ভাস্করের চিতায় এক প্যাকেট সিগারেট রেখে এলেন কবি মৃদুল দাশগুপ্ত

‘যখনই মৃত্যুর কথা মনে পড়ে, ইচ্ছে করে, সিগারেট ধরাই।’
‘জিরাফের ভাষা’-র ১৯নং কবিতায় লিখেছিলেন ভাস্কর। জীবনের শেষ কবিতার বই। তারপর মৃত্যু এসে ডেকে নিয়ে গেল তাঁকে। আর ভাস্কর যখন পুড়ছেন, শেষবারের মতো, তাঁর আগুনের ওপর এক প্যাকেট সিগারেট দিয়ে এসেছিলেন কবি মৃদুল দাশগুপ্ত। সিগারেট ছাড়া ভাস্করের যাওয়া যে মানায় না।
ভাস্করের কবিতায়, শয়নযানের গদ্যে বিছিয়ে আছে সিগারেট। ১৯৯১-৯২ সালের ডায়েরিতেও ভাস্কর বারবার তুলে এনেছেন সিগারেটের প্রসঙ্গ। কখনো লিখছেন- ‘সিগারেটের নেশা ছাড়তে পারলাম না এই জন্যে যে সিগারেটের নেশা আমি ছাড়তে চাই না। যদিও, অজানা নয় আমার কাছে, শেষ সিগারেটের দিন কী দ্রুতই না ঘনিয়ে আসছে।’ এর কিছুমাস পরেই অবশ্য লিখছেন সিগারেট কমিয়ে আনার কথা। তারপর ফের সিগারেটকেই আঁকড়ে ধরা স্বীকারোক্তি—‘আমি বোধহয় সিগারেট খাওয়ার জন্যেই বেঁচে আছি।’ সিগারেট আর মৃত্যুর ডাক তাঁর কাছে সমার্থক। ‘বয়স যতো বাড়ছে, সিগারেট ততো বাড়ছে’ লিখেই তবু তিনি জানান, ‘কিন্তু, কে না বাঁচতে চায়?’
বাঁচতে চেয়েও ভাস্কর ফিরে ফিরে যান সিগারেটের কাছে। লেখেন- ‘হে উন্মুখ, অচেনা পাখির ঠোঁটে আজকাল/ ইচ্ছে হয় শুয়ে থাকি—ধূমপান আরও বেড়ে যায়।’ মানসিক অবসাদ তাঁকে জড়িয়ে ধরে প্রেমিকার মতো। ভাস্কর বাগবাজারে মনোচিকিৎসক দেখাতে আসেন। হঠাৎ মাথায় উজিয়ে আসে কবিতার লাইন—‘গাছেরা আজ ছুটি নিয়েছে’। পাছে ভুলে যান পরে, তাই সেই চারটি শব্দ ভাস্কর লিখে রাখেন সিগারেট প্যাকেটের ভিতরের রাংতায়। নাহ, সিগারেট তাঁর কবিতাকেও ছাড়েনি।
আরো পড়ুন
‘আবার আসবে তো, সুন্দরম্?
আর ছাড়েনি মৃত্যু। ২০০৫ সালের জুন মাসেই স্পষ্ট হয়ে যায় ক্যান্সার বাসা বেঁধেছে তাঁর শরীরে। কিছুদিন আগেই বইমেলায় বেরিয়েছে ‘কীরকম আছো মানুষেরা’। একই বছরে দুটি বই বের করতে চাইছিলেন না ভাস্কর। তাই ‘জিরাফের ভাষা’র পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত থাকলেও ছাপতে দিতে চাননি প্রথমে। এদিকে মৃত্যু ক্রমে এগিয়ে আসছে। ভাস্কর ভর্তি হলেন ঠাকুরপুকুর ক্যান্সার হাসপাতালে। রেডিও থেরাপির পর বাড়িও ফিরলেন। অসুস্থ, মুমূর্ষু ও শয্যাশায়ী ভাস্করকে বিস্মিত করে দিয়ে ৭ জুলাই দুপুরে তাঁর হাতে এল নতুন কবিতার বই ‘জিরাফের বাসা’। বরানগরে, তাঁর বাড়ি বয়ে বইটি পৌঁছে দিয়ে এসেছিলেন প্রকাশক অরিজিৎ কুমার, গল্পলেখক গৌতম সেনগুপ্ত আর এই বই ছেপে বেরোনোর প্রধান কারিগর শঙ্খ ঘোষ। বইটা হাতে পেয়ে যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছিলেন ভাস্কর। চিলেকোঠার শয্যা থেকে নেমে এসেছিলেন নিচে, পায়চারি করেছিলেন অনেকক্ষণ, রাস্তায় হেঁটেও আসতে চেয়েছিলেন। একটা মানুষকে যেন নতুন জীবন দিচ্ছিল তাঁরই নতুন বই। আর, এর ঠিক ষোলো দিন পরে ভাস্কর চলে গেলেন চিরতরে। তাঁর শেষ কাব্যগ্রন্থের শেষ পঙ্ক্তিটা যেন ডাক ছড়াতে লাগল—‘চলে যেতে হয় বলে চলে যাচ্ছি, নাহলে তো, আরেকটু থাকতাম।’
‘নাহলে তো’-র পরে একটু থেমেছিলেন ভাস্কর। যতিচিহ্ন নিয়ে আজীবন খুঁতখুঁতে মানুষটা এই সাময়িক থামার মধ্যেও যাচাই করেছিলেন নিজের কবিতাকে। তারপর শেষ করেছিলেন পঙ্ক্তি। তাঁর চিরতরে চলে যাওয়ার আগে ‘জিরাফের ভাষা’ হাতে পাওয়াও যেন ছিল তেমনই এক যতিচিহ্ন। সাময়িক থামা। এমনভাবে না থামলে যে জীবনের পঙ্ক্তি শেষই করতে পারতেন না ভাস্কর।
খুব জানতে ইচ্ছে করে, ২২ জুলাই রাতে সেই সীমাহীন শারীরিক কষ্টের মধ্যে কি সিগারেট ধরাতে ইচ্ছে হয়েছিল তাঁর? হাতের কাছে সিগারেট না পেয়ে কি ডায়েরির দিকে হাত বাড়িয়েছিলেন? কবিতা এসেছিল তাঁর শিয়রের কাছে? যে মানুষটা কবিতা লেখার চেষ্টা ছাড়া আর কিছুই নাকি করতে পারেননি জীবনে, তাঁর কষ্টের রাতে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছিল অমোঘ কোনো শব্দ বা যতি? ভাস্কর সদ্যবিবাহিত স্ত্রীকে একটা চিরকুট ধরিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, “খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় এতে লেখা আছে, পাশের ঘরে গিয়ে পড়ো”। স্ত্রী বাসবী চক্রবর্তী পাশের ঘরে এসে চিরকুট খুলে দেখেন একটা কবিতা— ‘আমার ভাঙা টিনের মতো জীবন থেকে/ তোমার ভাঙা টিনের মতো জীবন থেকে/ লাফ দিলাম, বিয়ে।’ কবিরা হয়তো এমনই হন। ভাস্করের মতো তাঁর কবিতারাও হয়তো আরেকটু থাকতে চেয়েছিল জীবনের কাছে। কিন্তু ভাস্করকে ছেড়ে থাকা যে তাদের পক্ষেও অসম্ভব...
তথ্যঋণ: কবিতা সমগ্র, ভাস্কর চক্রবর্তী, দ্বিতীয় খণ্ড, সম্পাদনা: সুমন্ত মুখোপাধ্যায়। মৃদুল দাশগুপ্তের সিগারেট দিয়ে আসার ঘটনাটি খুব সম্ভবত জয় গোস্বামীর লেখা থেকে পাওয়া।