আয়ুর্বেদ ও বাঙালির গৌরবের দিনগুলি

১৮৩৫-এর কলকাতা। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এক সাহেব টমাস ব্যাবিংটন মেকলে শিক্ষাব্যবস্থা-সম্পর্কিত এক নয়া ফরমান আনলেন একদিন। আর তাতেই নড়েচড়ে বসল শহর। কী দাবি ছিল সাহেবের?
দেখা গেল, সাহেবের সটান উড়িয়ে দিয়েছেন বাঙালির তৎকালীন শিক্ষাব্যবস্থা। তাঁর মতে, ওসব বাঙালি টুলো পণ্ডিতদের আরবি, ফার্সি সংস্কৃত চর্চায় বাহবা দেওয়া, পিঠচাপড়ানি দেওয়া ও অর্থ সাহায্য দেওয়া অবিলম্বে বন্ধ করা হোক। এই তালিকার শীর্ষে চলে এল প্রায়োগিক সংস্কৃত ভাষা নির্ভর ‘আয়ুর্বেদ চর্চা’। সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করলেন কলকাতার সাহেবি মহল্লার তুখোড় ডাক্তার জনসন, টিটলার-রা। যদিও তাতে কাজ হল না বিশেষ। ফরমান প্রতিষ্ঠা পেল, চালু হল বিলিতি আলোয় শিক্ষা দেওয়ার নিয়ম।
আর ঠিক তখনই এক কাণ্ড ঘটল কলকাতায়। দেখা গেল, শীর্ণকায় চেহারার রোগাটে, কঠোর এক মানুষ গঙ্গাধর কবিরাজ ‘গঙ্গাধর নিকেতন চতুষ্পাঠী’ খুলে বসেছেন। তৈরি করছেন আয়ুর্বেদ চর্চার দিকপাল সব ছাত্রদের। গঙ্গাপ্রসাদ, বিজয়রত্ন, যামিনীভূষণ কবিরাজ প্রমুখ দিকপাল চিকিৎসকরা ছড়িয়ে পড়লেন বাংলার বুকে।
কবিরাজ গঙ্গাধর তাঁর ছাত্রদের সঙ্গে নিয়ে মেকলে-কে চ্যালেঞ্জ করে সরাসরি ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক আয়ুর্বেদ’ চিকিৎসা পদ্ধতি গড়ে তুললেন কলকাতায়। চতুষ্পাঠীর টুলো পণ্ডিত ছাত্ররা সেদিন কার্যত রাজদ্রোহী। তাঁদের নেতা গঙ্গাধর কবিরাজ।
আরও পড়ুন
বিদ্যাসাগর ও তাঁর গুরুমশাই
সেখানেই থেমে থাকা নয়। ১৮৬৮-তে গঙ্গাধর নিজে সম্বাদ জ্ঞানরত্নাকর যন্ত্রে ছাপিয়ে ফেললেন চড়ক সংহিতার টীকা ‘জল্প কল্পতরু’। অন্যদিকে তাঁর ছাত্ররাও ততদিনে মেকলের ফরমানকে বুড়ো আঙুল দেখাতে শুরু করেছেন। পাথুরেঘাটা, কুমোরটুলি চত্বর জুড়ে আস্তানা গাড়লেন গঙ্গাধরের ছাত্রকুল।
শুরু হল গঙ্গাধরের ছাত্রদের জয়যাত্রা। সেই ছাত্রদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন গঙ্গাপ্রসাদ সেন। গঙ্গাধরের পিতা নীলাম্বরও ছিলেন খ্যাতিমান কবিরাজ। সে-আমলে লোকে ছড়া কাটত ‘গণি মিঞার ঘড়ি আর নীলাম্বরের বড়ি’। অন্যদিকে গঙ্গাপ্রসাদ সম্পর্কে শ্রীশ্রীঠাকুর রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব বলতেন ‘ও সাক্ষাৎ ধন্বন্তরি’। এ হেন গঙ্গাপ্রসাদ কবিরাজ হয়েও নেমে পড়লেন ইংরেজ বিরোধিতায়। বঙ্গবাসী পত্রিকার সম্পাদক যোগেশচন্দ্র বসু যখন রাজদ্রোহের অপরাধে অভিযুক্ত হলেন তখন তাঁকে এক লক্ষ টাকা দিয়ে জামিন করালেন গঙ্গাপ্রসাদ।
কথায় বলে, ‘বিদ্বান সর্বত্র পূজ্যতে’। হলও তাই। ১৮৭৭ সালে মহারানি ভিক্টোরিয়া হিন্দু চিকিৎসা বিজ্ঞানে দক্ষতার জন্য গঙ্গাপ্রসাদকে ‘রায়’ উপাধি দিলেন।
কবিরাজ বিজয়রত্নও পিছিয়ে ছিলেন না। নিজের খ্যাতিকে এতদূর পর্যন্ত বিস্তৃত করেছিলেন যে, ইংরেজ সরকারই তাঁকে ‘মহামহোপাধ্যায়’ উপাধিতে সম্মানিত করেন। আর কবিরাজ যামিনীভূষণের রোগীর তালিকায় সেদিন জ্বলজ্বল করছে গোয়ালিয়র, ইন্দোর ও ত্রিপুরার রাজাদের নাম।
আজও কুমোরটুলির ৫ নম্বর রাস্তা চত্বরে দাঁড়িয়ে আছে কবিরাজ গঙ্গাপ্রসাদ সেনের বাড়ি। আজও এই রাস্তায় দেখা যায় বিজয়রত্ন ভবনের জীর্ণ ফলকটি। যেখানে ‘মহামহোপাধ্যায়’ উপাধিটিও পড়তে পারা যায়। তাই এই ফলক সাক্ষ্য দেয় মেকলের বিরুদ্ধে বাঙালির প্রতিবাদকে এবং ঐ ‘মহামহোপাধ্যায়’ কথাটুকু সাক্ষ্য দেয় বাঙালির কাছে ব্রিটিশরাজের মাথা নোয়ানোর ইতিহাসকে।