কলকাতার বুকে বাংলাদেশের বই-তরণী

“দুয়ারে খিল টান দিয়ে তাই খুলে দিলাম জানলা
ওপারে যে বাংলাদেশ এপারেও সেই বাংলা”
সুভাষ মুখোপাধ্যায় এই কথাগুলিই লিখেছিলেন একসময়। সময় গড়িয়েছে। কিন্তু কথাগুলো মিথ্যে হয়ে যায়নি। ঘড়ির কাঁটার থেকেও দ্রুত গতিতে আমরা এগিয়ে চলেছি। কিন্তু ভিতটা তো সেই এক। দুই বাংলা। দুই বাংলার মানুষ। দুই বাংলার সংস্কৃতি। দুই বাংলার সাহিত্য। বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গকে এক সূত্রে বেঁধে রেখেছে বাংলা সাহিত্য। সেই ভাষায় ভাটা পড়েনি কোনওদিন। রক্তের বীজ খুঁজে পাওয়া যাবে এই দুই জায়গায়। ভৌগোলিক দূরত্ব কি কখনও নাড়ির টানকে অস্বীকার করতে পারে?
অষ্টম বছরে পা দিল বাংলাদেশ বইমেলা। স্থান প্রতিবছরের মতো এবারেও মোহরকুঞ্জ, কলকাতা। আয়োজনে কলকাতার বাংলাদেশ উপ-হাইকমিশন, বাংলাদেশ রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো এবং বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতি। ২ নভেম্বর শুক্রবার বিকেলে আনুষ্ঠানিকভাবে মেলার উদ্বোধন করেন বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী জনাব আবুল মাল আব্দুল মুহিত। বিশেষ অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন কলকাতা পৌরসভার মেয়র দেবাশিস কুমার, ঢাকা বাংলা আকাদেমির পরিচালক শামসুজ্জামান খান, বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির সভাপতি ফরিদ আহমেদ, বাংলাদেশের লেখক রতন সিদ্দিকি, কলকাতার প্রকাশক ও লেখক ত্রিদিব চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ। এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ডেপুটি হাইকমিশনার তৌফিক হাসান।
আসলে বাংলা কেবলমাত্র বাংলাদেশের মানুষের ভাষাই নয়, পশ্চিমবঙ্গের মানুষের ভাষাও বাংলা। তাই বাংলাদেশের লেখকদের বইয়ের প্রতি পশ্চিমবঙ্গের মানুষের আগ্রহ থাকা স্বাভাবিক। কলকাতায় অনুষ্ঠিত এই বাংলাদেশ বইমেলা সেই আগ্রহ পূরণের কাজটি করে থাকে। বাংলাদেশের বাতিঘর প্রকাশনীর পক্ষ থেকে সঞ্জীব দে আমাদের জানান, “মাত্র কটা দিনেই দারুণ প্রতিক্রিয়া পাচ্ছি। বিক্রির হারও চমৎকার। এমনিতে সারাবছর বাংলাদেশ আর পশ্চিমবঙ্গে বইয়ের আসা যাওয়া চলতেই থাকে। কিন্তু এই ধরনের বইমেলা মানুষ তথা দুই দেশকে আরও একত্রিত করে। আমরাও বছরে একবার করে এপার বাংলায় আসতে পারি। ইলেকট্রনিক মিডিয়া প্রসার পাওয়ায় মুদ্রণ আকারে প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা কমে যাচ্ছে ঠিকই। এই ধরনের বইমেলার মাধ্যমে মুদ্রণ আকারে প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা তাই বাড়তে থাকবে। যা আমাদের নৈতিক মূল্যবোধ তৈরির জন্য খুব জরুরি।”
আরও পড়ুন
রঙ-তুলির প্রেমে ইংরেজদের কলকাতা
বই বাঙালির কাছের বিষয়। তা বাংলাদেশের বাঙালি হোক বা পশ্চিমবঙ্গের। বইয়ের প্রতি সকলেরই প্রবল আগ্রহ থাকে। পশ্চিমবঙ্গের কবি-প্রাবন্ধিক সোমব্রত সরকার জানালেন, “আমাদের কলকাতায় বাংলাদেশের বই বিক্রির হার সবসময়ই ভালো থাকে। তবে এখানে যেমন আলাদাভাবে বাংলাদেশ বইমেলা বা কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলায় বড় আকারে বাংলাদেশ প্যাভিলিয়ান করা হয়, ওদেশে সেই সুবিধাটা নেই ঠিকই। একুশে বইমেলায় শুধুমাত্র বাংলাদেশের বই-ই পাওয়া যায়। আলাদাভাবে পশ্চিমবঙ্গের কোনো স্টল হয় না। কিন্তু গিল্ডের পক্ষ থেকে ভাবা হচ্ছে ওদেশেও যেন একটি বড় আকারে শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গের বই বিক্রেতাদের নিয়ে মেলা হয়। আশাকরি কয়েকবছরের মধ্যে তা সম্পূর্ণ হবে এবং আমরা, মানে পশ্চিমবঙ্গের লেখকরা বাংলাদেশের সেই মেলায় হইহই করে অংশগ্রহণ করতে পারব।”
মেলা চলবে প্রতিদিন দুপুর ২টো থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত। শনিবার ও রবিবার মেলা খোলা থাকবে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত। মেলার পাশাপাশি প্রতিদিন সন্ধ্যায় থাকছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও আলোচনা। এতে অংশগ্রহণ করবেন বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের শিল্পীরা। মেলায় অংশগ্রহণ করেছে বাংলাদেশের ৭০টি প্রকাশনা সংস্থা।