ধনেখালি কিংবা জামদানি : বাংলার শাড়ির ভাঁজে হাতে বোনা গল্প

ধনেখালি
বঙ্গ জুড়ে শাড়ির উপাদান হিসেবে এখন জনপ্রিয়তার তুঙ্গে নির্ভেজাল সুতি বা পিওর কটন। পাওয়ারলুম বা মেশিন চালিত শাড়ি দামে সস্তা হলেও হ্যান্ডলুম বা হাতে বোনা শাড়ির ঐতিহ্যের পরিপূরক হতে পারে না কখনই। বাংলার সুতির শাড়ি মানেই শিল্প ও সংস্কৃতির মেলবন্ধন। খাঁটি সুতির পোশাক সবসময়ই প্রাকৃতিক তন্তু বুনে তৈরি করা হয়; কৃত্রিম সুতো মেশানো হয় না। বাংলার আবহাওয়া কম বেশি গরমই থাকে সারা বছর। দিন দিন বাড়তে থাকা এই গরমের সঙ্গে মোকাবিলা করতে সুতির পোশাকের বিকল্প নেই। যাঁরা শাড়ি পরতে ভালোবাসেন, তারা গরমের দিনে নির্দ্বিধায় সুতির শাড়িকে আপন করে নিতে পারেন।
আরামদায়ক সুতির জামদানি
বাংলার আবহাওয়া কম বেশি গরমই থাকে সারা বছর। আর এই অহসনীয় গরমের সঙ্গে মোকাবিলা করতে সুতির পোশাকের চাইতে ভালো কিছু হতেই পারে না।
বাংলার সুতির শাড়িগুলি যেমন আধুনিকতা বজায় রাখে, তেমনই পরিধেয় হিসেবে আরামের। আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য এই যে, যেকোনো বয়সেই এগুলি সমানভাবে মানানসই। সমগ্র বাংলা জুড়ে নানা ধরনের সুতির শাড়ি পাওয়া যায়, যেগুলির ভাঁজে ভাঁজে প্রতিফলিত হয় স্বতন্ত্র বয়ন কৌশল ও উৎপত্তিস্থল ভেদে সাংস্কৃতিক তারতম্য। যেমন ধনিয়াখালি বা ধনেখালি সুতির শাড়ি। ‘জি আই ট্যাগ’ দ্বারা স্বীকৃত এই শাড়ির জন্ম হুগলি জেলার ধনিয়াখালি অঞ্চলে। ধনেখালি শাড়ির ক্ষেত্রে মূলত ১০০ বাই ১০০ সুতোর কাউন্টের জমিন করা হয়; আর পাড় রাখা হয় অন্ততপক্ষে দেড় থেকে দুই ইঞ্চি চওড়া। ঐতিহ্যবাহী ধনিয়াখালি শাড়ি সাধারণত ধূসর রঙের হলেও বর্তমানে কারিগরেরা এতে বিভিন্ন রঙের ব্যবহার করে থাকেন। এই ধরনের শাড়ি পরে শরীর ও মন দুইই জুড়োয়।
সম্পূর্ণরুপে প্রাকৃতিক উপায়ে তৈরি হওয়ার কারণে এই শাড়িগুলি হয় জীবাণুবিয়োজ্য এবং এর প্রস্তুতিতে প্রকৃতির ভারসাম্য কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। গরমকালে কোনো অনুষ্ঠান হোক কিংবা দৈনন্দিন কর্মস্থল, ধনেখালি শাড়ি সবসময়েই বাংলার মহিলাদের পছন্দের তালিকায় থাকে।
আরও পড়ুন: ফুলিয়ার হাতে বোনা টাঙ্গাইল
ইদানিং ডবি সুতির শাড়ির চাহিদা তৈরি হয়েছে। ফেব্রিক শিল্পের জগতে ‘ডবি’ হল এক বিশেষ ধরনের ‘সেডিং ডিভাইস’, যা তাঁতের উপর একপ্রান্তে বসানো থাকে। এই সরঞ্জামের সাহায্যে এক বিশেষ ধরনের ‘রিপিট ডিজাইন’ সৃষ্টি করা যায় এবং যার মাধ্যমে ‘ট্যাপেট সেডিং’-এর চেয়ে বেশি এবং ‘জ্যাকার্ড সেডিং’-এর চেয়ে কম সংখ্যক টানা সুতো নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। অর্থাৎ বলা যায় যে ‘ডবি’ যন্ত্রের সাহায্যে সেইসব ক্ষেত্রে বুননের কাজ করা হয়, যখন কোনো ডিজাইনের প্রয়োজনীয় সংখ্যক ঝাঁপ ওঠানামা করানো বা ডিজাইনের রিপিটে পিক সংখ্যার নিয়ন্ত্রণ ট্যাপেটের ক্ষমতার বাইরে চলে যায়।
ডবি প্রিন্টের সুতির শাড়ি
সমগ্র বাংলা খুঁজলে বিবিধ প্রকারের সুতির শাড়ি দেখতে পাওয়া যায়, যেগুলির ছত্রে ছত্রে প্রতিফলিত হয় স্বতন্ত্র বয়ন কৌশল ও উৎপত্তিস্থল ভেদে সাংস্কৃতিক তারতম্য।
অন্য যেকোনো পোশাকের মতই শাড়িতেও জ্যামিতিক প্রিন্ট হয়। হালকা কোনো রঙের জমির উপর অপেক্ষাকৃত গাঢ় রঙের বরফিজাতীয় আকৃতি বুনন করা হয়। ডবি সহযোগে বুননের এই প্রথা প্রায় দুইশত বছর ধরে হয়ে চললেও শাড়ির ক্ষেত্রে ‘ডবি’র ব্যবহার প্রায় সাম্প্রতিক বললেই চলে।
জামদানি শাড়ির বয়ন পদ্ধতি প্রশংসার দাবি রাখে। জামদানি বুননকালে তৃতীয় একটি সুতোর সাহায্যে মূল জমিতে নকশা করা হয়। ২৬-৮০-৮৪ কাউন্টের সুতো ব্যবহৃত হয় জামদানি কাপড় বয়নের ক্ষেত্রে। ‘জামদানি’ নামকরণটি প্রসঙ্গে যদিও ভিন্ন ভিন্ন মতবাদ রয়েছে। কেউ মনে করেন, ফারসি ‘জামা’ ও ‘দানা’ (অর্থাৎ ‘বুটি’র নকশা) শব্দ দুটির মিশ্রনে ‘জামদানি’ শব্দটির সৃষ্টি হয়েছে, যার অর্থ দাঁড়ায় ‘বুটিদার কাপড়’। অপর একটি মত বলে, ফারসি ‘জাম’ (উৎকৃষ্ট মদ) ও ‘দানি’ (পেয়ালা) শব্দ দুটির মিলনে ‘জামদানি’র জন্ম; মদ্য পরিবেশনকারী ইরানি সাকির পরনের কাপড়ের নাম থেকেই এই নাম।
জামদানির মূল জন্মস্থান বাংলাদেশের ঢাকা হলেও সময়ের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের বহু জায়গায় এ জাতীয় ফেব্রিক প্রস্তুত করা হয়। বর্তমানে শাড়ির পাশাপাশি ওড়না, কুর্তা, পাঞ্জাবি প্রভৃতিতেও জামদানি নকশা দেখতে পাওয়া যায়। কারুকাজ ভেদে নানান ধরণের জামদানি নকশাকে অভিহিত করা হয় নানা নামে, যেমন – তেরছা, করোলা, পান্না হাজার, জলপাড়, বুটিদার, ঝালর, দুবলাজাল, বলিহার, চন্দ্রপাড়, বাঘনলি, সাবুরগা, কমলিলতা, ঝুমকা, জুঁইবুটি, পুইলতা, হংসবলাকা, কল্কাপাড়, ময়ূরপ্যাচ -- কথা বলে ওঠে শাড়ির পাড়। এসব নকশার অনেকগুলিই আর বর্তমানে দেখতে পাওয়া যায় না। তবে, কলকাতায় যোধপুর পার্কের একটি বিপণিতে বিলুপ্তপ্রায়, বিশেষ বিশেষ নকশাপাড়ের শাড়ির খোঁজ মেলে।
ধনেখালি
১২৭, যোধপুর পার্কের বিপণি ‘দ্য বেঙ্গল স্টোর’-এ রয়েছে খাঁটি সুতির শাড়ির আকর্ষণীয় সম্ভার। এখানকার বিবিধ প্রকার শাড়িতে ধরা আছে হাতে বোনা গল্প।