বর্ধমান লিটল ম্যাগাজিন মেলা- বারো মাসের তেরোতম পার্বণ

কবি শঙ্খ ঘোষ একসময় লিখেছিলেন, “আয় আরও হাতে হাত রেখে, আয় আরও বেঁধে বেঁধে থাকি”। সেই বেঁধে বেঁধে থাকার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল পশ্চিমবঙ্গের জেলাগুলি। তার সাহিত্য-সংস্কৃতি সবকিছুই হাতে হাত রাখার কিংবা বুকে জড়িয়ে ধরার অঙ্গীকার করেছে। বাংলা সাহিত্যকে বাঁচিয়ে রেখেছে লিটল ম্যাগাজিন। এই পত্রিকাগুলিই বাংলা সাহিত্যের সম্পদ। বই-ধুলো আর মেলা-ধুলো যেখানে একাকার হয়ে যায়, সেই আলো দেখার নাম লিটল ম্যাগাজিন। যখন জেলায় জেলায় পত্র-পত্রিকাগুলির প্রচার এবং প্রসার ঘটাতে উদ্যোগ নেন ছোটো-বড়ো সংগঠনগুলি, তখন গর্ব হয় বৈকি! অবাকও লাগে। নিজেদের টাকা জমিয়ে শয়ে শয়ে পত্রিকাকে একত্রিত করা থেকে কর্মীদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা- সবটাই সম্ভব বাংলা ভাষার প্রতি ভালোবাসা বা টানের জন্য। বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ। তাদের মধ্যে অবশ্যই থাকবে শীতকালীন লিটল ম্যাগাজিন মেলা এবং তারপরেই বইমেলা। বাংলার বিভিন্ন প্রান্তসহ বাংলাদেশ, আসাম, ত্রিপুরা—সমস্ত অঞ্চল থেকে সম্পাদকেরা আসেন এই লিটল ম্যাগাজিন মেলাগুলোয়। সম্পাদকের বয়সের মাপকাঠি নেই। তরুণ থেকে প্রবীণ- মঞ্চ একটাই- সেখানেই বারবার ছুটে আসা। লিটল ম্যাগাজিনের শ্রেষ্ঠ উৎসব।
বর্ধমান পৌরসভার সহযোগিতায় এবং বর্ধমান সংস্কৃতি চর্চা কেন্দ্রের উদ্যোগে টাউন হল ময়দানে শেষ হল বর্ধমান লিটল ম্যাগাজিন মেলা ২০১৮। এবার মেলার তৃতীয় বর্ষ। ২৩ নভেম্বর শুক্রবার মেলার উদ্বোধন করেন সাহিত্যিক জয়া মিত্র। উপস্থিত ছিলেন রাজকুমার রায়চৌধুরী, শ্যামলবরণ সাহা, মহকুমাশাসক অনির্বাণ কোলে। এই মেলার অন্যতম সম্পাদক সুকান্ত দে আমাদের জানান, “মেলার আয়োজন করতে এবছর আমাদের খরচ হয়েছে প্রায় তিন লক্ষ টাকা। বাইরে থেকে কিছু সাহায্য পেয়েছি। তবে একটু অন্যরকমভাবে আমরা মেলাটাকে সাজানোর চেষ্টা করেছি। মেলায় অংশগ্রহণ করেছে ১২৫টি পত্র-পত্রিকা। তার মধ্যে বরাক উপত্যকা থেকে এসেছে নয়টি পত্রিকা এবং বাংলাদেশ থেকে এসেছে ত্রিশটি পত্রিকা। মূল মঞ্চের নাম মণীন্দ্র গুপ্ত মঞ্চ। এই মেলাটাকে ঘিরে আমাদের অনেক স্বপ্ন রয়েছে। প্রত্যেকের সহযোগিতায় ধীরে ধীরে আমরা সেই স্বপ্নগুলো পূরণ করার চেষ্টা করব।”
সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের জন্ম শতবর্ষ উপলক্ষে আয়োজন করা হয়েছিল দুষ্প্রাপ্য পত্র-পত্রিকা প্রদর্শনী। মেলার মূল গেটের নাম দেওয়া হয় সুফিয়া কামাল এবং সাবিত্রী রায় স্মারক তোরণ। আয়োজন করা হয়েছিল লাইভ চিত্র প্রদর্শনী। শিল্পীরা মেলার মাঠেই ছবি আঁকছিলেন, তারপর সেই ছবিগুলি মেলা প্রাঙ্গনেই প্রদর্শিত হয়। মূল মঞ্চে নানারকম বিষয়ভিত্তিক আলোচনা/ বিতর্ক সভা এবং কবিতা পাঠের আয়োজন করা হয়। বর্ধমান লিটল ম্যাগাজিন মেলা ২০১৮-তে অংশগ্রহণকারী পত্রিকাগুলির মধ্যে ছিল নাটমন্দির, বোধশব্দ, কৌলাল, আঙ্গিক, তবুও প্রয়াস, ইতিকথা, গল্পদেশ, অনর্গল, বর্ণমালা, তমসা, আলোপৃথিবী, ভাষালিপি, একক মাত্রা, বাঘের বাচ্চা, এবং মুশায়েরা, ঐহিক, ধ্যানবিন্দু প্রভৃতি।
বর্ধমানের টাউন হল প্রাঙ্গণ আকারে বেশ বড়। যার জন্য একসঙ্গে প্রচুর পত্র-পত্রিকা অংশগ্রহণ করতে পারে। তাদের টেবিলের মাপও থাকে যথাযথ। পাঠকদের সাড়া অভূতপূর্ব, বিক্রির হারও বেশ ভালো। লিটল ম্যাগাজিন আসলে একটি যাপনের নাম, একটি অভ্যাসের নাম। সেই যাপন বা অভ্যাসকেই আরও মানুষের মনে ছড়িয়ে দিতে এই জেলাভিত্তিক লিটল ম্যাগাজিন মেলার প্রয়োজনীয়তা আছে। বর্ধমানও তার ব্যতিক্রম নয়।