মাহালিদের কাছে বাঁশই একমাত্র শিল্প — বীরভূমের সেই গ্রাম আর পাড়াটির নাম মৌলি

বীরভূমের সদর শহর সিউড়ি থেকে প্রায় ২৫ কিমি দূরে আহমেদপুরের পার্শ্ববর্তী গ্রাম কচুইঘাটা। গ্রামে বসবাস করে কয়েকটি মাহালি উপজাতি পরিবার। স্থানীয় মানুষজনের কাছে এটি মৌলি পাড়া নামেই অধিক পরিচিত। বংশানুক্রমে তাঁরা এই অঞ্চলে বাস করে আসছেন। বেঁচে থাকার জন্য তাঁদের জীবনে একমাত্র শিল্প বাঁশ। বাঁশ দিয়ে যে কত রকমের জিনিস তৈরি করা যায়, তা এই গ্রামে না গেলে বোঝা সম্ভব নয়। এই অঞ্চল ছাড়াও বীরভূমের আরো বেশ কিছু জায়গায় মাহালিরা বসবাস করে। যাদের আদি বাসস্থান ঝাড়খণ্ড, উড়িষ্যা ও ছত্তিশগড়ে। মাহালি শব্দের উৎপত্তি সাঁওতাল শব্দ মাদ (বাঁশ) থেকে। তাঁদের গানে আজও শোনা যায়, “আমরা মাহালি জাতি/ বাঁশো ছুলি তব দিনো রাতি/ পেটে লাগে ভুক/ কেতে বুনো তব ডালি কুলো সুপ।”
এঁরা সাধারণত বাঁশের সামগ্রী ঝুড়ি, পেঁছে, সাজি, কুলো, টোপা, খোলপা, ঝাঁপি ইত্যাদি বানিয়ে থাকে। স্থানভেদে বাঁশপদ মাহালি, পাতার মাহালি বা ঘাসি মাহালি, সল্যুঙ্কি মাহালি, তাঁতি মাহালি, মুন্ডা মাহালি, ওরাং মাহালি ও কোল মাহালি এই কয়েকটি ভাগে বিভক্ত। মাতৃভাষা মাহালি হলেও বিভিন্ন জায়গায় এঁরা সাদ্রি, মুণ্ডারি, সাঁওতালি ও বাংলা ভাষায় কথা বলেন। সাঁওতালি ভাষার সঙ্গে এদের মাহালি ভাষার একটা মিল লক্ষ্য করা যায়।
নিজস্ব সামাজিক আচার অনুষ্ঠান থাকলেও জাতিতে সাধারণত এঁরা হিন্দু। মাহালি ভারতের উপজাতির একটি শাখা। আদি দেবদেবীদের মধ্যে বড়পাহাড়ি এবং মনসা অন্যতম। এই উপজাতির অনেকের নামের পদবিও মাহালি। স্থানান্তর ও আধুনিকতার প্রভাবের কারণে এঁদের মাহালি সমাজ ও সংস্কৃতিতে এখন অনেক পরিবর্তন এসেছে।কচুইঘাটা ছোট্ট একটি গ্রাম। আর পাড়ার নাম মৌলি। ঢুকতেই চোখে পড়বে গ্রামের নারী-পুরুষ সকলেই বাঁশের তৈরি বিভিন্ন সামগ্রী বানাচ্ছেন। কেউ বড়ো বাঁশ কেটে ছিলা তৈরি করছেন, কেউ সেগুলিকে রঙে ডোবাচ্ছেন, কেউবা বাঁশের ঝুড়ি কুলো বিভিন্ন সামগ্রী বুনছেন। গ্রামের বাচ্চারাও খেলার ছলে বড়োদের সঙ্গে কাজে হাত লাগাচ্ছে। প্রায় ১০ থেকে ১৫টি বাড়ি। বেশিরভাগ বাড়িই মাটির। সারা বছরই চাষবাসের পাশাপাশি বাঁশের সামগ্রী বানিয়ে থাকেন। এখানকার শিল্পী ফুলরানি মাহালি জানাচ্ছেন, “আমাদের বাঁশের জিনিসের বেশ নামডাক আছে৷ শুধু বীরভূম নয়, অন্য জায়গার বাবুরাও আমাদের জিনিস পছন্দ করে। সারাদিন এটাই করি। শুধুমাত্র টাকার জন্য নয়, এটা আমাদের ভালোবাসাও। এইসব ছোটোখাটো কাজগুলো আমরা তো বঁচিয়ে রাখছি। এটাই গর্বের।”
এই পাড়াটির মধ্যে একটা ছোটো জায়গায় মহিলা পুরুষ সকলেই একসঙ্গে বাঁশের কাজ করছেন। কাঁচা বাঁশকে দা দিয়ে চিরে সরু সরু বিভিন্ন আকৃতির ছিলকা তৈরি করা হয়। যেমনঃ খোলপা বা চারা গাছকে গরু ছাগলের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য যে ঝাঁপি ব্যাবহার করা হয়, সেগুলি বোনার জন্য ছিলকাগুলি একটু চওড়া হয়। আবার খাড়ুই বা ছোটো ঝুড়ি, সাজি বোনার জন্য বাঁশকে চিরে একদম সরু ঝাঁটার কাঠির মতো ছিলকা তৈরি করা হয়। এইরকম বিভিন্ন বাঁশের সামগ্রী ঝুড়ি, পেঁচে, মাছ রাখার খাড়ুই, কুলো প্রভৃতি সামগ্রী বানানোর জন্য বাঁশকে চিরে সরু, মোটা, চওড়া বিভিন্ন সাইজের ছিলকা বের করা হয়। দৃষ্টিনন্দন করে তোলার জন্য ছিলকাগুলিকে রঙে (সাধারণত লাল এবং হলুদ, কোথাও কোথাও সবুজ) ডোবানো হয়।
সমস্ত সামগ্রী তৈরির ক্ষেত্রে কাঁচা বাঁশেরই ব্যবহার হয়। বোনার ক্ষেত্রে কাঁচা বাঁশ অনেক বেশি নমনীয়। যে দিকে খুশি ব্যাঁকানো যায়। সামগ্রীগুলির বাঁধন শক্ত করার জন্য এবং বাড়তি অংশ ছেঁটে ফেলার আগে একবার জলে চুবিয়ে নেওয়া হয়, যাতে বাঁধন মজবুত হয় এবং বাড়তি অংশ কেটে ফেলতে সুবিধা হয়। পাইকারিরা এদের কাছ থেকে বাঁশের এইসব সামগ্রী কিনে নিয়ে গিয়ে বীরভূমে এবং বাইরে বিভিন্ন হাটে বাজারে বিক্রি করে থাকে। আধুনিকতার ছোঁয়া এইসব সামগ্রীগুলির ওপর খুব একটা না পড়লেও বংশপরম্পরায় এই একই আকার এবং আকৃতির বাঁশের সামগ্রী তৈরির ধারাকে আজও এই আধুনিক সমাজে বহন করে নিয়ে চলেছে।
বর্তমানে বাজারে প্লাস্টিক ও রকমারি আধুনিক সামগ্রী বাজার দখল করায় বাঁশের তৈরি জিনিসের চাহিদা অনেকটাই কমে গিয়েছে। কাঁচা বাঁশের জোগানও বর্তমানে কম। তাই মাহালি উপজাতির বাঁশ শিল্প এখন অনেকটাই প্রতিবন্ধকাতার মুখে। বর্তমান প্রজন্মও অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন। যদিও মেয়েদের তাঁরা লেখাপড়া করতে বলেন, বলেন বিটি যেন ভালো চাকরি পায়। সুখে থাকে। শুধু বাঁশের কাজ যেন করতে না হয়। এতকিছুর পরেও হার মানেননি মাহালি। তাঁদের মতে জেদটাই আসল। এই জেদের জন্যই তো সব।
কৃতজ্ঞতাঃ
বন্ধু চয়ন দাস ঠাকুরকে সফর সঙ্গী হিসাবে পেয়ে আমি তার কাছে কৃতজ্ঞ।
তথ্যসূত্রঃ
১. Mahali culture and social change in westbengal. Amit soni
২.THE MAHALI AN ARTISAN TRIBE OF THE DISTRICT BIRBHUM WEST BENGAL AN ANTHROPOLOGICAL STUDY OF THEIR COSMOLOGY/ Researcher: Pan Rapti