শীতের আবহে খুল যা ‘ধনে-শিম’

আমাদের ঠাকুমা-দিদিমাদের হেঁসেলে কত মণি-মুক্তো-মোহরেরা লুকিয়ে থাকত ঘাপটি মেরে। সামান্য বড়া কিংবা ডালের সঙ্গে খাওয়ার জন্য ভাজা-- সেও কতভাবে, কত উপকরণেই না বানাতেন তাঁরা। সঙ্গে বাড়ির চারপাশে, হয়তো বা উঠোনেই ফলে থাকা শাক, আনাজের তরকারি। বাংলার হেঁসেলের ইতিহাস যদি কোনোদিন লেখা হয়, তাহলে এই সব নিরামিষ পদকে বাদ রাখা সম্ভবই নয়। আর, যে কোনো জাতির আত্মপরিচয়ের শিকড়টাও আসলে লুকিয়ে থাকে তার খাদ্যাভ্যাসে। লুকিয়ে থাকে তার প্রিয় পদগুলির উপকরণের ভিতর। তার ভৌগোলিক পরিবেশ, পছন্দ সব গাঁথা এই সব স্বাদের মধ্যেই। এখন বিশ্বায়নের ময়দানে আমরা বাড়িতেও পাস্তা বানাই, আইরিশ কফির ফর্মুলা জানি, হ্যাং আউট করি মেক্সিকান স্যালাডের সামনে। এইসব মন্দ না, এগুলো বাদ রাখাও সম্ভব না। তবু, ছোটোবেলার ঠাকুমার ঝুলির মতোই রূপকথার গন্ধ মাখানো সেইসব আটপৌরে রেসিপিগুলোকেও যে ভুলে যেতে নেই। শুধু ইতিহাসের কথা ভেবে না, ভুলে গেলে আমাদেরই ক্ষতি। স্বাদের ক্ষতি।
তেমনই একটি পদের খোঁজ দিচ্ছি আজ। ধনিয়া শিম। ধনে পাতা আর শিম—দুই সবজে সব্জির সঙ্গত। শুনে মনে হতে পারে-- ধুস এ আর এমন কী! কিন্তু, ভারী ভুল করবেন এমন ভাবলে। সামান্য উপকরণ, যৎসামান্য খরচেও যে স্বাদের জাদুবাস্তব তৈরি করে ফেলা যায়—এই পদ না চাখলে বুঝবেন না। শিম নয়, এই পদের প্রধান উপকরণ কিন্তু ধনেপাতা। সঙ্গে টাটকা শিমের অসামান্য যুগলবন্দি। বড়ো নরম সবুজ একটা পদ।
আরও পড়ুন: শীতের আড্ডায় জমজমাট মাছের চপ
শীত আসছে। নরম রোদ আর টাটকা সবুজ সব্জির মিশেলে গরম গরম ভাতের সঙ্গে এই পদ মেখে খেলেই অলীক এক সেপিয়া রঙের স্বগ্গের খোঁজ মিলবেই। আমাদের, বাঙালিদের, দিদিমা-ঠাকুমাদের হাতের ম্যাজিকে যে স্বগ্গের আনাচ-কানাচ ভরে আছে। সঙ্গে স্বাস্থ্যকর খাবারের কথাটা আর নাই বা জুড়লাম। যাহোক, আর কথা না বাড়িয়ে নজর দেওয়া যাক পদের প্রস্তুতিতে। উপকরণ:-
শিম- ৫০০ গ্রাম
ধনেপাতা- ৭৫ গ্রাম
রসুন- ৩ কোয়া
কাঁচা লঙ্কা- ৫টা
পাঁচফোরন- ফোরনের জন্য সামান্য
হলুদ গুঁড়ো- হাফ চা-চামচ
গরম মশলা গুঁড়ো- সামান্য
চিনি ও নুন- প্রয়োজন মতোপ্রণালি:
প্রথমে সিমগুলোকে ভালো করে ধুয়ে ছোটো ছোটো টুকরোয় কেটে নিয়ে একটি পাত্রে রাখুন। এরপর, ধনেপাতা কুচিয়ে নিয়ে তাতে রসুন, তিনটি কাঁচা লঙ্কা ও নুন-চিনি মিশিয়ে একসঙ্গে বেটে নিন। মিশ্রণটি তৈরি হয়ে গেলে কড়াইয়ে তেল দিয়ে পাঁচফোরন, সামান্য চিনি (রঙের জন্য) আর হলুদ দিয়ে তাতে শিমগুলো ঢেলে দিয়ে ভাজতে হবে। শিমগুলো মিনিট দুই সাঁতলে নিয়ে তাতে ধনেপাতা-বাটার মিশ্রণটি দিয়ে ভালো করে নেড়ে ঢাকা-চাপা দিয়ে একদম অল্প আঁচে পাঁচ মিনিট রেখে দিন (মাঝে একবার ঢাকা তুলে নেড়ে নেবেন)। শিমের থেকে জল বেরয়, ফলে ওই জল ও বাটার মিশ্রণেই শিম সিদ্ধ হয়ে যায়। প্রয়োজন মনে করলে সামান্য জল দিতে পারেন। বেশি জল দেবেন না কারণ, এই পদটি মাখামাখা হয়। পাঁচ মিনিট পর ঢাকনা তুলে দেখে নিতে হবে শিম সিদ্ধ হয়েছে কিনা, শিম সিদ্ধ হয়ে এলে দুটো কাঁচা লঙ্কা চিড়ে আর সামান্য গরম মশলা দিয়ে গ্যাস বন্ধ করে দিলেই তৈরি ধনিয়া শিম। এবার, গরম ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করুন।