আধ্যাত্মিকতার পথ ধরে আত্মহত্যার মুখ থেকে ফিরেছেন শীর্ষেন্দু

বাংলা সাহিত্যজগতে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় (Shirshendu Mukhopadhyay) যেন সব্যসাচী। তাঁর লেখা গল্প-উপন্যাস যেমন শিশু-কিশোরদের মুগ্ধ করে, তেমনি পরিণত বয়স্ক পাঠক তাঁর সৃষ্টিতে খুঁজে পান গভীর জীবন বোধ। ‘ঘুণপোকা’ (Ghunpoka), ‘দূরবীন’ (Durbin), ‘মানবজমিন’ (Manab Zamin)-এর লেখক আজ ৮৭ বছরে পা দিলেন।
শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের জন্ম হয়েছিল ১৯৩৫ সালে, ব্রিটিশ ভারতের ময়মনসিংহে। দেশভাগের পর পরিবারের সঙ্গে কলকাতায় চলে আসেন। তাঁর বাবা রেলওয়েতে চাকরি করতেন। বাবার কাজের সূত্রে পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, আসামের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে হয়েছে শীর্ষেন্দুকে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করার পর স্কুল শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তীকালে যুক্ত হন আনন্দবাজার ও দেশ পত্রিকায়।
ছোটোবেলা থেকেই এক ধরনের আত্মপরিচয়ের সংকটে ভুগতেন শীর্ষেন্দু। কোথা থেকে আমাদের সৃষ্টি হল, মহাবিশ্বের সঙ্গে আমাদের যোগ কী, তাঁকে এই প্রশ্নগুলো তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াত। একটা গভীর বিচ্ছিন্নতাবোধ গ্রাস করেছিল। এই যন্ত্রণার থেকে ছেলেকে মুক্ত করতে তাঁর মা তাবিজ-কবচ ধারণ করিয়েছিলেন, তুকতাকও করিয়েছিলেন। কিন্তু এতে কোনো স্বস্তি মেলেনি। অবস্থা এমন জায়গায় পৌঁছল যে শীর্ষেন্দুকে আইএসসি পড়া থামিয়ে দিতে হয়েছিল। এই সময়ে তাঁর পৈতে হয়। খুবই অবাক করা ব্যাপার, পৈতে হওয়ার পর সেই যন্ত্রণা থেকে সাময়িক মুক্তি পেলেন শীর্ষেন্দু।
আবার যখন তিনি কলকাতা এসে পড়াশোনা শুরু করলেন, তখন নতুন করে অবসাদ গ্রাস করেছিল তাঁকে। শীর্ষেন্দু বয়স তখনো তিরিশের কোঠায় পৌঁছয়নি। মানসিক যন্ত্রণা এমন জায়গায় পৌঁছেছিল যে তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে নিজের জীবন শেষ করে দেবেন।আত্মহত্যার চিন্তা যখন তিনি করছেন, ওই সময়েই তিনি একবার অনুকূল ঠাকুরের কাছে যান। আশ্চর্যভাবে তাঁর সব অবসাদ দূর করে দেন অনুকূলচন্দ্র। আধ্যাত্মিকতার মধ্যে জীবনের অর্থ খুঁজে পেলেন শীর্ষেন্দু। তাঁর লেখার মধ্যেও সেই গভীর আধ্যাত্মিকতাবোধ কাজ করে সব সময়েই।
সমকালের বাংলা সাহিত্যে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় এক যুগান্তকারী নাম। ‘বিদ্যাসাগর পুরস্কার’, ‘আনন্দ পুরস্কার’, ‘সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার’-এর মতো নানা সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। তাঁর বেশ কিছু গল্প-উপন্যাস নিয়ে তৈরি হয়েছে টিভি ধারাবাহিক, সিনেমা এবং নাটক। সম্প্রতি সাহিত্য অকাদেমির সবচেয়ে বড়ো সম্মানে ভূষিত হন সাহিত্যিক। অকাদেমির ‘ফেলো’ নির্বাচিত হয়েছেন। এটিই সাহিত্য অকাদেমির সর্বোচ্চ সম্মান। খুব কম বাঙালি লেখকই এই পুরস্কার পেয়েছেন। এর আগে এই পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, সুকুমার সেন, শঙ্খ ঘোষ, অন্নদাশঙ্কর রায়, আশাপূর্ণা দেবী এবং নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী। এবার এই সম্মানে ভূষিত হলেন কথা-সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু।
শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের কলম থেকে আরও অনেক কালজয়ী সাহিত্যের সৃষ্টি হোক, তাঁর জন্মদিনে রইল এমনই কামনা।
তথ্যসূত্র –
১. সুমন দে’র নেওয়া শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের সাক্ষাৎকার, পত্রিকা, আনন্দবাজার পত্রিকা।
২. শিবব্রত বর্মন ও আলতাফ শাহনেওয়াজের নেওয়া শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের সাক্ষাৎকার, প্রথম আলো।