চলে গেলেন ষাটের দশকের প্রখ্যাত কবি পবিত্র মুখোপাধ্যায়

তিনি বাংলা ভাষার এমন একজন কবি, যিনি সাতটি মহাকবিতা এবং একটি আধুনিক মহাকাব্য লিখেছেন অনিবার্য প্রক্রিয়ায়। তাই তাঁকে ‘কবির কবি’ও বলা হয়। ষাট দশকের এই কবিকে নিয়ে লিখেছেন অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়-সহ বাংলা কবিতার দিকপালেরা। হৃদরোগ এবং ফুসফুসের সমস্যায় বহুদিন যাবৎ ভুগছিলেন তিনি। বৃহস্পতিবার সকালে প্রয়াত হলেন ‘আগুনের বাসিন্দা’, কবি পবিত্র মুখোপাধ্যায় ।
“কবি পবিত্র মুখোপাধ্যায়ের প্রয়াণের খবর অত্যন্ত বেদনাদায়ক। আমি মর্মাহত। বাংলা কবিতায় তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। প্রায় ষাট বছর ধরে তিনি ‘কবিপত্র’-এর সম্পাদনা করেছেন।” কবির মৃত্যুতে শোকজ্ঞাপন করেছেন লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি ও গবেষণা কেন্দ্রের কর্ণধার সন্দীপ দত্ত।
১২ ডিসেম্বর, ১৯৪০ সালে কবি পবিত্র মুখোপাধ্যায় অবিভক্ত বাংলার বরিশাল জেলার আমতলীতে জন্মগ্রহণ করেন। খুব ছোটবেলায় মাকে হারিয়ে কবির আশ্রয় হয় পিরোজপুরে মাসীর বাড়িতে। দেশ বিভাগের সময় ১৯৪৮ সালে অকালবিধবা মাসী সামান্য পূঁজি নিয়ে শিশু পবিত্র এবং যুবক পুত্রকে সঙ্গে নিয়ে কলকাতায় চলে যান। কবি নিজ প্রচেষ্টায় প্রথমে ভবানীপুর সাউথ সাবার্বাণ স্কুল ও পরে শ্যামাপ্রসাদ সান্ধ্য কলেজে পড়াশুনা করে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর বেয়ারার চাকরি নিয়ে যোগ দেন একটি বিমা কোম্পানিতে। অবসর সময় টিউশন এবং পড়াশোনা করতেন।কবি পবিত্র মুখোপাধ্যায় প্রথম জীবনে চেতনা বয়েজ স্কুলে শিক্ষকতা করেছেন। পরবর্তী সময় তিনি দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার বিদ্যানগর কলেজে অধ্যাপনা করেন। ওই কলেজে তিনি বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব পালন করেন। ২০০০ সালে এই কলেজ থেকে তিনি অবসরে চলে যান। ছাত্রাবস্থায়, ভবানীপুর সাউথ সাবার্বান স্কুলে পড়ার সময়ে তিনি কবিতা রচনা শুরু করেন। ১৯৫৭ সালে সাহিত্য পিপাসু কবিবন্ধুদের সাহচার্যে এবং সহায়তায় কবি প্রকাশ করেন ‘কবিপত্র’ নামে কবিতা পত্রিকা। দীর্ঘ ৬২ বছর যাবৎ তিনি আন্তরিকতার সঙ্গে ওই কবিপত্র প্রকাশ করেছেন। কবির প্রথম বই ‘দর্পনে অনেক মুখ’ বহু পুরষ্কারে ভূষিত হয়েছে। ২০০৯ সালে কবি রবীন্দ্র সাহিত্য পুরষ্কার পেয়েছেন।
তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে দর্পনে অনেক মুখ, শবযাত্রা, হেমন্তের সনেট, আগুনের বাসিন্দা, ইবলিশের আত্মদর্শন, অস্তিত্ব অনস্তিত্ব সংক্রান্ত, বিযুক্তির ম্বেদরাজ, শ্রেষ্ঠ কবিতা, দ্রোহহীন আমার দিনগুলি, অলকের উপখ্যান, আমি তোমাদের সঙ্গে আছি, পশুপক্ষি সিরিজ, ভারবাহীদের গান, আছি প্রেমে বিপ্লবে বিষাদে। কবি প্রধানত দীর্ঘ কবিতার কবি হিসেবেই বেশি পরিচিত। তাঁর শবযাত্রা ও ইবলিশের আত্মদর্শন স্বার্থক দীর্ঘ কবিতার নিদর্শন। এ ছাড়াও আছে অজস্র কবিতার বই ও সনেট গুচ্ছ। তাঁর সাহিত্য সম্ভার তাঁর জীবনবেদ বলে খ্যাত। পবিত্র মুখোপাধায়ের কবিতা পাঠের পূর্বে নিজেকে দীক্ষিত না করলে তাঁর কবিতার গভীর অনুভূতিপ্রদেশে পাঠকের যাতায়াত হয়ে ওঠে অসম্ভব। প্রচার বা প্রতিষ্ঠানকে নয়, আজীব লেখালিখিকেই সবথেকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন, তাই হয়তো বাংলা সাহিত্যের 'গডফাদার' গোছের পরিচিতি তিনি পাননি; এভাবেই চলে গেলেন অথচ, বাংলা সাহিত্যে চিরজীবী হয়ে থেকে গেলেন পবিত্র মুখোপাধ্যায়। তিনি নিজেই লিখেছেন-
হারিয়ে যাওয়র জন্য আসিনি, এসেছি তোমাদের
পরিশ্রান্ত শরীরের উপরে ছড়িয়ে ডালপালা
ছায়া দেবো বলে।
সে পথ যেদিকে যাক চলে,
কে যাবে কোথায়, তার
ঠিকঠিকানার খোঁজ নিতে
আমার কি দায়?
অন্ধকার থেকে আসে, অন্ধকার ফিরে চলে যায়,
তোমার আমার এই অবিচ্ছিন্ন আত্মার প্রবাহ।
হাসপাতালের বেডে যে শিশু জন্মালো
আর যে বৃদ্ধকে করে দাহ
ফিরে এসে দেখি—
ঘর আলো করেছে ঈশ্বর।
স্রোত উভয়ত আছে।
আজ মঞ্চজুড়ে হাঁটছে স্কন্ধকাটা এবং পিশাচে,
ফুঁ দিয়ে নেভাচ্ছে অভিপ্রেত শিখাগুলি;
প্রতীক্ষা করে না কেউ, প্রেমিকও নয়;
কালকের ফকিরও ভ’রে ঝুলি
নিয়ে যাচ্ছে কালো টাকা,
কিনছে মামুলি রাজ্যপাট।
তবুও আমরা শিল্পে বসিয়েছি আনন্দের হাট—
কিনে নাও সহজের একটুকরো জমি—
এরকম আহাম্মক বলে। আজ
চতুর ও চক্ষুষ্মাম
প্রায় সকলেই।
দিন না ফুরাতেই বেলাবেলি
বেরিয়েছি, দেখি কালো অন্ধ আজও আমার মতন
দাঁড়িয়ে রয়েছে কিনা জেব্রাক্রশিং-এ। হাত ধরে
পার করে দিতে চাই। মাথার উপরে ডালপালা
হয়ে যদি হাঁটি, আমি
এতোকাল যেভাবে পারিনি!
কিছু শোধ না করেই চলে যাবো
বলে তো আসিনি।
(হারিয়ে যাওয়ার জন্যে আসিনি, পবিত্র মুখোপাধ্যায়)