বহরমপুর রেপার্টরী থিয়েটার- চলমান নাট্য তথ্যভাণ্ডার

রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে নাট্যপাঠ শেষ করে প্রদীপ ভট্টাচার্য পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলা সদর বহরমপুরে গড়ে তোলেন বহরমপুর রেপার্টরী থিয়েটার। ১৯৮৬-র ১লা জানুয়ারি থেকে আজ পর্যন্ত বহরমপুর রেপার্টরী থিয়েটার একটা চলমান নাট্য তথ্যভাণ্ডার। নানা বিষয়ে গবেষণা করে চলেছেন প্রদীপ এবং তার প্রয়োগ করে চলেছেন থিয়েটারে। শিশুমনে নাট্য চিন্তার বিকাশ, স্কুল লেভেল থিয়েটার, ওয়ার্কশপ, জেলার লোকসংস্কৃতি ভাণ্ডারের উন্মোচন এবং সংরক্ষণ এই সব নিয়েই তিনি কাজ করে চলেছেন অবিরত। সরকারি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের পরও তার নাট্য জীবনের অবশ্য কোন অবসর নেই।

বহরমপুর মুর্শিদাবাদ জেলার সুপ্রাচীন শহর আর প্রাচীন এই শহরের ঐতিহ্য। ওই জেলায় শোলার কাজ, কাঁসার বাসন, হাতির দাঁতের কাজ (প্রায় অবলুপ্ত), মৃৎশিল্প অতি প্রসিদ্ধ। এসবের সাথে সাথেই সেখানে আছে অনেক নাট্যদল। আর তার মধ্যে অন্যতম বহরমপুর রেপার্টরী থিয়েটার।
দেশ দাপিয়ে অভিনয় করেন দলের কুশিলবরা। তাঁদের পরিচালক এবং চিন্তক প্রদীপ ভট্টাচার্য্য। এ পর্যন্ত প্রযোজিত প্রায় প্রত্যেকটা নাটকই উচ্চ প্রশংসিত এবং পুরষ্কৃত। তোতা কাহিনী(১৯৮৮), গম্ভীরা গ্রামের জনজীবন এর উপর ভিত্তি করে নাট্য প্রযোজনা, দংশন(১৯৯০), তাসের দেশ(১৯৯৩), সক্রেটিসের সন্ধানে(১৯৯৪), ভোগ(১৯৯৫), আর্তুবাউই (১৯৯৬-৯৭) এবং আলকাপ লোকনাট্য ভিক্তিক নাটক মায়া (সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের তথ্য লেখ্য ‘মায়মৃদঙ্গ’ অবলম্বনে রচিত)। এই প্রযোজনাটি অত্যন্ত উল্লেখ্যযোগ্য।

মুর্শিদাবাদের ‘আলকাপ’ একটি লুপ্তপ্রায় লোকনাট্য সংস্কৃতি। সম সাময়িক সময়ে অবহেলিত এবং সংরক্ষণের অভাবে পরিত্যক্ত। প্রদীপ এবং বহরমপুর ‘রেপার্টারী থিয়েটার’ এই ধারাকে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়। আলকাপ হচ্ছে কৌতুকধর্মী লোকনাট্য যা শিল্পীরাই মঞ্চে Improvise করেন। গ্রামীণ অভিজ্ঞতা, আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্যে পরিপূর্ণ মঞ্চাভিনয়ের তাৎক্ষণিক উপস্থাপন এর তাৎপর্য এই আলকাপে প্রকাশিত হয়। লোকনাট্য আলকাপের বীজ লুকোনো আছে গাজনের সঙ’এ, গম্ভীরার গানে। আলকাপের জনক বহরমপুর থেকে ৪০ মাইল দূরে জঙ্গীপুর থানার মানুষ বোনা কানা, যিনি ছড়া কাটা আর অভিনয়ের মাধ্যমে জন্ম দিয়েছিলেন আলকাপ লোকনাট্যেয়ের বহুকাল আগে। অভিনয়ের বিষয় পৌরাণিক, গ্রাম্যকাহিনী অথবা সামাজিক । আলকাপের গানে নীতিকথা থাকলেও বিষয় হতে হয় ধর্মনিরপেক্ষ। বারো অথবা চৌদ্দ জনের একটি দলে একজন কবিয়াল, একাধিক ‘ছোকরা’, একজন ‘কোপ্য’ বা ভাঁড়, আর বাজনদারাই অভিনেতা হয়ে যান। আলকাপের ছেলেরাই নারী সেজে ও ভূষণ পরে অভিনেত্রী হয়ে যায়। এদের ভূমিকাই সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রদীপের দীর্ঘ গবেষণা এবং আলকাপের প্রয়োগে ‘মায়া’ নাটকটি হয়ে উঠেছে একটি নাট্যদলিল, অভিনয়ের বিরল ইতিহাস।