No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    শক্তি-সুনীল উপহার দিলেন ‘যুগলবন্দী’, নিচে নেমেই সে-বই বেচে দিলেন বিনয় মজুমদার

    শক্তি-সুনীল উপহার দিলেন ‘যুগলবন্দী’, নিচে নেমেই সে-বই বেচে দিলেন বিনয় মজুমদার

    Story image

    গল্পটা বলেছিলেন প্রেসিডেন্সির বাংলা বিভাগের একজন অধ্যাপক। আমরা তখন সদ্য ফার্স্ট ইয়ার। বিনয় মজুমদারের ‘ফিরে এসো, চাকা’ এবং ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’ পড়ে রীতিমতো ঘোর তৈরি হয়েছে। আমার সহপাঠী-বন্ধু স্নিগ্ধদীপ তো বিনয় বলতে অজ্ঞান। সে হাবড়ার ছেলে। এই বয়সে বন্ধুরাই ছোঁয়াচে রোগ সাপ্লাই করে। আমরাও স্নিগ্ধর থেকে বিনয়ের খবর পাই। ঠাকুরনগর স্টেশনের কাছেই শিমুলপুর গ্রাম। সেখানেই একটা ছোট্ট বাড়িতে নিজের জগতে বুঁদ হয়ে থাকেন বিনয়। সামনে সামান্যই বারান্দা ও বাগান। একজন মালীও আছেন। বিনয়কে দেখাশোনা করেন তিনিই। অনেক তরুণ, যুবক কবিরাই মাঝেমাঝে আসে সেই বাড়িতে। নানা কথা হয়। অসুস্থ বিনয়ের হাত কাঁপে, কথা অসংলগ্ন। মাঝেমাঝেই কাঁপা কাঁপা গলায় গেয়ে ওঠেন রবীন্দ্রসঙ্গীত। এই সবটাই কেমন আকর্ষণ করে। ভাবি, একদিন আমরাও হাজির হবে শিমুলপুরে।

    আমাদের যাওয়া হয় না। তার আগেই ইহলোকের সমস্ত তল্পি-তল্পা গুটিয়ে চলে গেলেন বিনয়। এমনই এক ১১ ডিসেম্বরে। ২০০৬ সালে কলকাতায় অবশ্য শীত একটু আগে-ভাগেই আসত। সেদিনও শীত ছিল ভালোই। শিমুলপুরে খানিকটা বেশিই...

    এরপর যা যা হয়, কলেজে একটা ছোটো সেমিনার। একটা তথ্যচিত্র। আর আলোচনা। বিনয়কে নিয়ে অনেক না-জানা গল্প উজিয়ে উঠল। তখনই গল্পটা বলেছিলেন আমাদের প্রিয় স্যার। তখন সদ্য বেরিয়েছে শক্তি আর সুনীলের যৌথ কবিতার বই ‘যুগলবন্দী’। একদিন স্যার কলেজস্ট্রিটে পুরোনো বই দেখছেন। হঠাৎ চোখে পড়ে গেল নতুন, ঝকঝকে ‘যুগলবন্দী’। পুরোনো বইয়ের মাঝেই নতুন বই! বইটা হাতে নিয়ে খুলতেই স্যার অবাক। প্রথম পাতায় লেখা ‘বিনয়দা-কে’। নিচে শক্তি চট্টোপাধ্যায় আর সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সই। সইয়ের নিচে তারিখ। কী আশ্চর্য, এ তো গতকালের তারিখ। প্রাথমিক বিস্ময় কাটিয়ে সবটা বুঝতে পারেন স্যার। গতকাল সন্ধেয় কফি হাউসের আড্ডায় হয়তো বিনয়কে বইটি উপহার দিয়েছিলেন শক্তি-সুনীল। নিচে নেমেই সেই বই বেচে দিয়েছিলেন বিনয়।

    শোনা কথায় তথ্য সামান্য এঁকেবেঁকে যায়। হয়তো উৎসর্গে আরো কিছু লেখা ছিল। স্যার বলেওছিলেন। মনে পড়ছে না। কিন্তু, এই গল্পটা উপসংহার-বিহীন ছিল না। স্যার বলতেন, “কেন যে তোমরা আর নতুন কবিরাও ওঁকে নিয়ে এত মাতামাতি করো! উনি অন্যান্য কবিদের খুব সম্মান দিতেন কি?” স্যার নিজেও কবি। তার এই প্রশ্নের উত্তরও আসলে প্রশ্নের ভিতরেই নিহিত। আমরা কথা বাড়াতাম না।

    অথচ অনির্বাণদা, কবি অনির্বাণ দাস আমাদের অন্য গল্প শোনাতেন। শিমুলপুরের বাড়ির নাম ছিল ‘বিনোদিনী কুঠি’। ঐ সাদামাটা বাড়িতেই নাকি প্রায় হানা দিত ছোটো পত্রিকার কবিরা। বিনয় মজুমদারের জন্মদিনে আড্ডা হত, বারান্দায় শতরঞ্চি পেতে কবিতা পাঠ। সেখানে আবীর সিংহ কবিতা পড়বেন। বিনয় বলে উঠলেন, “আবীর, ওই কবিতাটা পড়ো। ‘জাহাজরা ডোবে না, আত্মহত্যা করে...” আবীর সিংহ-র মতো আদ্যোপান্ত একজন ছোটো পত্রিকার কবির কবিতাও কত যত্নে মনে রেখেছিলেন বিনয়! তথ্যে-তথ্যে ঘষা লাগে, বিভ্রম তৈরি হয়।

    অনির্বাণদার মুখেই শোনা, প্রায়ই অল্পবয়সী কবি, পত্রিকার সম্পাদকরা গিয়ে নতুন কবিতার আবদার জুড়তেন। কাউকেই খুব একটা ফেরাতেন না বিনয়। হয়তো তখনই লিখে দিয়ে দিতেন নতুন কবিতা। অনির্বাণদাই একবার গিয়ে দেখলেন ঘরে ইলেকট্রিকের কাজ চলছে। অন্ধকারে একা বসে বিনয়। যথারীতি লেখা চাইলেন অনির্বাণদা। কিছুক্ষণের মধ্যেই ওই অন্ধকার ঘর, ইলেকট্রিক মিস্ত্রিকে নিয়ে অক্ষরবৃত্তে কবিতা লিখে দিলেন। কবিতার কপিও রাখলেন না। সেই কবিতার গুণমান যাচাই করার চেয়েও কবিতা-প্রাপ্তির আনন্দই বড়ো হয়ে উঠত তরুণ কবি-সম্পাদকদের। শেষ জীবনে আত্মময় ঘোরটা বেড়েছিল, অসুস্থতাও। বাড়ি থেকে বেরোতেও পারতেন না। কিন্তু, আগে এই মানুষটাই হয়তো আড্ডা জমিয়ে ফেলতেন স্টেশনের বাইরে দাড়িয়ে। নিজস্ব আন্তরকিতা জুড়ে থাকত আলাপে। কবি নির্মল হালদার যখন প্রথমবার গেছেন ‘বিনোদিনী কুঠি’-তে, তাঁকে দেখে বিনয় বলছেন, “নির্মল, বিয়ে করেছেন?”

    আবার এই মানুষটিই মাঝেমাঝে বেঁকে বসতেন জেদে। দামোদর ভ্যালি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে তাঁকে নাকি ‘সুধীন্দ্রনাথ দত্ত স্মৃতি পুরস্কার’ দেওয়ার কথা উঠেছিল। কলকাতায় গিয়ে পুরস্কার নিতে হবে। বিনয় বলে দিলেন, “যাব না।” পুরস্কার দিলে ঠাকুরনগরে এসেই দিতে হবে। শেষপর্যন্ত, ঠাকুরনগরে এসেই পুরস্কার দিয়েছিলেন উদ্যোক্তারা। এসেছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ও। মঞ্চে খুব বেশি হলে মিনিট পাঁচ-দশ ছিলেন বিনয়। তারপর পুরস্কার নিয়ে ফিরে এসেছিলেন বাড়িতে। হয়তো তারপর নিজের মনেই গেয়ে উঠেছিলেন রবীন্দ্রসঙ্গীত। হাতড়ে ছিলেন কাগজ-কলম। অক্ষরবৃত্তে শব্দের ঝাঁক নেমে এসেছিল সাদা পাতায়...

    ছাত্রবয়সের সেই ঘোর আর নেই। বিনয়ের কবিতায় প্রশ্নহীন মুগ্ধতাও জন্ম নেয় না আগের মতো। অনির্বাণদার সঙ্গে কথা হলে কখনো এসে পড়েন বিনয়। অনেকদিন পরে স্নিগ্ধ এসেছিল বাড়িতে। সকালে দুজনে বেরিয়েছি। স্নিগ্ধর হাতে সিগারেট। বিনয়কে নিয়েই কথা হচ্ছে। হঠাৎ, পাশ দিয়ে চলে গেলেন একজন রোগা, ঢিলে পাঞ্জাবি পড়া মানুষ। চন্দ্রাহত চোখ, খোঁচা-খোঁচা দাড়ি। অবিকল বিনয়! স্নিগ্ধ চমকে গিয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করল, “ইনি কি তোদের পাড়ায় থাকেন?” আমি মনেই করতে পারলাম না। অথচ, এমন তো হওয়ার কথা নয়!

    অনেক খুঁজেছি পরে, কিন্তু সেই মানুষটিকে আর দেখতে পাইনি পাড়ায়। শুনে স্নিগ্ধ হেসে বলেছিল, “দুজনেই হয়তো ঘোরে ছিলাম সেদিন।” কলেজবেলায় ভাবতাম, বিনয় এক অসুখের নাম। হয়তো ঠিকই ভাবতাম।

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @