দৃষ্টিশক্তির অক্ষমতা সত্ত্বেও ছবি আঁকায় যুগান্ত এনেছিলেন বিনোদবিহারী

বাংলা তথা ভারতে আধুনিক চিত্রকলাকে যাঁরা দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়। জন্ম থেকেই চোখের সমস্যায় কষ্ট পেতেন তিনি। তা সত্ত্বেও দমে যাওয়ার মানুষ ছিলেন না। ১৯০৪ সালে কলকাতার বেহালা অঞ্চলে জন্ম হয়েছিল তাঁর। ছয় ভাইয়ের মধ্যে সবচেয়ে ছোটো ছিলেন বিনোদবিহারী। আর ছিলেন বোন শৈল। শিল্প-সংস্কৃতি-ছবি আঁকার চর্চা ছিল বাড়িতে। কলকাতার একাধিক স্কুলে ভর্তি হন বিনোদবিহারী – সংস্কৃত কলেজিয়েট স্কুল, মডার্ন ইনস্টিটিউশন, ব্রাহ্ম বয়েজ। কিন্তু, খাপ খাওয়াতে পারেননি।
শেষ পর্যন্ত দাদা বনবিহারীর উদ্যোগে কালীমোহন ঘোষ তাঁকে নিয়ে গেলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে, শান্তিনিকেতনে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর চিকিৎসার খোঁজ নিলেন। জিজ্ঞেস করেছিলেন, “আমার লেখা পড়েছ?” বিনোদবিহারী উত্তর দিয়েছিলেন, রবীন্দ্রনাথের লেখা তিনি পড়েছেন, পাশাপাশি, মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘মেঘনাদবধ কাব্য’-ও পড়েছেন তিনি। জবাব শুনে অবাক হলেন রবীন্দ্রনাথ, খুশিও হলেন। শান্তিনিকেতনে বিনোদবিহারীর আশ্রমিক জীবন শুরু হল। শারীরিক অসুবিধের জন্য স্কুলের কিছু নিয়মকানুন থেকে ছাড় পেয়েছিলেন তিনি।
‘নাট্যঘর’ আবাসে থাকতেন বিনোদবিহারী। সেখানকার গৃহশিক্ষক জগদানন্দ রায় তখন ‘পোকামাকড়’ নামের এক বই লিখছিলেন। সেই বইয়ের ছবি এঁকে বিনোদবিহারী সবাইকে মুগ্ধ করেছিলেন। তখন কলাভবন গড়ে উঠছে শান্তিনিকেতনে। কলাভবনে প্রথম যে পাঁচজন ছাত্র ভর্তি হয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন বিনোদবিহারী। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দুই কিংবদন্তি ছাত্র নন্দলাল বসু এবং অসিতকুমার হালদার এখানে পড়াতেন। বিনোদবিহারীর ভাবনাচিন্তা, ছবি আঁকার ধরন ছিল অন্যান্য পড়ুয়াদের থেকে আলাদা। তাঁর কাজ প্রথম দিকে নন্দলালকে খুব একটা আকৃষ্ট করত না, কিন্তু তরুণ বিনোদবিহারীর অধ্যাবসায় অচিরেই নন্দলালের মন জয় করে নেয়। রবীন্দ্রনাথের অপার স্নেহ পেয়েছিলেন বিনোদবিহারী। তাঁর ভিতর লুকিয়ে থাকা সম্ভাবনাকে চিনতে পেরেছিলেন অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরও।
চিত্রকলায় ইতিমধ্যেই নিজস্ব ধারা তৈরি করেছিলেন বিনোদবিহারী। প্রকৃতির মধ্যে তিনি কল্পনার মুক্তি খুঁজে পেতেন। ছাত্রজীবন শেষ হলেও শান্তিনিকেতন ছেড়ে যাননি। আশ্রমের গ্রন্থাগারে কর্মী হিসেবে যোগ দিলেন। এরপর শিক্ষকতা শুরু করলেন কলাভবনে।
আরও পড়ুন
যুগে যুগে পট কাব্যের কালীঘাট
১৯৩৬-৩৭ সালে বিনোদবিহারী চিন ও জাপান ভ্রমণে গেলেন। এই ভ্রমণ তার সৃষ্টিকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছিল। এরপর তিনি শান্তিনিকেতনের সন্তোষালয়, কলাভবনের ছাত্রাবাস, হিন্দিভবনের মতো বেশ কিছু জায়গায় অনবদ্য সব ম্যুরাল এঁকেছিলেন। ১৯৪৯ সালে তিনি চলে যান নেপালে। ওখানকার সরকারি জাদুঘরে কিউরেটরের দায়িত্ব নেন। তারপর কখনও রাজস্থানে, কখনও মুসৌরিতে, কখনও বিহারে কাটিয়েছেন তিনি। কখনও স্ত্রী লীলা এবং মেয়ে মৃণালিনী সঙ্গে ছিলেন, কখনও বা নানা প্রয়োজনে তাঁরা অন্য কোথাও গিয়ে থাকতেন। এরই মধ্যে চলছিল ছবি আঁকা। ১৯৫৭ সালে দিল্লিতে বিনোদবিহারীর চোখে ছানির অস্ত্রোপচার ব্যর্থ হওয়ায় দৃষ্টিশক্তি পুরোপুরি হারিয়ে ফেলেন তিনি। কিন্তু ভেঙে পড়েননি। ফিরে আসেন শান্তিনিকেতনে। কলাভবনে এমিরিটাস প্রফেসর পদে যোগ দেন। এর পরেও ছবি এঁকেছেন, রঙিন কাগজ কেটে ছবি তৈরি করেছেন। ‘আধুনিক শিল্পশিক্ষা’, ‘চিত্রকর’-এর মতো বই লিখেছেন ডিকটেশনের মাধ্যমে। স্বনামধন্য চলচ্চিত্রকার, শিল্পী, সাহিত্যিক সত্যজিৎ রায় ছিলেন তাঁর ছাত্র। তিনি বিনোদবিহারীকে নিয়ে ‘ দ্য ইনার আই’ নামের এক তথ্যচিত্র নির্মাণ করেন। রবীন্দ্র পুরস্কার, দেশিকোত্তম, পদ্মবিভূষণের মতো নানান সম্মাননায় ভূষিত হয়েছিলেন বিনোদবিহারী। ১৯৮০ সালে দিল্লিতে তিনি প্রয়াত হন।
তথ্যঋণ – সুদেষ্ণা বসু, সোহম দাস।