ছদ্মবেশী ধন্বন্তরি


বি কে পাল অ্যাভিনিউতে ঢোকা মাত্র চোখে পড়বে একটা নকশাদার বাড়ি। লোকে চিনিয়ে দিয়ে বলেও দেবে বাড়িটা কার। আর তখনই জানা যাবে এই রাস্তাটা যার নামে বাড়িটা তাঁরই। গেটের সামনে প্রাচীন ভারতীয় মন্দিরের দ্বারীর মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে দুই হস্তি যুগল। আর বাড়ির সদর দরজার দু পাশে আর্ট নুভ্য শৈলীর সুন্দরী রমণীর আঙুর লতা ধরে দাঁড়িয়ে থাকা। আর তাঁর সাথে দরজার দু পাশে হরিণী যুগলের মোহময় বিচরণ। সব মিলিয়ে এক আভিজাত্যের গমগমে আত্মপ্রকাশ। সঙ্গে সিঁড়ি জুড়ে বাড়ির কর্তার এ মাথা ও মাথা নাম খোদাই। আর বাড়ির মাথায় নিজের পিঠে পৃথিবী বাহক হারকিউলিস। সর্বোপরি বাড়িটা আজ লোক মুখে পরিচিত বি কে পালের ওষুধের দোকান বা ওষুধ বাড়ি হিসেবে। যেখানে আজও নাইট বেল বাজিয়ে রাত বিরেতেও রোগীর পথ্য কেনা যায়।

এই বাড়িটার আড়ালেই নকশি কাঁথার উষ্ণ বুনোটের মতো জড়িয়ে জাপ্টে রয়েছে এক ছদ্মবেশী ‘সাধুর’ গল্প।এটা সেই সময়ের কথা যখন নানা রকমের ছদ্মবেশীনগর মুলুকে আনাগোনা করছে। লাল পাগরি পুলিশগুলো কানা মাছি ভোঁ ভোঁ খেলার মতো বিপ্লবীদের পিছনে ছদ্মবেশে ঘুরঘুর করছে। দেউড়ির সেপাইরা খইনি পেটাতে পেটাতে গল্প ভাসাচ্ছেন জয় মা কালি সাবর্ণদের নিয়ে। তাঁদের চালিশায় তখন পুলিশ কমিশনারের ছদ্মবেশের জয়গান। জানা গেল বড়িশা সাবর্ণদের চাঁদার জুলুম ধরার জন্যে কমিশনার সাহেব নাকি মেয়ে সেজে পাল্কি করে সটান হাজির হয়েছিলেন সাবর্ণ পাড়ায়। তখন মেয়ে মানুষের হাত ধরে টানাটানি করার বদলে সাবর্ণদের জুল্লুমবাজরা কমিশনারের উর্দি ধরে টানাটানি করে ফেলেছিল। শেষে তো ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি। এমনই ছিল কলকাতার এক দোর্দণ্ড প্রতাপ কমিশনারের ছদ্মবেশী কথা ও কাহিনী। এসব ছাড়াও কলকাতা জুড়ে তখন রটনা হচ্ছে নানা প্রান্তের স্থানীয় রাজ বাড়ির জাল প্রতাপ চাঁদ কাহিনী কিম্বা রমরম করে চিতপুর ঢেলে বাণিজ্য করছে ভাওয়াল সন্ন্যাসী যাত্রা পালা। বলতে গেলে এসব নিয়েই কলকাতার আড়ালে আবডালে তখন জমে উঠেছে রোজের সন্ধ্যার ছদ্মবেশী মৌতাত। ছদ্মবেশী নিয়ে এমন গা হিম করা তর্ক তুফানে কখনও কোনও বাড়ির অন্দরে ‘পাঁচ দিনের’ মুখ দেখা দেখি বন্ধ হয়ে যায় তো কোনও বাড়ির রোয়াকের তর্ক তুফান দিল্লী শাহীর কুতুব মিনারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আকাশে মাথা তোলে।এক কথায় ছদ্মবেশী নিয়ে কলকাতা তখন মশগুল।

সেরকম একটা সময় সাহেবি গন্ধ মাখা এক বাঙালির ছদ্মবেশ ধারণ করার গল্প ঘুণাক্ষরেও জানতে পারলে না কেউ। তিনি কাজটা করলেন নীরবে এবং সকলের আড়ালে। সেই নীরবতা এমনই যে কলকাতার মেয়র স্যার হরিশঙ্কর পালের মুখ থেকেও তাঁর পিতৃদেবের ছদ্মবেশ ধারণ করার কাহিনী লোকে শোনেও নি কোনও দিন। কিন্তু কলকাতার রাস্তায় কান পাতলেই সেই কাহিনী-র অনেকটাই শুনে নেওয়া যায়। এ হেন ছদ্মবেশী-র নাম বটকৃষ্ণপাল। যাকে আমরা চিনি নিছকই এক ঔষধ ব্যবসায়ী হিসেবে। যাকে আমরা চিনি এ দেশে সাহেব সুবোদের অসুখ বিসুখ করলে তার একমাত্র মেডিসিন সাপ্লায়ার হিসেবে অথবা যাকে আমরা চিনি রাজার মতো ছিলেন দীন দরদী, রাজার মতো ছিলেন আচরণে। কিন্তু নিজে না ছিলেন কোনও রাজ পরিবারের সন্তান, না ছিল কোনও কালে তাঁর কোনও রাজবাড়ির আদর। চরিতাভিধান অন্তত সেরকমটা বলে না। চরিতাভিধানে বলা হয়েছে বটকৃষ্ণ পালের জন্ম শিবপুরে মানে সাকিন হাওড়া জেলার মানচিত্রে। তাঁর পিতা মাতা পরলোকে আশ্রয় নেওয়ার কারণে বাল্য কালেই মা বাবা-র কোল আদর হারিয়েছিলেন বটকৃষ্ণ। এরপর মাতুলালয়ে আশ্রয় নিলেন শুধু তাই নয় সাকুল্যে যখন তাঁর বছর বারো বয়স তখন দেখা গেল মাতুলের মসলার দোকানে কাজ শিখতে ঢুকলেন।

এরপর কিছু দিন পাটের ব্যবসা করলেন বটে কিন্তু শেষে গিয়ে নিজেই খুলে বসলেন একটি মসলার দোকান। শুরু করলেন স্বাধীন ব্যবসা। কিন্তু মাঝপথে অর্থাভাব হওয়ায় মাধবচন্দ্র দাঁ- কে সঙ্গী করলেন। এরপর দেখা গেল এক নতুন দিক বদল। ক্রমে এই দোকানেই রাখতে লাগলেন বিলিতি ঔষধ। সেই বলতে গেলে যাত্রা শুরু আজকের বাঙলার ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ ঔষধ ব্যবসায়ী-র। এর পরের ঘটনা হল এরকম যে নিজেই একদিন স্থাপন করলেন বি কে পাল অ্যান্ড কোম্পানি। যার মোদ্দা কথা হল দেশি ফর্মুলায় ওষুধ তৈরি। দেখতে দেখতে একদিন কিছু দক্ষ কর্মচারীকে সঙ্গে নিয়ে বানিয়ে ফেললেন অ্যান্টি ম্যালেরিয়া স্পেসিফিক। তখন এই ওষুধ নেওয়ার জন্যে পাকিস্তান, রেঙ্গুন, শ্রীলঙ্কা, বার্মা থেকে দলে দলে মানুষ আসে পাল মশাইয়ের দোকানে। খোদ বিলেত থেকে প্রিন্স অব ওয়েলস এর অনুমতি আছে পাল মশাইয়ের। এহেন ওষুধটিকে বটকৃষ্ণ নামও দিয়েছেন এডওয়ার্ড টনিক। নিজের বাড়িতেই সেদিন গড়ে তুলেছেন বিরাট রসায়নাগার। সেখানেই দিশি উপায়ে একের পর এক ওষুধ তৈরি হয়ে চলেছে।

এরই মধ্যে ধরলেন ছদ্মবেশ। ব্রিটিশ সাহেবদের ওষুধ যায় এই বাড়ি থেকে। সাহেব সুবোদের আনাগোনা লেগেই থাকে এখানে। তারই মাঝে রবিবার করে চলে দেদার বিনি পয়সায় ম্যালেরিয়ার ওষুধ বিতরণ। তারই মাঝে একদিন শুরু করে দিলেন গোপনে পিছনের দরজা দিয়ে এক অন্য কারবার। কেউ জানলও না সেই গল্প। আসলে সেদিন অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষিত তরুণদের বাড়ি থেকে সাপ্লাই দিচ্ছেন বোমা বানানোর পটাশ, নাইট্রিক অ্যাসিড, সালফিউরিক অ্যাসিড, ক্লোরাইড সহ আরও কত কি। ওপরে সাহেবের অনুগত মানুষটির এমন দেশ দরদী কীর্তিটির সাক্ষী ছিলেন সর্বজন বিদিত ইম্প্রেশন হাউসের প্রতিষ্ঠাতা রবি দত্ত মশাই। তিনিই মাঝে মধ্যে গল্প করতেন এমন কাহিনীর। কারণ তিনিও ছিলেন বিপ্লবী। মুখ ঢেকে যারা হাজির হতেন চিনতেন সবাইকে। এমনই ছিল বটকৃষ্ণের ছদ্মবেশী ডাক্তারি কাব্য। ঠিক যেন নিজে ম্যালেরিয়া আক্রান্ত শুধু নয় পরাধীনতা আক্রান্ত দেশের হারকিউলিস।
অলঙ্করণ- পার্থ দাশগুপ্ত