বালিগেড়িয়ার শুষ্ক জমিতে ঘন শালবন, গ্রামবাসীদের পাশে রাজ্য বনবিভাগ

খড়গপুর (Kharagpur) বনবিভাগের অন্তর্গত কেশররেখা রেঞ্জ। বহু বছর আগে এখানকার নয়াগ্রাম ব্লক (Nayagram Block) অঞ্চলে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিল একটি শাল বনভূমি (Sal Forest)। তবে ওড়িশা সংলগ্ন এই বনাঞ্চলের একটা বড়ো অংশ কালের বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে একেবারে নষ্ট হয়ে যেতে বসেছিল। বিবর্ণ হলদে রঙে ছেয়ে গিয়েছিল একরের পর একর জমি। স্থানীয় গ্রামবাসীরা কখনোই বিশেষ একটা চেষ্টা করেননি এই বনভূমিকে সংরক্ষণ করার। কিন্তু ৩০ হেক্টর ধরে ছড়িয়ে থাকা শালবনের বেশিরভাগটাই যখন উজাড় হতে বসে, তখন আতঙ্কিত হয়ে যান সকলেই।
আজও গ্রামে-গঞ্জে গেলে লোকমুখে শুনতে পাওয়া যায়, “শালের গোড়া হল সম্পদ”। কেন? কারণ শালগাছের বিশেষত্বই হল মৃত ঘোষিত হওয়ার বহু বছর পরেও এর গোড়া থেকে আবারও নতুন করে গাছ বেরোতে পারে। আর তা মাথা চাড়া দিয়ে বেড়ে উঠতে পারে ঠিক নতুনের মতো করেই। এই কথা মাথায় রেখেই ২০১৮-১৯ সালে আরও একবার নতুন করে পশ্চিম মেদিনীপুরের (West Medinipur) অন্তর্গত বালিগেড়িয়ার (Baligeria) শাল বনভূমিকে পুনরুদ্ধারের চেষ্টা শুরু হয়। এ কাজে সবার প্রথম এগিয়ে আসে বনাঞ্চল সংলগ্ন এই বালিগেড়িয়া গ্রামের অধিবাসীরা। প্রথমেই তারা সাহায্য প্রার্থনা করে FCP কমিটি বনাঞ্চল আধিকারিকের শরণাপন্ন হয়।
বালিগেড়িয়া শালবন (আগে)
তাদের আর্জি শুনে সাগ্রহে সায় দেয় রাজ্য বনবিভাগ। বালিগেড়িয়ার অধিবাসীদের পাশে এসে দাঁড়ান খড়গপুর বনবিভাগের তৎকালীন বিভাগীয় বনাধিকারিক। RDF নামের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে শুরু হয় পুনরুদ্ধারের কাজ। RDF-এর অর্থ হল Regeneration of Degraded Sal Forest। মৃত শাল গাছকে পুনরায় জীবিত করে তোলাই এই পদ্ধতির মূল লক্ষ্য।
আজও গ্রামে-গঞ্জে গেলে লোকমুখে শুনতে পাওয়া যায়, “শালের গোড়া হল সম্পদ”। কেন? কারণ শালগাছের বিশেষত্বই হল মৃত ঘোষিত হওয়ার বহু বছর পরেও এর গোড়া থেকে আবারও নতুন করে গাছ বেরোতে পারে। আর তা মাথা চাড়া দিয়ে বেড়ে উঠতে পারে ঠিক নতুনের মতো করেই।
নির্ধারিত দিনে কেশররেখা রেঞ্জের কর্মীদের পাশাপাশি বনভূমিতে হাজির হন বালিগেড়িয়ার গ্রামবাসীরাও। অসংখ্য অবশিষ্টপ্রায় শালগাছের প্রাণহীন গোড়ায় পড়ল কুড়ুলের কোপ। এরপর ছিল একটা দীর্ঘ সময়ের অপেক্ষা, যার পরেই নির্ধারণ হবে গ্রামবাসীরা তাদের উদ্যোগে সফল হয়েছে কিনা। অবশেষে এল সেই সময়। মাস খানেক পেরোতে দেখা গেল, শাল গাছগুলোর গোড়া থেকে বেরিয়েছে নতুন ফোঁড়, যাকে ইংরেজি ভাষায় বলা হল কপিস (Coppice)। প্রকৃতির এই অপরূপ সৃষ্টি দেখে মুগ্ধ গ্রামবাসী থেকে শুরু করে বনকর্মী সকলেই।
বালিগেড়িয়া শালবন (এখন)
ঘটনাটি থেকে শুধু মুগ্ধতা নয়, শিক্ষাও লাভ করেছে বালিগেড়িয়ার মানুষ। শাল বনভূমিটির পুনরুত্থানের পর থেকেই তারা যেন প্রাণ দিয়ে আগলে রেখেছে সমগ্র বনাঞ্চলকে। রেঞ্জের স্টাফেরাও তাঁদের দায়িত্বে কোনোরকম খামতি রাখেননি। তাঁরা নিয়মিত টহল দেন এখানে। এভাবে দেখতে দেখতে পেরিয়ে গিয়েছে সাড়ে তিন বছর। সেদিনের সেই প্রায়-ধ্বংসাবশেষ আজ রীতিমতো ঘন জঙ্গলে পরিণত হয়েছে। বনসুরক্ষা কমিটি ও বনদপ্তরের একান্ত সাহায্য ছাড়া এমনটা হয়তো কখনোই সম্ভব ছিল না।
ঘটনাটি থেকে শুধু মুগ্ধতা নয়, শিক্ষাও লাভ করেছে বালিগেড়িয়ার মানুষ। শাল বনভূমিটির পুনরুত্থানের পর থেকেই তারা যেন প্রাণ দিয়ে আগলে রেখেছে সমগ্র বনাঞ্চলকে। রেঞ্জের স্টাফেরাও তাঁদের দায়িত্বে কোনোরকম খামতি রাখেননি। তাঁরা নিয়মিত টহল দেন এখানে।
বর্তমানে নয়াগ্রাম ব্লকের রাস্তার দু-ধারে তাকালে দেখতে পাওয়া যায় নিবিড় শাল বনভূমি। গত কয়েক বছরে নানান পশুপাখির পাশাপাশি এই বনাঞ্চলে দেখা মিলেছে দলমা হাতির। এছাড়াও শাল বনভূমি হয়ে উঠেছে অসংখ্য পরিচিত ও অপরিচিত পাখির আবাস। পাখি পর্যবেক্ষণ করার উদ্দেশ্যে বছরের নির্দিষ্ট সময় এখানে ভিড় জমায় পক্ষী বিশেষজ্ঞরা।
বালিগেড়িয়ার গ্রামবাসীরা অবশ্য এখানেই থামতে রাজি নন। তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এর চেয়েও ঘন বনভূমিতে পরিণত করবেন এই বনাঞ্চলকে। ম্যাজিক? রূপকথা? নাকি এক ফিনিক্স পাখির ছাই থেকে বেঁচে ওঠার গল্প? মিলিত প্রচেষ্টা কি মৃত শরীরে নতুন করে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে? মানুষের ভালবাসায়, যত্নে, দায়িত্বে এভাবেই বেঁচে থাক কেশররেখা।
____
তথ্য ও ছবি – বনবিভাগ, পশ্চিমবঙ্গ সরকার