No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    জেল থেকে খবর ‘পাচার’ করতেন বাংলার প্রথম মহিলা রাজবন্দি ননীবালা

    জেল থেকে খবর ‘পাচার’ করতেন বাংলার প্রথম মহিলা রাজবন্দি ননীবালা

    Story image

    সময়টা উত্তাল। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সংগ্রামীরা নিজেদের দুই ভাগে ভেঙে দিয়েছেন। একদল গান্ধীজির দেখানো পথে হাঁটছেন। সবে লড়াইয়ের হাতিয়ার হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে ‘সত্যাগ্রহ’। গান্ধীজি ফিরে এসেছেন দক্ষিণ-আফ্রিকা থেকে। অন্যদিকে উগ্রপন্থী দলগুলো একের পর এক গেরিলা আঘাত হানছে সরকারের উপর। আলিপুর বোমা মামলায় অভিযুক্ত কানাইলাল আর সত্যেন জেলের মধ্যেই রাজসাক্ষী নরেন গোঁসাইকে খতম করে দিয়েছেন। কানাইলালের মৃতদেহ ঘিরে মানুষের ভিড় দেখে ভয় পেয়েছে ব্রিটিশ। রাজ্যের অন্যপ্রান্তে প্রফুল্ল চাকীর পেছনে ছুটছে পুলিশ। কিছুতে ধরা দিলেন না তিনি। বন্দুকের নল ঘুরিয়ে দিলেন নিজের দিকে... তারপর...

    তবে বাংলার এই দামাল ছেলেদের গল্প ফলাও করে পাঠ্যবইতে ছাপা হলেও, মেয়েদের নাম নেই বললেই চলে। স্বাধীনতা-সংগ্রামের যাঁরা মূল চালিকাশক্তি, আন্দোলনের গোপন খবর যাঁরা ছড়িয়ে দিতেন আনাচে কানাচে, যাঁরা বিপ্লবীদের হাতে অস্ত্র পৌঁছে দিতেন সাহসে বুক বেঁধে... তাঁরা হারিয়ে গিয়েছেন পিতৃতান্ত্রিক সন্দর্ভের ঘেরাটোপে। 

    ননীবালা দেবী। তাঁর নাম মাতঙ্গিনী-কল্পনা-প্রীতিলতার সঙ্গেই উচ্চারিত হওয়ার কথা। বাংলার প্রথম মহিলা রাজবন্দি তিনি। মধ্যবয়সী এই বিধবাকে ধরতে প্রায় কালঘাম ছুটে গিয়েছিল ব্রিটিশ পুলিশের। গুপ্তচরের চোখকে ধুলো দিয়ে পালিয়ে বেরিয়েছেন প্রদেশে প্রদেশে। ধরা পড়লেও দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই চালিয়েছেন কারাগারে। হাওড়া জেলার মানুষ। ১৬ বছর বয়সে বিধবা হয়েছিলেন। চেয়েছিলেন লেখাপড়া শিখতে। উনিশ শতকের রক্ষণশীল বাপের বাড়ি বাদ সাধলো। কিন্ত দমে যাবার পাত্রী নন তিনি। পিতৃগৃহ ত্যাগ করে আশ্রয় নিলেন আড়িয়াদহ মিশনে। যুগান্তর দলের বিখ্যাত বিপ্লবী অমরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ছিলেন ননীবালা দেবীর ভাইপো। তাঁর হাত ধরেই স্বাধীনতার মন্ত্রে দীক্ষিত হলেন ননীবালা। 

    সালটা ১৯১৫। জেলে বন্দি রামচন্দ্র মজুমদার। তাঁর কাছে খবর রয়েছে রাষ্ট্রের সম্ভাব্য পদক্ষেপ সম্পর্কে। গোপন তথ্য পৌঁছলেই বিপ্লবীরা পরিকল্পনা আঁটবেন পরবর্তী আঘাতটি হানার। কিন্ত পুলিশের খাতায় রয়েছেন সবাই। প্রত্যেকেই শাসকের চোখে ফেরারি আসামী। জেল থেকে তথ্য সরবরাহ প্রায় অসম্ভব। কার এমন বুকের পাটা? এগিয়ে এলেন ননীবালা। রক্ষণশীল ব্রাহ্মণ পরিবারের মেয়ে, রামচন্দ্রের স্ত্রী সেজে ঢুকলেন আলিপুর জেলে। নীরবে পাচার হল খবর। ব্রিটিশ পুলিশের নজর এড়িয়েই।

    চন্দননগরে, পুলিশের তাড়া খেয়ে বিপ্লবী আশ্রয় নিয়েছিলেন একটি বাড়িতে। যথাসময়ে দরজায় ধাক্কা পড়ল। পুলিশের সামনে দরজা খুলে দেখা দিলেন নকল ‘গৃহকর্ত্রী’। ‘অবলা’ ননীবালাকে দেখে পুলিশের সন্দেহ দূর হল। সে যাত্রায় রক্ষা পেল স্বাধীনতার সেনাবাহিনী। 

    কিন্ত আগুন কখনও চাপা থাকে না। জেলের ঘটনা ফাঁস হয়ে যাওয়ার পর ননীবালার উপর নজর রাখতে শুরু করল সরকার। কিন্ত সবার নজর এড়িয়ে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে আশ্রয় নিচ্ছেন অকুতোভয় এই নারী। জারি থাকল সরকার-ধ্বংসের যাবতীয় কার্যকলাপ। 

    পেশোয়ারে থাকাকালীন হঠাৎ ধরা পড়ল কলেরা। খবর পেয়ে হাজির পুলিশ। প্রায়-মুমূর্ষু ননীবালার ঠাঁই হল বেনারস জেলে। শুরু হল অকথ্য অত্যাচার। শোনা যায় অঙ্গে-প্রত্যঙ্গে ভরে দেওয়া হয়েছিল লঙ্কাগুঁড়ো। তবু মুখ থেকে কথাটি বেরোয়নি। ধর্মপ্রাণ বাঙালি মহিলার অসমসাহসের কাছে হার মেনেছিল রাষ্ট্র। শেষে একরকম হাল ছেড়েই তাঁকে চালান করা হয় প্রেসিডেন্সি জেলে।

    কারাগারেই অনশন শুরু করলেন ননীবালা। ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠল জেল কর্তৃপক্ষ। ননীবালা একটি দাবিসনদ পাঠিয়েছিলেন জেলারের কাছে। তাঁর সামনেই ছিঁড়ে ফেলে দিল অত্যাচারী শাসক। প্রত্যুতরে একটা বিরাশি সিক্কার চড় জুটল ব্রিটিশ পুলিশের। 

    ১৯১৯ সালে মুক্তি পেলেন তৎকালীন রাজবন্দীরা। মুক্তি পেলেন ননীবালা। কিন্ত পুলিশের নজর এড়িয়ে বাপের বাড়িতে আশ্রয় চাইতে, তারা অস্বীকার করে তাঁকে। রোগব্যাধিতে জর্জরিত বৃদ্ধাকে কাটাতে হয়েছিল একেবারে নিঃসঙ্গ অবস্থায়। সরকারি পেনশন যখন পৌঁছেছিল, তখন দেরি হয়ে গিয়েছে অনেকটাই।

    ভারতমাতার সংজ্ঞা অনেকের কাছে ভিন্ন। আর বিপ্লবী বলতেই একটি আগ্নেয়াস্ত্র হাতে পুরুষের ছবি ভেসে ওঠে মানসপটে। কিন্ত, বিংশ শতকের গোড়ায় অত্যাচারী রাষ্ট্রের বিপরীতে বুক পেতে দাঁড়িয়ে ছিল এক ‘অর্ধশিক্ষিত’-‘অজপাড়াগেঁয়ে’ বিধবা। তবুও হয়তো পুরুষ-রচিত ইতিহাসের পাতায় শত শত বাঙালি নারীদের মতোই তাঁর জায়গা হবে ফুটনোটে। 

    তথ্যঋণ-
    ১. স্বাধীনতা সংগ্রামে বাংলার নারী -  কমলা দাশগুপ্ত ( অগ্নিযুগ গ্রন্থমালা)
    ২. সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান

    চিত্রঋণ- 
    স্বাধীনতা সংগ্রামে বাঙালি নারী -  কমলা দাশগুপ্ত ( অগ্নিযুগ গ্রন্থমালা)

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @