অন্ধত্ব প্রতিরোধে ‘চোখের আলো’

চোখের আলো - মেমারি, পূর্ব বর্ধমান
শুধুমাত্র অন্তরের আলো নয়, চোখের আলোয় পৃথিবীকে দেখা সকলের অধিকার। কিন্তু চোখের বিভিন্ন অসুখ, ছোটো বড়ো সকল বয়সের অনেক মানুষের কাছ থেকে কেড়ে নেয় সেই অধিকার। আর আর্থিক প্রতিকুলতার ফলে অনেকেই চোখের সঠিক চিকিৎসা করাতে পারেন না, ফলে জীবনে নেমে আসে ক্ষীণ দৃষ্টিশক্তি এমনকি অন্ধত্ব। রাজ্যের মানুষকে এই অভিশাপ থেকে মুক্তি দিতে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের উদ্যোগে ২০২১ সালের জানুয়ারি মাস থেকে শুরু হয়েছে চোখের আলো প্রকল্প। যার মূল উদ্দেশ্য ২০২৫ সালের মধ্যে নবীন থেকে প্রবীণ সকলের চোখের চিকিৎসা করে অন্ধত্ব প্রতিরোধ করা।
২০২১ সালের ৪ জানুয়ারি এই প্রকল্পটির কথা ঘোষণা করেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং প্রকল্পটি কার্যকরী হয় তার ঠিক পরের দিন অর্থাৎ ৫ জানুয়ারি থেকে।
চোখের আলো - ডায়মন্ডহারবার
‘চোখের আলো’ প্রকল্পে বিনামূল্যে রাজ্যজুড়ে প্রায় ২০ লক্ষ বয়স্ক মানুষের ছানি অপারেশন, প্রায় ৮ লক্ষ ২৫ হাজার বিনামূল্যে চশমার ব্যবস্থা, সমস্ত সরকারি স্কুলের পড়ুয়াদের বিনামূল্যে চোখ পরীক্ষা ও প্রয়োজনে ৪ লক্ষ চশমার ব্যবস্থা এবং অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রের শিশুদেরও চোখ পরীক্ষার কর্মসূচি নেওয়া হয়। পাঁচ বছরের লক্ষ্যে গৃহীত এই প্রকল্পের প্রায় অর্ধেক সময় আড়াই বছর কেটে যাওয়ার পর কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে ‘চোখের আলো’? এই প্রসঙ্গে বঙ্গদর্শন.কম-এর পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয়েছিলো স্বাস্থ্যভবনের এক আধিকারিকের (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) সঙ্গে। তিনি জানান, জাতীয় স্তরে ‘National Programme for Control Blindness and Visual Impairment’ প্রকল্পটি থাকলেও বিভিন্ন কারণে প্রত্যন্ত অঞ্চলে তার সুফল সবসময় পৌঁছনো সম্ভব হয়নি, বিশেষত ২০২০ সালে কোভিডকালে লকডাউনের সময় চোখের চিকিৎসা পরিষেবা বেশ ব্যাহত হয়। ফলতঃ এই সময়ে চোখের অসুখের হার বৃদ্ধি পেয়েছে বহুলাংশে। সেই কারণে রাজ্যের সাধারণ মানুষের চোখের অসুখের চিকিৎসার জন্য রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে এই প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছে। তিনি আরও জানান, সরকারের এই প্রকল্পে সকল বয়সের মানুষেরই চোখের চিকিৎসা হবে, তবে যেহেতু চিকিৎসা পরিষেবার জন্য লোকবল বা অন্যান্য সামগ্রী সীমিত, তাই অসুখের গুরুত্বের ওপর চিকিৎসা অগ্রাধিকার পায়। প্রসঙ্গতঃ তিনি আরও জানান চিকিৎসাক্ষেত্রে দেখা গেছে বয়স্ক মানুষদের ছানি জনিত সমস্যার হার বেশি। আর ছানি অন্ধত্বের কারণ। তাই প্রাথমিকভাবে তাঁদের ছানি অপারেশন ও চশমা বিতরণের কাজ করা হচ্ছে। তবে স্কুলপড়ুয়া ও অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রের ছাত্রছাত্রীদের চক্ষু পরীক্ষাও চলছে।
কীভাবে সাধারণ মানুষ সুবিধা পাবে এই প্রকল্পের। এই বিষয়ে স্বাস্থ্যভবনের পক্ষ থেকে জানানো হয় সরকারি হাসপাতাল এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গেলেই বিনামূল্যে চক্ষু পরীক্ষা, প্রয়োজনে চশমা প্রদান ও অপারেশনের ব্যবস্থা করা হয়। এই প্রকল্পের জন্য রাজ্য বাজেটে বরাদ্দ অর্থের সাহায্যে গ্রামাঞ্চলে বিভিন্ন হাসপাতাল এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আধুনিক যন্ত্রপাতির সাহায্যে চিকিৎসা করা সম্ভব হচ্ছে। শুধু তাই নয় বিভিন্ন জেলায় জেলায় শহর এবং গ্রামাঞ্চল উভয় স্থানেই বিভিন্ন সময় ক্যাম্প করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। এইভাবে সব শ্রেণির মানুষের কাছে চিকিৎসা পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে, ফলে অনেক বেশি মানুষ তাদের সুবিধামতো সময়ে নিকটবর্তী ক্যাম্পে এসে চোখের চিকিৎসা করাতে পারেন। তাছাড়াও বিভিন্ন সরকারি স্কুলে, অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রে গিয়ে পড়ুয়াদের চক্ষু পরীক্ষা করা হয়। তবে অসুখের গুরুত্বের নিরিখে বয়স্কদের ছানি অপারেশনের ক্ষেত্রে একটু বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে।
‘চোখের আলো’ প্রকল্পে বিনামূল্যে রাজ্যজুড়ে প্রায় ২০ লক্ষ বয়স্ক মানুষের ছানি অপারেশন, প্রায় ৮ লক্ষ ২৫ হাজার বিনামূল্যে চশমার ব্যবস্থা, সমস্ত সরকারি স্কুলের পড়ুয়াদের বিনামূল্যে চোখ পরীক্ষা ও প্রয়োজনে ৪ লক্ষ চশমার ব্যবস্থা এবং অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রের শিশুদেরও চোখ পরীক্ষার কর্মসূচি নেওয়া হয়।
চোখের আলো প্রকল্পের শুরুর দিন
শুধু চিকিৎসা নয়, মরণোত্তর চক্ষুদানের ব্যাপারেও সচেতনতা বৃদ্ধির চেষ্টা করা হচ্ছে সরকারের পক্ষ থেকে। যাতে ২০২৫ সালের মধ্যে অন্ধত্ব নিবারণ করা সম্ভব হয়। তাই প্রকল্পের পরিষেবা পাওয়ার জন্য আলাদা করে নাম নথিভুক্ত করার প্রয়োজন নেই। আসলে প্রকৃতির রূপ দু-চোখ ভরে দেখা সকলের অধিকার। সেই অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে রাজ্য সরকারের এই উদ্যোগ আলো দেখাচ্ছে, এমনটাই মনে করছেন প্রকল্পের আওতাভুক্ত কিছু মানুষ।