No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    সৌমিত্র সেই বিরল প্রতিষ্ঠান, যিনি মনে করিয়ে দেন, শিল্পের আদর্শ আর নিষ্ঠার দিকটি  

    profile pic

    সৌমিত্র সেই বিরল প্রতিষ্ঠান, যিনি মনে করিয়ে দেন, শিল্পের আদর্শ আর নিষ্ঠার দিকটি  

    Story image

    সেলুলয়েডের অসামান্য ‘নায়ক’ তিনি। অভিনেতা, নাট্যপরিচালক, আবৃত্তিকার, কবি একই সঙ্গে এত অপরিসীম এবং বহুধা তাঁর প্রতিভার সমস্ত বিচ্ছুরণ। বাঙালির ‘উত্তম-সৌমিত্র’ দ্বৈরথ থেকে কোনির খিদদা, কিংবা শুধু সত্যজিতের সঙ্গেই তাঁর এত নিবিড় সব অভিনয়ের জন্য তাঁকে মনে রাখা যায়। তিনি ছোটোবেলার উদয়ন পণ্ডিত, তিনি কৈশোরের প্রদোষ মিত্র, আর বড়োবেলার অসীম। তাঁর অসুখের সময়, চতুর্দিকে মহামারী আর দুর্গাপুজোর নিভু-নিভু আয়োজনের মাঝে, তাঁকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় ভুগতে ভুগতে আমাদের মন তাঁর সুস্থতা চেয়েছে। এই সুস্থতা চাওয়া কিন্তু তাঁর অভিনয়ের গুণে কিংবা শুধু শিল্পী সৌমিত্রকে কুর্নিশের কারণে নয়। তিনি আসলেই, আমাদের বহমান বহু দশকের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা স্মৃতির এক মহীরুহ। যার দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে অবাক হতে হতে আমরা বহু হীরক রাজার মূর্তি ভেঙে যেতে দেখেছি, দেখেছি বহু সিগারেটের প্যাকেটের উপর লেখা, যে কথাগুলো দিয়েছিলাম আমরা। তিনি এই বিপন্ন সময়ে আমাদের আজন্মলালিত স্মৃতির সব দায় নিয়ে দীর্ঘদিন শুয়েছিলেন হাসপাতালে। আমরা সবাই সেই স্মৃতিকে আঁকড়ে থাকতে চেয়েছিলাম।

    কেন বিপন্ন সময়? সদ্য স্ট্যান স্বামীকে অ্যারেস্ট করা হল। সত্তর বছরের উপর বয়স তাঁর। গত কয়েকবছর ধ’রে একে একে হত্যা হয়েছেন কালবুরগি, দাভোলকর, গৌরী লঙ্কেশ। জেলের ভিতর থাকতে থাকতে ক্লান্ত কবি ভারভারা রাও। এমন এক সময়, যখন প্রবীণ মুখেদের জন্য আমরা চিন্তা করতে ভুলে যাই। এমন এক সময় যখন অসুখের সামনেও অ্যারেস্টের, রাষ্ট্রের বিদ্রুপ লেগে থাকে। তখনও আমাদের মন চেয়েছিল, সুস্থ হয়ে উঠুন সৌমিত্র। বারংবার আমরা খোঁজ নিচ্ছিলাম তাঁর কন্যার ফেসবুকে। কেমন আছেন তিনি?

    সম্ভবত সৌমিত্র-ই একমাত্র অভিনেতা যাকে এখনও আমরা আমাদের সামাজিকভাবে হারাতে বসা বিবেকের দায় অর্পণ করতে পারি নিশ্চিন্তে। তাঁর সামান্য সময়ের হাসিটুকু আমাদের দীর্ঘদিন হারিয়ে যেতে বসা বিবেকটুকুকে মনে করায়। তাঁর অভিনয় শিল্প, তাঁর আবৃত্তি কিংবা কবিতায় নয়। তাঁর সারাজীবনের কাজের মধ্যে জাগরূক যে মানবিক বিবেক, তাঁর সারাজীবনের লালিত সাম্যবাদী আদর্শগুলি হয়তো বাঙালি ভুলতে চায়নি, ভুলতে পারবেও না। তাই তিনি যখন অসুস্থ, আমরা তাঁর সুস্থতার মধ্যে আমাদের ষাট সত্তর আশির কিংবা নব্বই দশকের আলুথালু অথচ আদর্শে ঋজু বাঙালি জীবনের হারিয়ে যাওয়ার কথা ভাবতে পারছিলাম। তিনিই লিখতে পারেন, ‘পড়ে থাক রাজবংশ বৈভব যা কিছু/ সব ছেড়ে চলে যেতে পারে ভালোবাসাই’।  এই ক্রেডিট কার্ডের ছিপছিপে দশকে এসে এমন একজন শিল্পীর বিবেককে আমাদের দরকার হয়ে পড়ে। যে বিবেকের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অসম্ভব এক কর্মী মানুষ। অসম্ভব এক নিপুণ মন। যিনি ষাটোর্ধ হবার পর, ক্যান্সারে ভুগতে ভুগতে একের পর এক চরিত্রের দিকে এগিয়ে গেছেন। রাজা লিয়ার করেছেন। তাঁর নিজের নাট্যদল থেকে অভিনয় ও পরিচালনা করেছেন বহু নাটক। কেন এত অক্লান্ত তিনি? কেন কাজের প্রতি আজীবন ছিল অসম্ভব নিষ্ঠা? বহু আগেই তো সরে যেতে পারতেন কাজ থেকে? এইখানেই তিনি ব্যতিক্রম। আর এইখানেই আমাদের সামনে তিনি একজন নক্ষত্র। 

    ‘হীরক রাজার দেশে’ চলচ্চিত্রে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় 

    তিনি আমাদের সেই অতীতের কথা মনে করিয়ে দেন, যে অতীতের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন শিশিরকুমার ভাদুড়ি, সত্যজিতের মতো প্রতিভা। যাঁরা একই সঙ্গে শ্রেষ্ঠ এবং অক্লান্ত কর্মী। যাঁদের জীবনে এখনও শর্ট-কাট নেই। যাঁদের এখনও শুধু ইন্সটাগ্রাম কিংবা ইউটিউব লাইক দিয়ে নিজেকে জাহির করে রাখতে হয় না। সৌমিত্র সেই বিরল প্রতিষ্ঠান, যিনি প্রতিটি কাজের সঙ্গে আমাদের বারংবার মনে করিয়ে দিয়েছেন, শিল্পের আদর্শ আর নিষ্ঠার দিকটি। মনে করিয়ে দিয়েছেন এক কাজ থেকে আরেক কাজে উত্তীর্ণ হবার মাঝেই। মনে করিয়ে দিয়েছেন বাঙালি অভিনেতার, বাঙালি শিল্পীর অতীত আসলেই দীর্ঘদিনের ‘কর্মী’ হয়ে ওঠার অতীত।

    এই বিপন্ন, এই অবসন্ন সময়ে তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনের দিকে ফিরে তাকালে, বারবার ফিরে আসে তাঁর এই সংবেদনের পরিচয়ই। তাঁর এই কর্মে ঋজু মেরুদণ্ডের সামনে এখনও নত হয়ে থাকতে হয় বিস্ময়ে। আমরা অতীতবিমুখ হয়ে উঠব যত। আমরা যত বেশি অগভীর আর অমানবিক হয়ে উঠব, আমাদের কাছে তাঁর থেকে যাওয়ার প্রয়োজন তত বেশি। তা শারিরীকভাবে না হলেও মানসিকভাবে। তিনি আমাদের সময়ের শিক্ষক। তিনি আমাদের সময়ের স্থিত আকাশের মতো। তিনি কি মেঘমুক্ত হতে পারলেন? 

    সৌমিত্রবাবু অমর রহে।
     

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @