No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    ভালোবাসার মতো পোশাকেরও কোনো লিঙ্গ হয় না, বোঝাচ্ছেন বাঙালি পুরুষরা

    ভালোবাসার মতো পোশাকেরও কোনো লিঙ্গ হয় না, বোঝাচ্ছেন বাঙালি পুরুষরা

    Story image

    নেকেরই ধারণা রয়েছে সমকামী, রূপান্তকামীরাই ‘জেন্ডার ফ্লুয়িড ফ্যাশন’-এর বিষয়ে আগ্রহী। তাঁদের বলবো, ‘জেন্ডার ফ্লুয়িডিটি’ মানে আগে বুঝতে হবে। বাংলায় এর ভাবার্থ হতে পারে লিঙ্গ-নিরপেক্ষ বা বৈষম্যহীন। বাইনারিতে আটকে ফেলে সাজ পোশাককে আমরা মূলত দুটো ভাগে ফেলে দিই—মেয়েদের পোশাক ও ছেলেদের পোশাক। এর বাইরেও জগৎ আছে আমরা মনে রাখি কি? না, রাখি না। সেই কারণেই সারা পৃথিবী জুড়ে ‘জেন্ডার ফ্লুয়িড ফ্যাশন’ সচেতনতা আন্দোলন চলছে। যে কেউ যা খুশি পরতে পারে, সাজতে পারে – এই হল মূল কথা।

    জামা, জুতো, গয়না সবই জেন্ডার ফ্লুয়িড ফ্যাশনের আওতায় পড়ে। প্রথম বিশ্বের বহু দেশে এ বিষয়ে অনেককাল আগেই বিপ্লব ঘটে গেছে, আমাদের দেশ কবে সাবালক হবে জানা নেই। তবে, পুরাণ থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথ এবং অধুনা বহু বাঙালি পুরুষই ব্যতিক্রমী ভাবে বাঙালি সাজের ঘরানাকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরেছেন। শুধু তাই নয়, বাঙালি সাজ-পোশাকও যে লিঙ্গ-নিরপেক্ষ হতে পারে, তার দৃষ্টান্ত রেখেছেন। এখানে শুধু পুরুষদের কথা বলা হচ্ছে কারণ, একজন মহিলা যত সহজে ট্রাউজার, টি-শার্ট, শার্ট, কুর্তা ইত্যাদি পরতে পারেন, জোর করে চাপিয়ে দেওয়া সামাজিক-মানসিক প্রতিবন্ধকতার ফলে একজন পুরুষ তত সহজে স্কার্ট, শাড়ি, গয়না ইত্যাদি পরে চলাফেরা করতে পারেন না। 

    পুরাণে পুরুষ-চরিত্রদের আমরা গয়না পরতে দেখেছি আবার রবীন্দ্রনাথকে দেখেছি দেশে-বিদেশে জোব্বা বা লং ড্রেস পরতেন। এগুলো কিন্তু ‘জেন্ডার ফ্লুয়িড’ ফ্যাশনের কথাই বলে। ঋতুপর্ণ ঘোষ, সুদর্শন চক্রবর্তী, সুজয় প্রসাদ চ্যাটার্জি, সৌরভ দাস, ঋষভ বসু বা ‘বং মুন্ডা’ পুষ্পক সেন বাংলার সাংস্কৃতিক জগতের বহু মুখ সেই ধারাকেই বহন করেছেন বা করছেন। বাংলা-কে তাঁরা বোঝাচ্ছেন গোলাপি আর শুধু মেয়েদের রং নেই। পুরুষের রং শুধু নীল-সাদা-কালো নয়। চিরাচরিত ফ্যাশন-ভাবনাকে দুমড়ে মুচড়ে ভাঙছেন তাঁরা।

    পরনে শাড়ি, নিখুঁত আঁচল, কুচির ভাঁজ। লিঙ্গভেদের বেড়াজাল ভেঙে মিলানের রাস্তায় এক বাঙালি যুবকের ফ্যাশন আপাতত সোশ্যাল মিডিয়ার নতুন ‘সেনসেশন’। ফেসবুকে তাঁকে খুঁজলেই ভেসে উঠছে ‘পপুলার নাউ’। কলকাতার সেই যুবকের নাম পুষ্পক সেন। আদ্যোপান্ত কলকাতার বাঙালি। ক্যালকাটা বয়েজ়ে স্কুলজীবন। তার পর আশুতোষ কলেজ। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর করার পরে অতিমারির মধ্যেই ইটালি-যাত্রা। ফ্লোরেন্সের বিখ্যাত ফ্যাশন ইনস্টিটিউট ‘পলিমোডা’-য় ‘ফ্যাশন মার্কেটিং অ্যান্ড কমিউনিকেশন’ নিয়ে পড়তে গিয়েছেন পুষ্পক। আর বিশ্বের ফ্যাশন-রাজধানীতে পা রেখেই হইচই ফেলে দিয়েছেন নেট-দুনিয়ায়—ইতালির রাস্তায় শাড়ি পরে হেঁটে বিপ্লব ঘটিয়ে ফেলেছেন।

    পুষ্পক সেন

    ২৬ বছরের সেই তরুণ এক সাক্ষাৎকারে জানাচ্ছেন, ‘‘শাড়ি পরলে বা ওই বাহ্যিক সাজে পৌরষত্ব চলে যাবে, তা তো নয়। ভিতরের আমি, আমিই। আমি চেয়েছিলাম, গোটা পৃথিবী শাড়িকে ফ্যাশন-স্টেটমেন্ট হিসেবে দেখুক। এ দেশে এসে দেখেছি, অনেক ভারতীয় রয়েছেন। কিন্তু কেউই তেমন দেশের পোশাক পরেন না। রোজকারের সাজ বা পার্টি, সবেতেই পশ্চিমি পোশাক গায়ে গলাচ্ছেন সকলে। সেই থেকেই মনে হয় এই ভাবনাটা এসেছিল। আমাদের দেশের যে একেবারে নিজস্ব, সকলের থেকে আলাদা ফ্যাশন রয়েছে, সেটাই বিশ্বকে দেখাতে চেয়েছি।’’

    অভিনেতা রিষভ বসু 

    একটি জনৈক ইংরেজি সংবাদপত্র তরফে ২০২১ সালে গড়িয়াহাটের মোড়ে একটি ফটোশুট করা হয়। বিষয় ছিল- ‘মেন ইন স্কার্ট’ অর্থাৎ স্কার্ট পরা পুরুষ। অমর্ত্য রায় নামে এক অভিনেতা ছিলেন মডেল। ফ্যাশনের ব্যাপারে তাঁর মত, “পুরোটাই নির্ভর করে আমার মুড-এর উপর। আমি তো টিপ আর নাকছাবিও পরি। আমার মনে হয় টিপ আমাদের মুখের অভিব্যক্তিকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। আমার বন্ধুরাও পছন্দ করে এটা। আমাকে স্কার্ট পরে দেখতে ওদের অন্ততঃ অসুবিধা হবে নয়। আমি ‘স্ট্রেট’ কিন্তু আমার মনে হয় না স্কার্ট বা এইধরনের পোশাকের সঙ্গে নির্দিষ্ট কোনও লিঙ্গের সম্পর্ক থাকে। যে কেউ যা খুশি পরতে পারে।”

    কোনও পুরুষকে শাড়ি বা স্কার্ট পরে দেখলে আশ্চর্য না হয়ে তাকে বাহবা দিন, পারলে মন খুলে সমালোচনা করুন কিন্তু ‘এটা পরো না, এটা মেয়েলি ওটা পুরুষালী’ ইত্যাদি বলে সমাজে দূষণ ছড়াবেন না।

    অভিনেতা সৌরভ দাস

    অমর্ত্য বা তাঁর বন্ধুরা এই প্রজন্মের মানুষ, তাঁরা মুক্তমনা, সংস্কারমুক্ত এবং সত্যেরে সহজে লইতে সক্ষম। কিন্তু যাঁরা প্রথাগত ধ্যান-ধারণা থেকে বাইরে বেরোতে পারলেন না, তাঁদের কী বক্তব্য? গড়িয়াহাটের মোড়ে স্কার্ট পরে ফটোশুট চলাকালীন পথচলতি মানুষ, আশেপাশের দোকানীরা আশ্চর্য দৃষ্টিতে দেখছিলেন অমর্ত্য’কে। সংবাদপত্রের তরফে এক ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করা হয়, ‘কেন আপনি এভাবে দেখছেন?” তিনি উত্তর দেন, “আমি তো আমার জন্মে কখনও এরকম দেখিনি। এতদিন জানতাম স্কার্ট শুধু মেয়েরাই পরে।”

    বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়, ওই ব্যক্তির সহজ স্বীকারোক্তি কিন্তু আমাদের সমাজের বেশিরভাগ মানুষের মনের কথা। পরিশেষে তাঁদের উদ্দেশ্যে বলি অভ্যেস, প্রথা, নিয়মের বাইরে বেরনোর পথ নিজেকেই তৈরি করে নিতে হয়। এবং সেই পথের হদিশ আপনি তখনই পাবেন,  যখন উদারতা, সাম্যবাদ এবং ভালোবাসাকে নিজের অন্তরে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবেন। এবার থেকে রাস্তায় কোনও পুরুষকে শাড়ি বা স্কার্ট পরে দেখলে আশ্চর্য না হয়ে তাকে বাহবা দিন, পারলে মন খুলে সমালোচনা করুন কিন্তু ‘এটা পরো না, এটা মেয়েলি ওটা পুরুষালী’ ইত্যাদি বলে সমাজে দূষণ ছড়াবেন না।

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @