বাঙালির পাল্টে যাওয়া ইতিহাসের সাক্ষী বাগবাজার

প্যারীচাঁদ মিত্র তাঁর ‘আলালের ঘরে দুলাল’ (১৮৫৮) বইয়ে লিখছেন, “নৌকা দেখিতে দেখিতে ভাঁটার জোরে বাগবাজারের ঘাটে আসিয়া ভিড়িল। রাত্রি প্রায় শেষ হইয়াছে – কলুর ঘানি জুড়ে দিয়েছে, বল্দেরা গোরু লইয়া চলিয়াছে – ধোপার গাধা থপাস থপাস করিয়া যাইতেছে – মাছের ও তরকারির বাজরা হু হু করিয়া আসিতেছে – ব্রাহ্মণ পণ্ডিতেরা কোশা লইয়া স্নান করিতে চলিয়াছেন – মেয়েরা ঘাটে সারি সারি হইয়া পরস্পর মনের কথাবার্ত্তা কহিতেছে। কেহ বলিতেছে, পাপ ঠাকুরঝির জ্বালায় প্রাণটা গেল – কেহ বলে, আমার শাশুড়ি মাগী বড় বৌকাঁটকি – কেহ বলে, দিদি, আমার আর বাঁচতে সাধ নাই – বৌছুঁড়ী আমাকে দুপা দিয়া থেতলায় – বেটা কিছুই বলে না, ছোঁড়াটাকে গুণ ক’রে ভেড়া বানিয়েছে কেহ বলে, আহা, এমন পোড়া জাও পেয়েছিলাম, দিবারাত্রি আমার বুকে ব’সে ভাত রাঁধে, কেহ বলে, আমার কোলের ছেলেটির বয়স দশ বৎসর হইল – কবে মরি কবে বাঁচি, এই বেলা তার বিয়েটি দিয়ে নি।” প্রায় ১৬১ বছর আগের ইতিহাস। কবি প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায় একবার বলেছিলেন, প্রত্যেক বাঙালির একটা করে উত্তর কলকাতা আছে। আর উত্তর কলকাতা বলতেই সবার আগে বাগবাজারের নামই মাথায় আসে। কলকাতার এমন একটি অঞ্চল বাগবাজার, যেখানে সবকিছুর মধ্যে মিশে আছে সংস্কৃতি, সাহিত্য এবং বাঙালির প্রজন্মের ধারাবাহিকতার ইতিহাস। কথিত আছে বাগ বা উদ্যান শব্দ থেকেই বাগবাজার শব্দটি এসেছে। তবে ভাষাতাত্ত্বিক সুকুমার সেনের মতে বাঁক বাজার শব্দের অপভ্রংশ আজকের বাগবাজার। কারণ হুগলি নদীর একটি প্রকাণ্ড বাঁক এখানে অবস্থিত।
ইলিশের নৌকা
বাগবাজার লঞ্চ ঘাট
সুরেন্দ্রনাথ ঘোষের বিখ্যাত মিষ্টির দোকান
কলকাতার অন্যতম ধনী ও প্রভাবশালী ব্যক্তি গোবিন্দরাম মিত্রের পুত্র রঘু মিত্র ইস্টইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনকালে বাগবাজার ঘাটটি নির্মাণ করেন। ১৭৫৬ সালের তদানীন্তন বাংলার নবাব সিরাজদ্দৌলা কলকাতা আক্রমণ করলে বাগবাজারের অদূরেই কোম্পানির সঙ্গে তাঁর বিখ্যাত লালদিঘির যুদ্ধটি ঘটে। এই যুদ্ধে সিরাজ জয়লাভ করেন ও কলকাতা অধিকার করে নেন। এই বাগবাজার একসময় সুতানটি গ্রামের অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই অঞ্চল ছিল বসু ও পাল পরিবারের আবাসভূমি। ঊননিংশ শতাব্দীতে এই অঞ্চলের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েন শ্রীরামকৃষ্ণ। ১৮৭৭ সালে তিনি প্রথম বাগবাজারে এসেছিলেন। বোসপাড়া লেনে কালীনাথ বসুর পৈত্রিক বাসভবনে আসেন এবং সেখানেই স্বামী তুরিয়ানন্দ, স্বামী অখণ্ডানন্দ এবং নাট্যকার গিরিশ ঘোষের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ ঘটে। ১৯৩০ সালে দুর্গাচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় বাগবাজার সর্বজনীনের সভাপতি হন। এই সময় থেকেই এখানকার দুর্গাপুজোর সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে স্বদেশি আন্দোলনের ধ্যানধারণা। দুর্গাচরণবাবু সভাপতি হিসাবে যুক্ত করতে চাইলেন তৎকালীন কলকাতার মেয়র নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে। সুভাষচন্দ্র ৫০০ টাকা চাঁদা দিলেন। ১৯৩৮ ও ১৯৩৯ সালে সুভাষচন্দ্র প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন বাগবাজার সর্বজনীনের পুজোর সঙ্গে।
বাগবাজার স্ট্রিটের গিরিশ ঘোষ অ্যাভিনিউ ক্রসিং
বাগবাজারের বিখ্যাত শাঁখারির দোকান
পটলার তেলেভাজা
বদলে যাওয়া বাঙালির ইতিহাসের সাক্ষী এই বাগবাজার। আজও প্রতি সন্ধেয় জমে ওঠে থিয়েটার, যাত্রাপালা, আজও পাড়ার কোনো বধূ বিকেলবেলায় একা একা বসে থাকেন মায়ের ঘাটে, আজও রাস্তার মাঝখানে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকেন নাটুকে গিরিশের সেই একফালি বাড়িটা, গঙ্গার জলে বয়ে যায় আবহমান স্রোত- উঁচু উঁচু পুরোনো বাড়ির খড়খড়িগুলো তাকিয়ে থাকে সেই স্রোতের দিকে।
ফণিভূষণ বিদ্যাবিনোদ যাত্রামঞ্চ
গিরিশ মঞ্চ
মহারাজা কাশিমবাজার পলিটেকনিক
বাগবাজার সার্বোজনীন দুর্গাপুজোর মাঠের প্রধান দ্বার
গৌড়িয় মঠ
বাগবাজার বাটার মোড়
ছবি- অরুণ পাল