হাংরি সাহিত্য আন্দোলনের ‘ক্ষুধার্ত’ প্রদীপ চৌধুরীঃ বিকল্প সাহিত্যের ভাষা
.jpg)
গত ২৫ এপ্রিল কোভিডে আক্রান্ত হয়ে ৭৮ বছর বয়সে চলে গেলেন হাংরি আন্দোলনের অন্যতম স্রষ্টা, কবি প্রদীপ চৌধুরী। বাংলা ভাষার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সংবাদমাধ্যমে বেরোয়নি তাঁর মৃত্যুসংবাদ--অবিচুয়ারি। কেন বেরোবে? বাংলা সাহিত্যে প্রদীপ চৌধুরীর অবস্থানটা ঠিক কোথায়-কীরকম?
“স্বকাল আমাদের সময়ের ধারাবিবরণী নয়। নতুন ইতিহাস শুরু হওয়ার আগে পুরোনো ইতিহাস এক মিনিট স্তব্ধ যেখানে, অথচ শেষ হয় না…স্বকাল মানুষের এক জীবনের মহাআত্মা-বিপ্লবের হারিয়ে যাওয়া সেই সব গ্রন্থিগুলির অনুভূতিময় পুনরুদ্ধার।”
‘স্বকাল’ (একটি বিকল্প সাহিত্য পত্রিকা)-এর প্রথম সংকলনের (শ্রাবণ, ১৩৭৬) সম্পাদকীয়তে এ কথা লিখেছিলেন প্রদীপ। কুড়ি বছর বয়সে, প্রদীপ দর্শন নিয়ে স্নাতকোত্তর পড়ার জন্য ভর্তি হন বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই রবীন্দ্রনাথ প্রবর্তিত সাহিত্য-সাংস্কৃতিক শাখার সেক্রেটারি হিসেবে মনোনীতও হন। কিন্তু শেষ বছরে শান্তিনিকেতন থেকে তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘স্বকাল’ পত্রিকায় ‘অশ্লীল’ কবিতা লেখার অপরাধে তাঁকে বহিষ্কার করা হয়। অশ্লীলতার দায় তাঁর পিছু ছাড়েনি। ১৯৬৪ সালে ত্রিপুরা থেকে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়েছিল ‘হাংরি অ্যানথোপোলজি’-তে সরাসরি যুক্ত থাকার অভিযোগে। কলকাতা পুলিশ একই অভিযোগে গ্রেফতার করে হাংরি কবি শৈলেশ্বর ঘোষ, সুভাষ ঘোষ, সমীর রায়চৌধুরী, মলয় রায়চৌধুরী (বিহার থেকে) এবং হারাধন ধারা (দেবী রায়)-কে। ‘স্বকাল’-ই পরে ‘স্বকাল-ফুঃ’ এবং 'ফুঃ' নামে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছে। সম্পাদনা করেছেন প্রদীপ চৌধুরীই। সেই পত্রিকায় লিখতেন হাংরি-উত্তর হাংরি এবং দেশ-বিদেশের প্রতিষ্ঠান বিরোধী লেখকরা।
পরে অসমাপ্ত পড়াশোনা শেষ করেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। বুদ্ধদেব বসু এবং দীপক মজুমদার তখন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করতেন। তাঁদের কাছে প্রদীপ ছিলেন ‘ভালো ছাত্র’, শুধু তাই নয় প্রদীপকে বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষের বহিষ্কারের ঘটনাও মেনে নিতে পারেননি তাঁরা। প্রদীপ চৌধুরীর একান্ত অভিজ্ঞতা সব মানুষের অনুভূতির মতো উদ্বেল হয়ে ওঠে তাঁর মধ্যে। এবং তাঁর নিজস্ব অভিজ্ঞতাই কবিতার আকারে অভিব্যক্ত হতে চায়। হারিং সাহিত্য আন্দোলন শুরুর আগে, আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য কবিদের সঙ্গে যোগাযোগের সূত্রপাত হয় কলেজ স্ট্রিটের কফি হাউসে। সেখানে নিয়মিত আড্ডা দিতে যেতেন এই হাংরি কিংবদন্তি। তাঁর তাড়না ছিল কিন্তু তাড়া ছিল না, কারণ তাঁর কাছে ছিল অফুরন্ত সময়, যেমন সৃষ্টিলগ্ন থেকেই কবিতাও অফুরান। প্রদীপ লিখেছেন-
ক্ষুধার্ত প্রজন্মের স্রষ্টাগণ
“ভয় করা পাপ”
স্থির হয়ে আছে বুক বরাবর ঘড়ির কাঁটা।
অপঘাতে মৃত্যু হয়েছে একজন কবির।
গোয়েন্দা কুকুর তার ঘরে অনুপ্রবিষ্ট হয়েছে
শুঁকে দেখছে বিছানা, বালিশ, তোবড়ানো
টিনের বাক্স। তার না-দেখা প্রেমিকার
শায়ার ভেতর শিক্ষিত কুকুর পাশবিক মুখ ঢুকিয়ে দিয়েছে।
লাল-ফিতার স্বয়ংক্রিয় টিভিতে ভেসে উঠছে
শব্দস্রোত। বাংলা বর্ণমালায় লেখা শব্দ সব।
কি মানে এসবের? এর ভেতর কি লুকানো আছে?
যার কাছে মৃত্যু তুচ্ছ, টাকা তুচ্ছ, তুচ্ছ
চুঁইয়ে-পড়া-নারীর সোহাগ,
কোথায় উৎস কবিতার, কোথায় কোথায়?...
কবিতাটা এখানেই শেষ নয়। এরপর তিনি যা লিখেছিলেন তাতে হয়তো ‘সামাজিক’ বা ‘প্রাতিষ্ঠানিক’ পাঠকের কাছে রক্ষণশীলতার বর্ডার পেরিয়ে যাওয়া হবে, যে বর্ডার পেরনোর অপরাধে একদিন ভ্যান গঘ বা ঋত্বিক ঘটককে মানসিক হাসপাতালে পাঠানো হয়েছিল।প্রদীপ চৌধুরীর ভাষা বর্ডার পেরিয়ে যাওয়া ভাষা। ১৯৪৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি পূর্ব বাংলায় জন্ম, তিন বছর বয়সে মায়ের হাত ধরে কলকাতায় চলে আসা। তাঁর বাবা কলকাতার একটি স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। বাংলাদেশে বেশি সময় কাটাতে না পারলেও, সারাজীবনের জন্য তাঁর মনে গেঁথে ছিল সেদেশের মাটির নির্যাস। ফরাসি সাহিত্যের অনুরাগী ছিলেন প্রদীপ। ভালোবাসতেন র্যাঁবো (Rimbaud) । ‘স্বকাল’-এ বাংলা, ইংরেজি, ককবরক, জাপানি ছাড়াও ফরাসি ভাষায় লেখা ছাপা হত। ইংরজি ভাষায় (The Black Hole) ও ফরাসি ভাষায় (Ratri/La Nuit) নিজস্ব বইও আছে প্রদীপের। ‘অন্যান্য তৎপরতা ও আমি’, ‘চর্মরোগ’, ’৬৪ ভূতের খেয়া’, ‘কবিতাধর্ম’, ‘সংগঠিত অপমৃত্যু’…এরকম কতশত প্রথাবিরোধী লেখা সময়ের দরবারে উগরে দিয়েছেন তিনি। যেমন ‘যুদ্ধ’ কবিতাটি-
একটি মৃত গ্রহ থেকে যুদ্ধের সংকেত
ভেসে আসছে এখানে
এখানে এক ডিভিসন সৈন্য দাঁড়িয়ে আছে নিশ্চল
নৈঃশব্দ্য বেতার থেকে শোনা যায় নারীর ফিস্ফিস্
ওদের কোমর থেকে খসে পড়েছে লাইফ্-বেল্ট
এক শতাব্দীর ভুল যুদ্ধের শেষে ওদের
রাইফেলের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে
বুনো পাখির ঝাঁক
ওদের দণ্ডাজ্ঞাই ওদের স্বাধীনতা
ওদের গ্রেনেডগুলি বিস্ফোরিত হয়েছে—
এখন ইউকেলিপটাসের গন্ধে পুনরায়
জেগে ওঠে মহামারীগ্রস্ত এলাকা
জেগে ওঠা সেই মহামারীগ্রস্ত এলাকায় সস্তা সাফল্য নয়, রেখে গিয়েছেন বিকল্প সাহিত্য। ৬০-এর দশকে দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়ানো ছিল সহজ, আজকের মতো নিয়মকানুন-বাধা-বিপত্তি ছিল না। বিট জেনারেশনের সঙ্গে তিনি সরাসরি জড়িয়ে ছিলেন। সময় কাটিয়েছেন প্যারিসের বিট হোটেলে। অ্যালেন গিনসবার্গ, লরেন্স ফালেৎগেত্তি, কার্ল ওয়েইজনার, ক্লদ পেল্যু, চার্লস বুকওস্কি এবং অন্যান্যদের সঙ্গে চিঠিপত্র দেওয়া-নেওয়া চলত।
একবার এক সাক্ষাৎকারে প্রদীপকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ভারতের তুলনায় তাঁর লেখা আন্তর্জাতিকভাবে, বিশেষত ফ্রান্স এবং কানাডায় অনেক বেশি প্রকাশিত হয়েছে, এর কারণ কী?
প্রদীপ সাবলীলভাবে উত্তর দিয়েছিলেনঃ
“আমরা সকলেই কি একটা নির্দিষ্ট জায়গায় একভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে পারি? এটা কি স্বাধীন চিন্তা ও মত প্রকাশের পরিপন্থী? এক্ষেত্রে কয়েকজন বিখ্যাত লেখকের কথা বলতে পারি... নবোকভ প্রথমে রাশিয়ান, তারপরে ফরাসি, তারপর ইংরাজিতে লিখতে শুরু করেছিলেন। তাহলে তাঁকে আমরা কী বলবো, একজন রাশিয়ান যিনি ফরাসিতে লিখতেন, তারপর অ্যাংলো-আমেরিকান লেখক হয়ে গিয়েছিলেন? জোশেফ কনরাড, যিনি পোলিশ অথচ ফরাসি ভাষাতে লিখেছেন এবং ২০ বছর বয়স অবধি এক বর্ণ ইংরাজিও জানতেন না। পরে যেভাবে ইংরেজিতে লিখেছেন, তাতে স্বনামধন্য ব্রিটিশ লেখকের স্বীকৃতি পেয়েছেন! কাফকা চেক ছিলেন, লিখেছেন জার্মান ভাষায়...আমার এক চেক বন্ধু আছে, মাতৃভাষায় না লেখার জন্য তাকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ তকমা দেওয়া হয়েছে। তাই খুব স্পষ্ট করেই বলছি, নিজের মাতৃভাষা ছাড়া নিজের লেখা প্রকাশ করা যাবে না, এই ধরনের যুক্তির সঙ্গে আমি একমত নই। আমার পটুভূমিও জটিল। আমি ইতিমধ্যেই সমাজের প্রান্তে থাকা একটি ‘সংখ্যালঘু’ লেখক গোষ্ঠীর একজন হয়েছি।”
প্যারিসের বিট হোটেলে
প্রদীপ চৌধুরীর একান্ত বন্ধু, ফরাসি কবি-কোলাজিস্ট ব্রুনো সুরদঁ জানিয়েছেন, “জ্যাক কেরুয়াকের উত্তরসূরি ছিলেন কবি প্রদীপ চৌধুরী। বাংলার পবিত্র আগুন।"
বাঁদিকে ব্রুনো সুরদঁ মাঝে প্রদীপ চৌধুরী
হারিং কবি শৈলেশ্বর চক্রবর্তী বলে গিয়েছেন, “একটা টর্নেডো আসে। তার ভয়াবহতায় তছনছ হয়ে যাবে সব। ঘরবাড়ি ভেঙে পড়ে। গাছপালা মাটি ছেড়ে উঠতে শুরু করে। ভয়ে মুখ লুকায় মানুষ। হারিং আন্দোলন ছিল এইরকম একটা টর্নেডো। আর তার মুখপত্র ‘ক্ষুধার্ত’—সে হল টর্নেডোর পাকচক্র এবং গতিবেগ। অনেকেই বলেন, হাংরি জেনারেশন আন্দোলন ইজ ইকুয়াল টু ‘ক্ষুধার্ত’। একটি ক্রিয়ার প্রতিক্রিয়া যদি চলে বহুদিন ধরে তবু বুঝে নিতে কারোরই অসুবিধে থাকে না যে ক্রিয়াটির শক্তি ছিল বেশি।” হাংরি আন্দোলন শুরু হবার পর পশ্চিম বাংলায় বেশ কয়েকটি আন্দোলন শুরু হয়েছিল। কিন্তু অল্প দিনের মধ্যেই সেগুলি হারিয়ে যায়। বাংলা সাহিত্যের আধুনিকতার হত্যাকারী হিসেবে হাংরি আন্দোলন আজও প্রবলভাবে বর্তমান আছে। একটা সময় পর ‘ক্ষুধার্ত’ বন্ধ হয়ে যায়। ক্ষুধার্ত বন্ধ হওয়ার ১৮ বছর পর সাত্ত্বিক নন্দীর সম্পাদনায় ‘ক্ষুধার্ত সময়’ নামে ক্ষুধার্তের পুনরাভ্যুত্থান ঘটে। নতুন লেখকরা লেখে। সব্যসাচী সেনের (তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছিল, পাওয়া যায়নি) সম্পাদনায় বের হয় ৫টি সংকলন। ক্ষুধার্ত চেতনার আর এক রূপ “কারুবাসনা”। এরপরও বিকল্প সাহিত্যের ভাবনা নিয়ে প্রকাশিত হয়ে চলেছে একটার পর একটা লিটল ম্যাগাজিন।
২০১৯-এর কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলায় ত্রিপুরার কবি সাত্ত্বিক নন্দীর থেকে পেয়েছিলাম তাঁরই সম্পাদিত ‘ক্ষুধার্ত সময়’ (জানুয়ারি ২০০৬ সংকলন)। সেই পত্রিকায় হাংরি সাহিত্য আন্দোলনের আরেক অন্যতম স্রষ্ঠা কবি শৈলেশ্বর ঘোষের ‘ভাষা বিমোচন’-এ চোখ বুলিয়ে ৩৯ নম্বর পাতা উল্টে দেখলাম কবি প্রদীপ চৌধুরী। লিখেছেন-
জ্যোতিরেখা
ঘুম জানেনা জাগা জানেনা…
মাঝরাতের কিছু পর—তৃতীয় প্রহর?
আমি এই চতুর্ভুজ ঘরে বসে আছি। বাকস্তব্ধ। গতায়ু সঙ্গীত।
আমার ঠিকানা-বিমুখ অপভ্রমণ কবে কোথায় শুরু হয়েছিল
জানি তা মুদ্রিত বইয়ের পাতায় রয়ে গেছে, আরও কিছুকাল
থেকে যাবে, অনাদরে কূট জিঘাংসায়—তারপর নিক্ষিপ্ত হবে
অর্ধসহস্র পয়ঃপ্রণালীতে যেখানে নৈশব্দ্য ও মৃত্যুর বিশ্রাম; বিনোদন।
তাঁর ভাষা কোনো প্রতিষ্ঠান তুলে ধরতে পারেনি। তারা ‘বাউন্ডেড’। অনেক কিছুর কাছেই। সেকারণেই দার্শনিক-ভাষাবিদ নোয়াম চমস্কি থেকে শুরু করে হাংরি-প্রজন্ম-স্রষ্টারা বার বার ‘ঘ্যানঘ্যান’ করেছেন প্রতিষ্ঠানের ভাষার বিরুদ্ধে, সোচ্চার হয়েছে ক্ষমতার ভাষার বিরুদ্ধে। তাতে কার কি! তাঁরা পরিস্কার করে বলেছেন, ক্ষমতার সঙ্গে ভাষার সম্পর্ক সহজ নয়, জটিল। ক্ষমতা যখন যার করায়ত্ত থাকে, সে নিজের আধিপত্য বিস্তার ও তাকে স্থায়িত্ব দেবার আকাঙ্ক্ষায় বস্তুসমূহকে (নাম সমূহকে) ষড়যন্ত্রময় অবস্থানে নিয়ে যায়। ক্ষমতার খেলায় এটাই চমকপ্রদ কিন্তু অতি জটিল এবং অতি গোপন এক পদ্ধতি। বস্তুগুলিকে বারবার ষড়যন্ত্রময় অবস্থানে এনে ফেলে এমন এক নিঁখুত নেটওয়ার্ক তৈরি করবে, যে নেটওয়ার্কের বাইরে মানুষের চিন্তার ক্ষুদ্রতম কণাটিও পৌঁছতে পারে না। এটা পৃথিবীর সব ভাষা, সব ইতিহাস সম্পর্কে সমানভাবে প্রযোজ্য।
বাংলা সাহিত্যে প্রদীপ চৌধুরীর অবস্থানটা ঠিক কোথায়-কীরকম, এই প্রশ্নের উত্তর আমি আমার মতো করে দেওয়ার চেষ্টা করেছি। অতএবঃ
মেইনস্ট্রিম বা গতানুগতিক সাহিত্য বলতে যা বোঝায় সেখানে তাঁকে খুঁজে পাওয়া যাবে না, শুধু বিকল্প সাহিত্যের ভাষা হয়ে জ্বলে থাকবে নিবিড় একটি প্রদীপ।