই গান। নিতান্ত ভাগ্যদোষে ডিএসের দীক্ষা হল এবং তিনি ফ্যাতাড়ু হয়ে গেলেন। “ফ্যাঁৎ ফ্যাঁৎ সাঁই সাঁই”- গুহ্যমন্ত্রে বাংলার আকাশে সুপারম্যান নয়, মাকড়সা মানব নয়, এমনকি গরিবের বন্ধু রবিন হুডও নয়, ফ্যাতাড়ুর জন্ম হল সুপারহিরোর লক্ষ্মী-প্যাঁচাসুলভ বঙ্গীয় সংস্করণ হিসেবে। কারণ? কারণ ফ্যাতাড়ু “ইজ দা হিরো ইট ডিসার্ভস, বাট নট দা ওয়ান ইট নিডস”। এরপর বহু সময় বহু স্থানে আমরা ফ্যাতাড়ুদের দর্শন পাই। তারা পার্টি- মিটিং ভণ্ডুল করে, টেলিভিশন বা অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী ধ্বংস করে এবং যত্রতত্র বাংলা মদের দুর্গন্ধবিশিষ্ট মূত্রত্যাগের মাধ্যমে প্রতিবাদ করে থাকে। সমাজের উচ্চশ্রেণির মানবগোষ্ঠী, মূলত যারা ঠগ, জোচ্চোর অথবা ব্যাভিচারি, তাদের প্রতি এদের প্রভূত ক্ষোভ। “ফ্যাঁৎ ফ্যাঁৎ সাঁই সাঁই”- যেন অসহায়, বঞ্চিত মানুষগুলোর দীর্ঘশ্বাসের শব্দ, যা শুনে অনেকটা ছোটোবেলায় দূরদর্শনে দেখা শক্তিমানকে মনে পড়ে। তবে তিনি বড়োই শিষ্ট পুরুষ ছিলেন। তাঁর সঙ্গে ফ্যাতাড়ুদের কোনোই মিল নেই। ফ্যাতাড়ুরা মহাত্মাসুলভ সিম্পল লিভিং-এ বিশ্বাসী। এদের চিন্তাভাবনা জনসাধারণের পক্ষে ঠাহর করা অসম্ভব। যখন তখন যেকোনো ছদ্মবেশে “সনি বা আকাই/ কিছুই দেখিনা মোরা/ ঝামেলা পাকাই” বলে তারা সমস্ত কিছু পণ্ড করে থাকে। কিন্তু কেন?
ফ্যাতাড়ুর পিতা নবারুণ ভট্টাচার্য বলেছেন, “এই যে স্থিতাবস্থা, বড়োলোকদের বদমাইশি এগুলো তো দেখতে ভালো লাগে না। কিছু করতে পারি না। ফাইভস্টার হোটেলে গিয়ে তো চোখ মারতে পারি না। চারটে ফ্যাতাড়ু ঢুকিয়ে দিই। তারা যা পারে করুক। কিছু বানচাল করে দিক, ভেস্তে দিক-এর মধ্যে স্পয়েল করার একটা আনন্দ আছে। আমি মনে করি যে এতে একটা, অপমানিত মানুষদের একটা রিভেঞ্জ নেওয়ার ব্যাপার আছে। অনেকেই আমাদের জীবনে নানা ক্ষেত্রে ভয়ংকর ইনসাল্টেড। কারণ এই শহরটাই আমাকে অপমান করছে এখন। কারণ এখন রাস্তা বানাচ্ছে এখন শপিংমল বানাচ্ছে এখানে তুমি এসো না। এখানে তুমি একেবারেই ফ্যাতাড়ু। আমি যদি আমার মতোন জামাকাপড় পরে সেখানে যাই কিচ্ছু হবে না, কেউ আমাকে পাত্তা দেবে না। এখন আমি তো কিছু পারি না। অন্তত আমার ডি.এস. মদন এরা করবে আর পুরন্দর ভাট কবিতা লিখবে। এগুলো চলবেই, কিছু করার নেই।”
“আমি প্রশ্নগুলোকে ছুঁড়তে ছুঁড়তে এগোতেই থাকব
আমাকে দেখা যাক বা না যাক/ প্রশ্নগুলো ফেটে অনেক সপ্তর্ষিমণ্ডল আকাশে দেখা যাবে।”
বিক্ষোভে, প্রতিবাদে, মিছিলে পা মেলালে সঙ্গে থাকবে ফ্যাতাড়ু। মার খেতে খেতে ফের মার খাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়ালে পাশে থাকবে ফ্যাতাড়ু। সমস্ত চোখ রাঙানিকে উপেক্ষা করে বেপরোয়া শিস দিতে দিতে আজ ফ্যাতাড়ুদের জনক নবারুণ ভট্টাচার্যের জন্মদিন। সর্বহারার অতিমানব ট্র্যাজিক ফ্যাতাড়ু এবং ম্যাজিক ফ্যাতাড়ুরা দীর্ঘজীবী হোক। কারণ এ আশ্বাসে প্রভূত শ্বাস আছে, যা কিনা এই অসময়ে অনেকের কাছেই শেষ পাড়ানির কড়ি।
______
গ্রন্থঋণ:ফ্যাতাড়ু বিংশতি/ ভাষাবন্ধন প্রকাশনী এবং নবারুণ ভট্টাচার্যের বিভিন্ন কবিতা।