কোজাগরী পূর্ণিমার রাতে অযোধ্যার কোলে মেতে উঠলেন একদল কবিতা-পাগল

কবিতা কী দেয় আমাদের? তাকে নিয়ে কি আমরা মানে সাধারণ আমজনতারা খুব সহজেই পৌঁছে যেতে পারি কোনো চান্দ্রঘন রহস্যের মলাটে? চাঁদ ক্ষয়, ক্ষয়ে আসে সামান্য আর অসামান্যের কবিজীবন, তার হা-হুতাশ। ধরো চাঁদ, তোমার পাশের বাড়ির কেউ। ধরো পাহাড়, তোমার স্বপ্নে দেখা দোসর। ধরো, লাল মাটির রাস্তা তোমার বৃহত্তম রাস্তা দেখার শেষ কুর্ণিশ। একটা কবিতা নিয়ে কাটিয়ে দেওয়া যায় আজীবন। কিছু কবিতা চর্চা পাশাপাশি দাঁড় করিয়ে দেয় দশক-বন্ধুদের। কারোর কাঁধে কাঁধ, কারোর হাতে হাত, কারোর দৃষ্টি যাচ্ছে প্রিয় বন্ধুর কবিতাপাঠে, কারোর পা টলমল।
দুইদিন একরাত টানা হইহই আর কাব্যিক রহস্যে পরিপূর্ণ ‘বাঁকুড়া কবিতা উৎসব ২০১৯’। চার বছরে পৌঁছে যাওয়া এই কবিতা উৎসবের সবচেয়ে প্রধান আকর্ষণ ছিল লক্ষ্মীপুজোর রাতে কোজাগরী পূর্ণিমার আলোয় খোলা আকাশের নিচে কবিতা পাঠ এবং কবিতা নিয়ে আলোচনা। কবিতা পাঠ-আলোচনা শেষ করে নৈশ আহারের পর ছিল সারারাত ব্যাপী ছৌ নৃত্য প্রদর্শন। অংশগ্রহণ করেছিলেন বিখ্যাত শরবেড়িয়া মিলন সংঘ ছৌ নৃত্য পার্টি। এবছর বাঁকুড়া কবিতা উৎসব উদ্বোধন করেন প্রখ্যাত ছৌ শিল্পী কার্তিক সিং মুড়া। কবিদের মধ্যে আমন্ত্রিত ছিলেন মৃদুল দাশগুপ্ত, গৌতম চৌধুরী, একরাম আলি, চৈতালি চট্টোপাধ্যায়, বিপ্লব চৌধুরী, হিমালয় জানা, সঙ্ঘমিত্রা হালদার, দীপান্বিতা সরকার, অনিমিখ পাত্র, পায়েল সরকার, দেবর্ষি সরকার, শ্রীদর্শিনী চক্রবর্তী, শাশ্বতী সান্যাল, দীপ্তিপ্রকাশ দে, আকাশ গঙ্গোপাধ্যায়, সুমন সাধু, সেলিম মণ্ডল-সহ আরও অনেকে।
এই কবিতা উৎসবের অন্যতম কর্মকর্তা কবি অভিমন্যু মাহাত বলেন, “‘কোবতে উৎছব’ শব্দ দুটি বাংলা অভিধানে আছে? না, নেই। ফেসবুক অভিধানে আছে। আমাদের কবিতা উৎসবকে এই অভিধায় কটাক্ষ করা হয়েছে। যে কোনও গঠনমূলক সমালোচনা সাদরে গৃহীত। এই কটাক্ষও আমাদের আরও প্রাণ, প্রাণ দিয়েছে! বিতর্ক উঠেছিল, বাঁকুড়া কবিতা উৎসব পুরুলিয়ায় কেন? বলে রাখা প্রয়োজন, এই উৎসব বেনারসে, ডুয়ার্সে বা দেশের যে কোনও প্রান্তে হতে পারে। আমরা প্রকৃতি বিলাসী, প্রকৃতির মাঝে এই উৎসবকে রাখতে চাই।
গতবছর কবি হলধর নাগ উৎসব উদ্বোধন করেছিলেন। এবার পদ্মশ্রী ছৌ শিল্পী গম্ভীর সিংমুড়ার পুত্র কার্তিক সিংমুড়া উদ্বোধক। যে নৃত্য সারা বিশ্বে বন্দিত, সেই নৃত্য শিল্পীদের কতটুকু সম্মান দিই? এখনো ছৌ নৃত্য ‘লোকনৃত্য’। এখনো বাংলার নৃত্য হয়ে ওঠার ‘যোগ্যতা’ অর্জন করতে পারেনি! আমার বহু দিনের স্বপ্ন, কোজাগরী চাঁদনি রাতে অযোধ্যা পাহাড়ে কবিতা পাঠের আসর। সেই স্বপ্ন পূরণ হতে চলেছে। প্রকৃতি যদি সদয় থাকেন। চাঁদের আলোয় কবিতা পড়বেন কবিরা। কবিতার পাগলামিতে একটা গোটা চাঁদনি রাত!”
সারারাত জুড়ে একদল কবিতা পাগল মানুষ কবিতা আর ছৌ নিয়ে হইহই করে মেতে উঠলেন। এই মেতে ওঠার যাপনের নামও তো কবিতা।