পৃথিবীর প্রথম ৭ ছিদ্রযুক্ত বাঁশের বাঁশিটি বাজিয়েছিলেন ‘ফ্লুট-গড’ পান্নালাল ঘোষ

দীর্ঘকাল বাঁশি আকারে ছিলো ছোটো। স্থান ছিল প্রধানত পল্লিসংগীতে। এক বঙ্গসন্তান সেটিকে দিলেন নতুন রূপ, নিয়ে গেলেন আবিশ্ব ধ্রুপদী সংগীতের আসরে—পৃথিবীর প্রথম ৩২ ইঞ্চি লম্বা, সাতটি ছিদ্রযুক্ত বাঁশের বাঁশি। কিশোর বয়সেই ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ে ব্রিটিশ পুলিশের হাত থেকে বাঁচার জন্য, জন্মস্থান বরিশাল থেকে ১৯২৬ সালে কলকাতায় পালিয়ে আসা পান্নালাল ঘোষ বাঁশিকে করে তুলতে পেরেছিলেন ‘কনসার্ট’ যন্ত্র—সেতার, সরোদ সানাই, সারেঙ্গির সমান, অর্থাৎ ধ্রুপদী সংগীতের আসরে যা একক গরিমায় বাজতে পারে মূল যন্ত্র হিসেবে।
পান্নালাল ঘোষ সম্বন্ধে কবীর সুমন ‘সুমনামি’-তে লিখেছেন, সারা দুনিয়ায় যাঁর স্থান একেবারে ওপরের সারিতে সেই মহাশিল্পী ছিলেন আশ্চর্য সরল প্রকৃতির। তাঁর বাবা সুধীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়ের কাছে তিনি শুনেছিলেন:
কলকাতার অক্রুর দত্ত লেনে হিন্দুস্তান রেকর্ডসের স্টুডিয়োয় তরুণ সুধীন্দ্রনাথ গ্রামোফোন রেকর্ড করছেন। শৈলেশ দত্তগুপ্তর সুরে বাংলা গান ও রবীন্দ্রনাথের একটি গান। রিহার্সাল চলছে। এমন সময়ে রেকর্ডিং ইঞ্জিনিয়ার এসে জানালেন, নিজের কাজে স্টুডিয়োয় এসে পান্নালাল ঘোষ মনিটরে সুধীন্দ্রনাথের গলা ও গান শুনে বায়না ধরেছেন এই তরুণ শিল্পীর সঙ্গে তিনি বাঁশি বাজাবেন। তখন ব্রিটিশ আমল। স্বয়ং বড়লাট হঠাৎ এসে হাজির হলেও শিল্পীরা অত অবাক হতেন না। পান্নালালের তর সইছিল না; তিনি ঢুকে পড়লেন স্টুডিয়ো ফ্লোরে। হাত জোড় করে বললেন, “আমায় একটু বাজাতে দিন”। সেশন-বাঁশিশিল্পীর কাছে করজোড়ে ক্ষমা চাইলেন, তাঁর অনুমতি প্রার্থনা করলেন বাঁশির দেবতা। সুধীন্দ্রনাথের প্রায় হার্ট এটাকের উপক্রম। সেশন-বাঁশিশিল্পী পান্নালালের পা ছুঁয়ে বললেন – “আমরা ধন্য”। পান্নালাল সুধীন্দ্রনাথের কাছেও অনুমতি চেয়ে নেন। বয়সে এমন কিছু বড় ছিলেন না তিনি সুধীন্দ্রনাথের থেকে, তাও সুধীন্দ্রনাথ তাঁকে প্রণাম করলেন।
পান্নালাল তো আর সঙ্গে বাঁশি আনেননি, এসেছিলেন অন্য কাজে। সেশন-শিল্পীর কাছ থেকে তাঁর বাঁশিটি চেয়ে নিলেন পান্নালাল। সে-যুগের রেওয়াজ ছিল রেকর্ডিং-এ বাঁশি গোটা গানটাই বাজাতো কণ্ঠশিল্পীর সঙ্গে। পান্নালাল কিন্তু তা করেননি। কেবল প্রিলিউড ও ইন্টারলিউডে বাজালেন তিনি। সুধীন্দ্রনাথ বলতেন, “গাইব কী। লোকটা যেভাবে গুনগুন করে, প্রায় ফিসফিস করে বাজাচ্ছে বাঁশিটা, আমার গলা দিয়ে তারপর গান আর বেরোচ্ছে না”।গ্রামোফোন রেকর্ডে অন্য কোনও যন্ত্রীর নাম ছাপা হয়নি। রেকর্ডের লেব্ল্-এ শুধু উল্লেখ করা হয়েছিল: বাঁশিতে পান্নালাল ঘোষ।
সারাজীবন ধরে সুধীন্দ্রনাথ বারবার বলে উঠেছেন, “ভেবে দ্যাখ্, খোদ পান্না ঘোষ যেচে বাঁশি বাজিয়ে দিলে রে! ও তো মানুষ না রে, দেবতা। যেচে, গায়ে পড়ে বাজিয়ে দিলে! জীবনে এটাও ঘটে গেল।”
এইরকমই কত মনিমুক্ত কথা ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে পান্নালাল আর তাঁর বাঁশির মহানুভবে, রাগসংগীতের গভীর আবেগে।