No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    ডিজিটাল যুগের কবিতা 

    ডিজিটাল যুগের কবিতা 

    Story image

    বিশ্বায়নের সুফল আর কুফলের মধ্যে কোনটা বেশি, তাই নিয়ে অনেক বিতর্ক রয়েছে। প্রচুর লোক রয়েছেন বিশ্বায়নের পক্ষে, আবার বিপক্ষে রয়েছেন এমন লোকেরও অভাব নেই। তবে মোদ্দা কথাটা এই যে সমকালীন বিশ্বব্যবস্থাটাকে কেউ এড়িয়ে যেতে পারছি না। প্রযুক্তি বিপ্লবের তাণ্ডবে প্রত্যেক দিন লণ্ডভণ্ড হয়ে যাচ্ছে আমাদের জীবন। সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি, জ্ঞানচর্চা সবকিছু এমনভাবে পাল্টে গেছে যে, ঘড়ির কাঁটার উল্টো দিকে ফেরার কোনো উপায় নেই। ফেসবুক, ট্যুইটার, হোয়াটসঅ্যাপ এখন কর্মজীবনের অঙ্গ হয়ে পড়েছে। এখন কেউ আর বলতে পারে না যে আমি ইন্টারনেট না শিখে এক সফল কেরিয়ার তৈরি করব। কেরিয়ার। এই শব্দটা এখন আমাদের তাড়া করে বেড়ায় সকাল থেকে রাত, এমনকি ঘুমের ভেতরেও। এত সব কিছু ঘটে যাচ্ছে, আর কবিতায় তার প্রভাব থাকবে না সে কি হয়? এখান থেকেই যাত্রা শুরু করছে ডিজিটাল যুগের কবিতা। 

    তা এই ডিজিটাল যুগটা কী? অ্যাকাডেমিক ভাষায় বললে, নয়া-উদারবাদ এখন মধ্যগগনে। ৯০ দশকের শুরু পর্যন্ত ভারত চলত জওহরলাল নেহরু আর প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশের গড়ে তোলা মিশ্র অর্থনীতির ছন্দে। কিন্তু সারা পৃথিবীতে ওই সময়ে খোলা বাজারের খুব দাপট। পুঁজিবাদ তার ভোল পাল্টে আরও সর্বগ্রাসী হয়ে উঠেছে। ১৯৯১ সাল। নরসিমহা রাও তখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী, আর অর্থমন্ত্রী মনমোহন সিং। তাঁরা ভারতের বাজার খুলে দিলেন সারা বিশ্বের বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর কাছে। সরকারিভাবে বলা হল 'উদারীকরণ। ওই বছরই ভেঙে পড়ল সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক দুনিয়া। শেষ হল ঠান্ডা লড়াই।  

    এদিকে পরের বছরগুলোতে একে একে ভারতে ঢুকতে লাগল মোবাইল ফোন, এটিএম কার্ড, সোশ্যাল মিডিয়া, শপিং মল। বাস্তবতার ধারণাটই গেল বদলে। জাঁ বদ্রিলারের কথায়, রিয়েলিটির দুনিয়া ছেড়ে আমরা পা বাড়ালাম হাইপাররিয়েলিটির দুনিয়ায়। সেখানে সবকিছুই মায়া। সকালের খবরের কাগজ, টিভি, ম্যাগাজিন, রাস্তায় বড়ো বড়ো ফ্লেক্স, সিনেমা হল, মেট্রো স্টেশন, কানের হেডফোনে এফএম – সবেতেই ঠাসা বিজ্ঞাপন। বিজ্ঞাপনে মোড়া আমাদের জীবন। কোনো অভিনেত্রী এক বিজ্ঞাপনে জানাচ্ছেন যে তিনি একটা নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের বডি লোশন ব্যবহার করেন। তিনি সত্যিই কি নিজে সেটা মাখেন? কেউ জানে না। কিন্তু প্রচুর মানুষ তাঁর কথায় বিশ্বাস করে ওটাই কিনতে লাগল। এটাই মায়ার জগৎ। এটাই হাইপাররিয়েলিটি।    

    এই মায়ার জগৎ ঢুকে পড়ল কবিতার শরীরেও। পণ্য সংস্কৃতির চাপে মানুষের আবেগ-অনুভূতিগুলো আগের মতো কংক্রিট থাকছে না। দুঃখ, যন্ত্রণা, ভালোবাসা, কামনা, লালসা সব কেমন ঘ্যাঁট হয়ে গেছে দলা পাকিয়ে। গার্লফ্রেন্ডের সঙ্গে ব্রেক আপ হয়েছে। কিন্তু দুঃখ করার সময় নেই। অফিসের চাপ। বাড়ির ধ্যাতানি। এই সব মানসিক প্রবাহ যখন কবিতায় আশ্রয় খুঁজল, কবিতার অবয়ব হয়ে উঠল বিমূর্ত। জট পাকানো ভাষা। বহুরৈখিক তার গতি। লজিক্যাল ক্র্যাক। মানুষ এখন একসঙ্গে অনেক কাজ করে। এক যুবতী হয়তো মেট্রোয় উঠেছে, বসার জায়গা নেই, দাঁড়িয়ে আছে। কানে হেডফোন। গান শুনছে। ফেসবুক করছে তারই সঙ্গে। মাঝে মাঝে দেখে নিচ্ছে, নতুন কী মেসেজ ঢুকল হোয়াটসঅ্যাপে। এদিকে বসার জায়গা খালি হয়েছে কিনা, রয়েছে নজর। নিজের গন্তব্য স্টেশন আসলে নেমে যাবে, তাই খেয়াল রাখতে হচ্ছে সেটাও। তার মস্তিষ্ক যেভাবে বহুমুখী সার্ভিস দিচ্ছে, একালের কবিতাও একইভাবে ছড়িয়ে পড়ছে নানান অভিমুখে। শুরু আর শেষের কোনো সামঞ্জস্য নেই। এটা ডিজিটাল যুগের অবদান।   

    বাংলা কবিতায় চিহ্নের ব্যবহার হত শ্রুতি আন্দোলনের সময় থেকেই। তখনকার চিহ্নগুলো ছিল আদিম। চোখ, সূর্য, তির-ধনুকের ডায়াগ্রাম কবিতার মাঝখানে ঢুকে পড়ত। কিন্তু বিশ্বায়নের যুগে দেখা যাচ্ছে, কবিতায় সরাসরি চলে আসছে আন্তর্জাতিক সব চিহ্ন। সৌজন্যে ডিজিটাল প্রযুক্তি। যন্ত্রের ভাষা আর মানুষের ভাষার ফারাক কমে আসছে। ‘@’, ‘#’, ‘%’ – এই চিহ্নগুলো আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে এতটাই জড়িয়ে গেছে, যে এগুলোর প্রয়োগ কবিতাতেও ঘটছে সাবলীলভাবে। দশ-কুড়ি বছর আগের তুলনায় এখনকার কবিতা লেখার পরিবেশ সম্পূর্ণ আলাদা। এখন কাগজে কলমে লেখা কবিতার সংখ্যা কমছে। কবিরা ধীরে ধীরে ঝুঁকছেন অ্যান্ড্রয়েড ফোন, ল্যাপটপ, কিবোর্ডের দিকে। অনলাইন ম্যাগাজিনের ছড়াছড়ি সব জায়গাতে। এদিকে কোনো পত্রিকাই হয়তো কবিতা ছাপল না, থোড়াই কেয়ার। ফেসবুক আছে তো। পাঠকের কাছে পৌঁছনটাই হল আসল। কবিতার যেহেতু সর্বজনগ্রাহ্য কোনো মানদণ্ড হয় না, তাই একটা লেখা কারুর পড়ে মনে হচ্ছে খাজা এবং অখাদ্য, সেটাই আরেকজন পাঠকের কাছে হয়তো সার্থক কবিতা। মাতব্বরদের ছড়ি ঘোরানোর ফিউডাল প্র্যাকটিস এবং আভাঁ গার্দ উন্নাসিকতা আর পাত্তা পাচ্ছে না। তবে ডিজিটাল যুগের কবিতায় নানা ধারা, নানা প্রকাশভঙ্গি। বলা যেতে পারে, একালের কবিতার কোনো মূল ধারা নেই, রয়েছে কেবল অনেকগুলো ধারার সমষ্টি। 

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @