বাগানবাড়ির ছুটি আর ঊনচল্লিশ নম্বর রাস্তা

‘রাস্তার পাঁচালি’। এ রাস্তা ও রাস্তার কত নাম আর তাই ঘিরে কল্পনার জাল বুনে চলা। কোথাও রাস্তা যোগ, বিয়োগ, গুণচিহ্ন আবার কোথাও রাস্তা তিন, চার আর পাঁচ মাথার নেতাজী ঘোড়ার আজীবন ছুটে চলা। কিন্তু কলকাতার বাজারে নাম সূত্রের পিছনে ছুটে চলে কোনও লাভ হয় না কোনও দিন। এক কলকাতার নাম নিয়েই বিস্তর জলঘোলা। সেই খোঁজে মহাফেজখানাদের মুখেও বাক্যি নাই। তাই ইতি নমস্কারান্তে...। এসবের বাইরেও লুকিয়ে আছে নানা কথা যা সেদিনের সমাজকে উদ্বেলিত করেছিল। লোকে সেদিন নানা খবর দিয়েই মনে রেখেছিল রাস্তার নাম সহ নম্বর আর তার কোনও বিশেষ স্বতন্ত্র চরিত্রকে। আর সেই মনে রাখাটা ছিল রোজের দিন বহনের সাথে আর অবচেতনে দিনের পর দিন ধরে। আজ তাই মন রাস্তার পাঁচালি গড়ে তোলা। ৩৯ নম্বর আপার চিৎপুর রোড। এরকমই এক রাস্তা। আর তাকে মনে রাখার মতো একটি কারণ হল ‘আর্য ভাণ্ডার’। সেই দশকের বাঙালির এক স্বপ্নের মতো দোকান পশারী। আলিবাবার গুহার দরজায় চিচিং ফাঁক বললেই যেমন কেল্লাফতে তেমনই এক দোকান এই ভাণ্ডার। তাই কলকাতার অন্যতম স্বপ্নের রাস্তার নম্বর হল ৩৯ নম্বর আপার চিৎপুর রোড। আর সাথে স্বপ্ন ঘেরা দোকান ‘আর্য ভাণ্ডার’। কেন?
মনের কোণে তখন বাবু মননে লালিত হচ্ছে রমণী সৌন্দর্য ভোগ করার বিপুল বাসনা। পিপিংটমের কারবার ছেড়ে রমণী বিলাস ছবি কেনার ঠিকানা তখন ওই ৩৯ নম্বর আপার চিৎপুর রোড। যার তার নয়, ওখানে রবিবর্মার রমণী মেলে। ঘরের বউ চিত্র দর্শনে বাদ সাধলে বা বিতণ্ডা বাঁধালে তার জন্যেও আছে ওই দোকানের ‘রাম সীতা’ বা ‘রাধা কৃষ্ণ’-র যুগল মিলনচিত্র। তাছাড়া গৃহবধূও আজকাল থেকে থেকেই বায়নাক্কা করে সাহেবদের মতো ‘ক্লিন শেভড’ হতে বলে। তাই ফেনকা সাবান কিম্বা ‘হলোগ্রাউন্ড ক্ষুর’ সবই মেলে ওই ৩৯ নম্বরে। তাই স্বপ্ন কেনার রাস্তা বলা যায় ঊনচল্লিশ নম্বর আপার চিৎপুর রোডকে।

ওদিকে হাওড়া থেকে এলাহবাদ পর্যন্ত রেল খুলেছে। বাগান বাড়ি তৈরি হয়েছে এদিকে সেদিকে। বিঘা খানেক জমির মাঝে শান বাঁধানো সিঁড়ির বিরাট টলটলে পুকুর মানে ইংরেজি কেতার পুল। তাতে জল চিক চিক করে রোদের আলোয়। চোখ গিয়ে পরে মৃগেল, কাতলা বা রুইয়ের চকচকে শরীরে। রসনার রস আসে জিভে। আর সেই চিকচিকে জলে চোখ পেতে বিড়বিড় করে পদ্য আওড়ানো ‘মৎস্য মারিব সুখে, রমণী ধরিয়া বুকে’। তাই এসবের কথা ভেবে বাগান বাড়ির আউটহাউসে মজুত রাখতেই তো হবে বর্ধমান আর ধনেখালির হাতে কাটা বড়শি! সঙ্গে ইতালিয়ানও রাখতে হবে। নইলে ‘পাইকপাড়া’, ‘কালিপুর’ বা ‘মুক্তাগাছার’ ফুর্তি আসে না। এমন বিচিত্র আড়ালে ইয়ারবাজি করার ইচ্ছে জাগে মনে। তাই রাখতেই হয় তাস, পাশা ও দাবার বিচিত্র আয়োজন। তৈরি হয়ে যায় বাগানবাড়ির ছুটি নামচা।
কিন্তু সেই নামচার জোগানদারি করবে কে? ওই আপার চিৎপুর রোড। ওখানেই জ্বালাতে হবে আলাদীনের আশ্চর্য প্রদীপ। কী না মেলে সেখানে! রবিবর্মার রমণী থেকে শুরু করে তাস দাবা পাশার ইয়ারি আয়োজন। সঙ্গে বিশেষ জিনিস। সেই মহার্ঘ্য বস্তুটির নাম ‘জীন্তান’। নাম শোনা মাত্র অদ্ভুত এক অনুভূতি ঘুরপাক খায় মনে।এমন জীন্তান প্রথম সূর্যের দেশে তৈরি এক আশ্চর্য ভেষজ সম্পদ। জীন্তানের আশ্বাসে পূর্ণ যৌবন ফেরানোর নেশায় সেদিন মশগুল এই বাগানপাগল মানুষগুলি। রবিবর্মার ‘সৌন্দর্য সম্পন্ন মনোমুগ্ধকারী রমণী মূর্তি’- দেখিবার আনন্দ কই যদি পলাইয়াই গেল যৌবন? তাই ৩৯ নম্বরের ‘জীন্তান’ তখন অন্যতম আশ্রয়। মনের ও দেহের মনের মতো এক আশ্রয়। সবল ইন্দ্রিয় আর পূর্ণ যৌবন ফেরানোর কথা দিয়েছে সে। তাই সহজেই নিরুপমার মন ভেজাতে অনুপম যৌবন ধরে রাখার গুপ্ত মন্ত্রের রাস্তার নম্বর তখন ঊনচল্লিশ আপার চিৎপুর রোড।
চিত্র সৌজন্য পি. এম. বাকচি
(অলংকরণ – পার্থ দাশগুপ্ত)