বিভূতিভূষণের নিশ্চিন্দিপুর বনাম সত্যজিতের পালসিট — কেমন আছে এই স্টেশন?

‘পথের পাঁচালি’ উপন্যাসে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় দেখিয়েছেন অপুর রেলগাড়ি দেখার দৃশ্য। নিশ্চিন্দিপুর গ্রামে কাশফুল পেরিয়ে সে ছুটছে ট্রেন দেখবে বলে। পরবর্তীকালে সত্যজিৎ রায়ও এই দৃশ্য দেখিয়েছিলেন অত্যন্ত সুচারুভাবে। সেখানে ছিল তাঁর নিজস্বতার ছাপ। স্থান পাল্টে গেছে, দৃশ্যও খানিক বদলে গেছে। কারণ সত্যজিৎ চেয়েছিলেন অপু আর দুর্গা একসঙ্গে রেলগাড়ি দেখুক। নিশ্চিন্দিপুরের আদল খুঁজছিলেন সত্যজিৎ। সত্যজিৎ রায়ের তখন টাকাপয়সার অবস্থা তেমন ভালো নয়। তাই ক্যামেরা নিয়ে বেশি দূর যাওয়া যাবে না। এমন একটা জায়গার খোঁজ করছিলেন, যেখানে কাশবনের পাশে রেললাইন থাকবে এবং সেটা বড়ো রাস্তার ধারে হবে। তারপরেই এই জায়গাটির খোঁজ এনে দেন সত্যজিৎবাবুর প্রোডাকশন ম্যানেজার অনিল চৌধুরি। কিন্তু কোন সেই জায়গা?
পালসিট। পূর্ব বর্ধমান জেলার ছোট্ট একটা স্টেশন। আজ থেকে প্রায় ৬৬ বছর আগে এই স্টেশনেই শ্যুটিং হয়েছিল ‘পথের পাঁচালি’ চলচ্চিত্রের অপু-দুর্গার রেলগাড়ি দেখার জন্য কাশফুল পেরিয়ে ছুটে যাওয়ার সেই অমোঘ দৃশ্য। আবহে রবিশংকর বাজাচ্ছেন সেতার। যে দৃশ্য বিশ্বখ্যাত। বিভূতিভূষণের উপন্যাসের এই জায়গাকে জীবন্ত করে তুলেছিলেন সত্যজিৎ। যা আজও দর্শকদের কাছে নস্টালজিক।
একদিকে রেললাইন আরেকদিকে জিটি রোড। মাঝখানে ছিল সেই কাশবন। সত্যজিৎ রায় দিনের পর দিন এখানে এসেছেন, থেকেছেন। আজও শরতে কাশে কাশে ছেয়ে যায় পালসিটের এই জায়গা। আজও সেখানকার মানুষ স্মরণ করেন বইয়ে পড়া এবং চোখে দেখার সেই দৃশ্য। স্মরণে থাকে কালজয়ী চরিত্র অপু আর দুর্গা। স্মরণে থাকেন বিভূতিভূষণ এবং সত্যজিৎ।
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের যেকটি উপন্যাস/গল্প থেকে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ পথের পাঁচালি; এই ব্যাপারে কোনো দ্বিমত নেই। পালসিটের নতুন প্রজন্মরা, যারা সদ্য পড়েছে পথের পাঁচালি, তাদের কাছে এ এক সুখের জায়গা। কারণ বইয়ের নিশ্চিন্দিপুরের খোঁজ তারা পেয়ে যায় স্টেশনের কাছে গেলেই। বিশেষ করে শরৎকালে যখন স্টেশনচত্বর ভরে যায় সাদা সাদা কাশফুলে, এই প্রজন্মের অপু-দুর্গারাও ছুটে যায় বৈকি! তখন তাদের কাছে ট্রেন দেখার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে ছুটে যাওয়া।
বিভূতিভূষণের কাছে বাংলা সাহিত্য ঋণী। ঠিক যেমন সত্যজিৎ রায়ের কাছে ঋণী বাংলা চলচ্চিত্র। দুই দিকপালের সৃষ্টি এবং মাঝে পড়ে থাকা একটা স্টেশনকে আজও স্মরণ করেন সেখানকার মানুষ। প্রত্যেক বছর এলাকায় মানুষরা বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্মদিনে সেই স্টেশনের কাছে গিয়ে তাঁকে স্মরণ করেন৷ স্মরণ করেন সত্যজিৎ রায়ের জন্মদিনেও। ফিরে যেতে চান অমোঘ দৃশ্যটির কাছে। সত্যজিৎ রায়ের পথের পাঁচালি এবং পালসিট স্টেশনকে আবিষ্কার করাও রবিশংকরের আবহের মতো কানে বাজে বৈকি!