রেল পুতুল

লাল মাটির দেশ বাঁকুড়ায় চালু হল রেল। আর পুতুল শিল্পী তাঁর স্বপ্ন বুনলেন। জো পুতুল, ষষ্ঠী পুতুল, থানের ঘোড়া, মনসার চালি ইত্যাদির তালিকায় নতুন নাম- ‘রেল পুতুল’। চেহারায় চরিত্রে হাতে টেপা মাটির পুতুলের মতই কিন্তু এর গঠন তাৎপর্যটি একটু ভিন্ন রকমের। আসলে পুতুল শিল্পীর চোখে পড়েছে নয়া দুনিয়ার নতুন চালচিত্র। সেই চালচিত্রকে পুতুলে ধরে না রাখলে কী হয়! পুতুলের চেহারা বর্ণনাটি এই রকম- পর পর মহিলারা দাঁড়িয়ে আছেন দু’টি হাত পরস্পরের কাঁধে রেখে। দেখলে মনে হয় যেন একটি রেলগাড়ি চলেছে। শুধুমাত্র রেলের বগিগুলি হল- মানুষের চেহারার।
মিটারগেজ লাইনের উপর দিয়ে সে-দিন ছুটে চলেছে কয়লার ইঞ্জিনে টানা বাঁকুড়া-দামোদর রেল কোম্পানির রেলগাড়ি। নাওবান্দা, বেলিয়াতোড়, পাত্রসায়র, ইন্দাস, গোপীনাথপুর, শ্যামসুন্দরপুর হয়ে রেল চলেছে রাই নগর পর্যন্ত ঐ দামোদরের কূলে। ঠিক এই কারণেই গ্রাম্য জীবন যাপনে একটু অদল বদল ঘটে গেল। গ্রামের যে মেয়েরা আলতা পরাতেন কিংবা মেয়ে-বউদের হাত-পায়ের নখ কেটে রূপটান দিয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে রূপচর্চা করাতেন, সেটি আবদ্ধ ছিল কেবলমাত্র নিজের পাড়া গাঁয়ের মধ্যেই। এবার রেল চলাচলে গ্রামের মেয়ে-বউরা চিনতে শিখলো আরও নতুন নতুন গ্রাম। ফলে নিজের গণ্ডি ছাড়িয়ে বাইরের জগতে কাজ করার পরিধি বাড়ল তাদের। দেখা গেল দল বেঁধে কেউ চলেছেন অন্য গ্রামে আলতা পরানে নাপতানি-র কাজ করতে, কেউবা চলেছে অন্য গ্রামের আল জমিতে ধান বুনতে আবার কোনও কোনও দল চলেছে নয়া ঠিকানা রাণীগঞ্জের কয়লা খাদে কাজ করতে। গ্রামের মেয়েরা সেদিন শুধু রেলগাড়িকে সম্বল করে বাইরের দুনিয়ায় পা ফেললেন স্বাবলম্বি হতে। নাচের ছন্দে পরস্পরের কাঁধে হাত দিয়ে লাইন করে ঠিক রেলগাড়ির মতই তুলবুলে ছন্দে পা-ফেলে রেলে উঠতেন তারা। পুরোনো আমলের সাহিত্যে পাওয়া যায় মেয়েদের দল দুরু দুরু বুকে পরস্পরের কাঁধ ধরে রেলগাড়িতে দাঁড়াতো, যাতে তারা ঝাঁকুনিতে পড়ে না যায়। সেদিনের গ্রামীণ মেয়েদের চোখে বাঁকুড়া-দামোদর রেলওয়ে মানে হল জীবনের নতুন আলো।
পুতুল শিল্পীর হাতে এই ইতিহাসটি রচিত হল রেল পুতুলের গড়নে গঠনে। এ পুতুল থানেও দেওয়া হয় না পুজোও করা হয় না। আবার এ পুতুল কোন মানতের কথাও বলে না। এই পুতুল সর্বাগ্রে নাগরিক চেতনার পুতুল হয়ে রইল পুতুল শিল্পীর হাতে।
বাঁকুড়া জেলায় যাঁরা পোড়ামাটির থানের পুতুল করেন তাঁরাই মাঝে মধ্যে এই ধরনের রেল পুতুল করে থাকেন। তার পর ধীরে ধীরে গ্রাম বাংলার বহু জায়গাতেই পুতুল শিল্পীরা খেলার পুতুল হিসাবে আজ রেলপুতুল বানিয়ে থাকেন। বিষ্ণুপুরের মনসার চাল বা ছলনের পুতুল যাঁরা তৈরি করেন তাঁদের হাতেই এমন পুতুলের নির্মাণ দেখা যায় কালে ভদ্রে।
তথ্যের খাতিরে জানাই বিষ্ণুপুর অঞ্চলের পুতুল শিল্পীরা কথায় কথায় জানালেন যে এমন রেল পুতুলের কারিগর কিন্তু মেয়েরাই।