দর্শকদের জন্য ভিক্টোরিয়ায় অবন ঠাকুরের ‘ভারতমাতা’

নতুনভাবে সাজছে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হল। আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই আলাদা ফ্লেভার নিয়ে হাজির হবে এই ঐতিহাসিক সৌধটি। যেহেতু ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হল তৈরি করেছিলেন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শাসকেরা, তাই আম-ভারতীয়ের কাছে এই স্থাপত্য ঔপনিবেশিকতার চিহ্ন হয়েই রয়ে গেছে। কিন্তু এখন পাল্টাচ্ছে সময়। তাই ভিক্টোরিয়া কর্তৃপক্ষ চাইছে ঔপনিবেশিকতার বদনামকে ঝেড়ে ফেলে সৌধটিকে একেবারে স্বদেশী দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী সাজিয়ে তুলতে। যে কারণে আলাদা গ্যালারি খোলা হয়েছে ভারতীয় শিল্পকলার জন্য। ‘বেঙ্গল স্কুল অফ আর্ট’ থাকবে তাঁর বড়ো অংশ জুড়ে।
ভারতীয় শিল্পকলার সেই আলাদা গ্যালারিতেই দর্শকদের জন্য রাখা থাকছে অমূল্য সব সম্পদ। তার মধ্যে রয়েছে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কালজয়ী ছবি ‘ভারত মাতা’। ভিক্টোরিয়ার সেন্ট্রাল হলে শোভা পাবে এটি। বিশ শতকের প্রথম ভাগে যখন বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দানা বাঁধছিল ভারতীয় জাতীয়তাবাদ, তখন এই ‘ভারতমাতা’-র ছবিটি এঁকে সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন অবন ঠাকুর। ছবিটি কবে আঁকা হয়েছিল তা নিয়ে অবশ্য মত রয়েছে বেশ কয়েকটি। ‘ভারতশিল্পী নন্দলাল’ বইটির প্রথম খণ্ড দেখে জানা যায়, নন্দলাল বসু ড. পঞ্চানন মণ্ডলকে বলেছিলেন, “ওখানে অবনীবাবুর ফিনিশ-করা প্রথম বিখ্যাত ছবি ‘বঙ্গমাতা’ (১৯০২)। এই ‘বঙ্গমাতা’ই ‘ভারতমাতা’ হলেন ১৯০৫ সালে”। পার্থ মিত্র আবার ‘আর্ট অ্যান্ড ন্যাশানালিজম ইন কলোনিয়াল ইন্ডিয়া’ বইতে জানিয়েছেন ছবিটির রচনার সাল ১৯০৬। এই ছবি নিয়ে হয়েছে বিতর্কও। বহু ধর্মবিশ্বাসের দেশে ভারত মাতা কেন হিন্দু ঐতিহ্যে সজ্জিতা, প্রশ্ন উঠেছে তা নিয়ে। তা সত্ত্বেও কেউ অস্বীকার করতে পারেননি ছবিটির ঐতিহাসিক আর নান্দনিক গুরুত্ব। অবনীন্দ্রনাথের বেশ কয়েকটি ছবিই অনেকদিন ধরে রবীন্দ্রভারতী সোসাইটিতে সংরক্ষিত ছিল। এবার সেগুলোকে দর্শকের সামনে রাখা হবে। ‘ভারতমাতা’ ছাড়াও তার মধ্যে থাকছে ‘শাহজাহানের মৃত্যু’। রবীন্দ্রভারতী সোসাইটি বেশ কিছু শিল্পকীর্তি দীর্ঘমেয়াদিভাবে রাখার দায়িত্ব দিয়েছে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালকে। সেগুলো সবই নতুন গ্যালারিতে দর্শকদের জন্য রাখা থাকবে। অবন ঠাকুরের ছবির পাশাপাশি ররি ঠাকুরেরও ছবি রাখা হবে সেখানে। থাকবে ‘বিসর্জন’ ও বেশ কিছু ব্যাঙ্গচিত্র সহ গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কয়েকশো ছবিও।
প্রায় দুদশক বন্ধ রাখার পর আবারও খুলে দেওয়া হবে ভিক্টোরিয়ার রয়্যাল গ্যালারি। যার ফলে, বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈলচিত্র, রুশ আঁকিয়ে ভাসিলি ভেরেশক্যাজেনের সৃষ্টি করা একটি ছবি এবার দর্শকদের সামনে আসবে। এত সব দুর্লভ ছবির সঙ্গে সঙ্গে দর্শকদের জন্য থাকছে আরও কিছু উপহার। রাখা থাকবে সেই টেবিল, যার ওপর কাগজ রেখে ‘বন্দেমাতরম্’ গানটি লিখেছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। টিপু সুলতান এবং রঞ্জিত সিংহের তলোয়ার, মহাবিদ্রোহের আমলে ব্যবহার করা লি-এনফিল্ড রাইফেলও এবার দেখতে পাবেন সাধারণ মানুষ। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হলকে অপরূপ করে তোলার জন্য কয়েক টন মুলতানি মাটির প্রলেপ দিয়ে শ্বেতপাথরের এই বিশ্বখ্যাত স্থাপত্যটিকে পরিষ্কার করার কাজও শুরু হয়ে গেছে।
তথ্যসূত্র – এই সময়, আনন্দবাজার পত্রিকা