No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    বিশ্বের বৃহত্তম পান্না আবিষ্কার করে রেকর্ড গড়লেন বাংলার ভূতত্ত্ববিদ মানস বন্দ্যোপাধ্যায়

    বিশ্বের বৃহত্তম পান্না আবিষ্কার করে রেকর্ড গড়লেন বাংলার ভূতত্ত্ববিদ মানস বন্দ্যোপাধ্যায়

    Story image

    ম্প্রতি গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস বুক ’২২-এ মনোনীত হলেন দুর্গাপুর নিবাসী ভূতত্ত্ববিদ মানস বন্দ্যোপাধ্যায়। সবথেকে বড়ো অখণ্ড পান্নাটি আবিষ্কার করে রীতিমত আলোড়ন ফেলে দিয়েছেন বিশ্ব দরবারে। জাম্বিয়ার মাটি খনন করে পাওয়া গিয়েছে ৭,৫২৫ ক্যারট (1.505 kg/ 3 lbs এবং 5.09 oz) ওজনের এই পান্নাটি। দক্ষিণ-মধ্য আফ্রিকায় অবস্থিত জাম্বিয়ার কপারবেল্ট প্রদেশে রয়েছে কাজেম খনি, যেখানে দীর্ঘ সময় ধরে খননকার্য চালিয়ে যান মানস বন্দ্যোপাধ্যায়, রিচার্ড কাপেটা এবং তাঁদের দল। অবশেষে ২০২১ সালের জুলাই মাস নাগাদ খোঁজ মেলে অতিকায় পান্নাটির। শিল্প বিশেষজ্ঞদের অনুমান অনুযায়ী, ৭,৭২৭ ক্যারটের পান্নাটির বর্তমান বাজারদর ছাড়িয়ে যেতে পারে ১৫ কোটিকেও। আর এর জেরেই রাতারাতি পশ্চিমবঙ্গ তথা গোটা বিশ্বজুড়ে খ্যাতি লাভ করেছেন মানস।

    বাঁকুড়া জেলার সানবাঁধায় জন্ম। বাবা ছিলেন দুর্গাপুর স্টিল প্ল্যান্ট-এর কর্মচারী। ফলে পরিবারের সঙ্গে দুর্গাপুরের বিধাননগরে থাকতে শুরু করেন। স্থানীয় কাশীরাম দাস রোড বয়েজ হাইস্কুল, ডি এস পি-তে শুরু হয় পড়াশোনা। এরপর ‘জিওলজিক্যাল অ্যান্ড আর্থ সাইন্সেস’ নিয়ে পড়বার জন্য ভর্তি হন দুর্গাপুর গভর্নমেন্ট কলেজে। বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জিওলজি’তে স্নাতকোত্তর করার পর এম এস সি শেষ হতে না হতেই মুম্বইতে ভূতত্ত্ববিদ হিসাবে চাকরি পেয়ে যান। এখানেই তিনি সিনিয়র জিওলজিস্ট হিসাবে কঙ্গো, সেনেগাল এবং সৌদি আরবের বিভিন্ন খনিতে কাজ করার দায়িত্ব পান।

    ২০১৭ সালে পাকাপাকিভাবে জাম্বিয়ায় থাকতে শুরু করেন মানস। প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদের বিপুল ভান্ডার বরাবরই জাম্বিয়ার সামাজিক ও আর্থিক মেরুদন্ডকে আরও দৃঢ় করে তুলেছে। আগেও এখানকার খনিতে সন্ধান পাওয়া গিয়েছে ইউরেনিয়াম, রুপো, কোবাল্ট, তামা, কয়লা, লিড, জিঙ্ক, পান্না এবং সোনার মতো অতি মূল্যবান সব খনিজ পদার্থ। মানস কাজেম মাইনিং লিমিটেড-এ ‘মাইন জিওলজিস্ট’ পদে নিযুক্ত হন। জেমফিল্ডস এবং জাম্বিয়ান গভার্নমেন্ট’স ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন দ্বারা অধিকৃত এই কাজেম খনি হল বিশ্বের সর্ব্বৃহৎ একমাত্র রঙিন রত্ন উৎপাদক খনি। খনিটি জাম্বিয়ান কপার বেল্টের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত ‘এনডোলা রুরাল এমারাল্ড রেস্ট্রিকটেড এরিয়া’ নামে একটি খনিজ সমৃদ্ধ প্রদেশের কেন্দ্রে অবস্থিত। ১৯৯০ সালে খনি খনন কার্যের উপর চাপানো নিয়মগুলি খানিকটা লঘু করবার পর থেকেই, জাম্বিয়া মহামূল্যবান পান্না-খনির কেন্দ্র হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে।

    মানসবাবুর কঠোর অধ্যাবসায় আর পারদর্শীতার কারণে, এই কোম্পানিতে যোগদানের চার বছরের মধ্যেই প্রোডাকশান জিওলজিস্ট হিসাবে তিনি এক গুরুত্বপূর্ণ প্রোজেক্টের দায়িত্ব পেয়ে যান। যে ছয়জনের অভিযাত্রী দলটির সঙ্গে কাজে নেমেছিলেন, সে দলে ছিল জাম্বিয়ান খনি বিশেষজ্ঞ রিচার্ড কাপেটা ছাড়াও দু’জন জাম্বিয়ান নিরাপত্তারক্ষী। বহু অনুসন্ধানের পর অবশেষে ১৩ই জুলাই, ২০২১-এ তাঁদের হাতে আসে পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো অখণ্ড পান্নাটি। তাঁরা যার নাম রাখেন ‘চিপেমবেল’। জাম্বিয়া নিবাসী বেম্বা উপজাতির কথ্য ভাষা অনুযায়ী, ‘চিপেমবেল’ শব্দের অর্থ ‘গণ্ডার’। এর আগে বিভিন্ন সময়ে আরও দুটি অতিকায় পান্না উদ্ধার হয়েছিল এই একই জায়গা থেকে। সে দুটোর মধ্যে প্রথমটার আবিষ্কার হয় ২০১০-এ; নাম রাখা হয়েছিল ‘ইনসোফু’ অর্থাৎ ‘হাতি’। ২০১৮ সালে আবিষ্কৃত দ্বিতীয় পান্নাটির নাম রাখা হয় ‘ইনকালামম’, অর্থাৎ ‘সিংহ’। ‘ইনসোফু’র ওজন ছিল ৬,২২৫ ক্যারট (১.২৪৫ কেজি) এবং ‘ইনকালামম’-এর ওজন হয়েছিল ৫,৬৫৫ ক্যারট (১.২৪৫ কেজি)। ইজরায়েলের এশেদ-জেমস্টার নামের একটি হিরে ও পান্না সরবরাহকারী সংস্থা ‘চিপেমবেল’ বা ‘গণ্ডার পান্না’টিকে কিনে নিয়েছে। কাজেম-অধিকর্তা জেমফিল্ড লক্ষ্য করেছেন, কেবলমাত্র অনুকূল পরিবেশেই চিপেমবেল তৈরি হতে পারে।

    এশেদ ডায়াম ও জেমস্টারের অধিকর্তা আব্রাহাম এশেদ একটি সাক্ষাৎকারে বলেন, “আফ্রিকা এবং আফ্রিকান মূল্যবান রত্নগুলির সঙ্গে আমাদের যে সম্পর্ক গড়ে উঠেছে গত কয়েক বছরে, আমরা তা বরাবরই উদযাপন করতে চেয়েছি। আর পৃথিবীর সবথেকে বড়ো পান্নাটি যেভাবে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকরডস-এ জায়গা করে নিয়েছে, এর থেকে ভাল উদযাপনের উপলক্ষ্য আর কী বা হতে পারে? আমাদের কাজই হল সমগ্র বিশ্বের মানুষের সঙ্গে পৃথিবী জুড়ে ছড়িয়ে থাকা অসামান্য রত্নগুলির পরিচয় করিয়ে দেওয়া। আর এই তালিকায় সবার প্রথমেই রয়েছে আফ্রিকান রত্নগুলি। প্রাকৃতিক জেমস্টোনের প্রতি আমাদের এই ভালোবাসাকে আগামী প্রজন্মের কাছেও পৌঁছে দিতে চাই আমরা।”

    অবশ্য গত বছরের শেষদিকেই কাজেম মাইনিং লিমিটেড-এর চাকরিটিতে ইস্তফা দিয়ে নিজের দেশে ফিরে এসেছেন মানস । বর্তমানে নিজের দুর্গাপুর সিটি সেন্টারের বাড়ি থেকেই ‘জিওরকস্ কনসাল্টিং’ নামের একটি কোম্পানিতে সিনিওর কনসালট্যান্ট হিসাবে কাজ করছেন তিনি। তাঁর স্ত্রী রিমি বন্দ্যোপাধ্যায় একটি বেসরকারী স্কুলের শিক্ষিকা। বরাবরই চাকরির কারণে বাড়ি থেকে দূরে থাকতে হয়েছে মানসবাবুকে। সেসব সময়ে তাঁর স্ত্রী একা হাতেই ঘর-বাইরে সবদিক সামলেছেন। এখন মানসবাবু নিজেও সাহায্য করতে পারেন বলে সেই সমস্যার খানিকটা সুরাহা হয়েছে। অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে এই ভূতত্ত্ববিদ জানান, তাঁর আবিষ্কার যে সাধারণ মানুষকে ভূতত্ত্ব বিষয়ে আগ্রহী করে তুলেছে, এতে তিনি যারপরনাই খুশি। এর ফলে নতুন করে ভূতত্ত্ব নিয়ে পড়াশোনার আগ্রহ বাড়তে পারে বলেও আশা করছেন মানস বন্দ্যোপাধ্যায়।

     

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @