একটি আস্ত গ্রাম হয়ে উঠছে ‘ওপেন স্টুডিও’

কয়েক বছর আগে একদল মানুষ ঘুরতে গিয়েছিলেন ঝাড়গ্রামের ছোট্ট গ্রাম লালবাজারে। শহরের অনেক মানুষই তো সময় সুযোগ পেলে গ্রামের দিকে পাড়ি জমান। কেউ যান সুস্থ বাতাসের খোঁজে, কেউ বা প্রকৃতির অপরূপ মায়ায় নিজেকে আবিষ্কার করেন নতুন করে। তবে এক্ষেত্রে ঘটল অন্য কিছু। এই দলের মধ্যে ছিলেন মৃণাল মণ্ডল। চালচিত্র অ্যাকাডেমির সম্পাদক। বেশ কয়েক বছর ধরে চালচিত্র অ্যাকাডেমি লোকশিল্পের সঙ্গে মূল ধারার শিল্পীদের মেলবন্ধন ঘটানোর কাজ করে চলেছে। ঝাড়গ্রাম রেলস্টেশন থেকে চার কিলোমাটার দূরে জঙ্গলের ভেতরে লালবাজার গ্রামটিকে দেখে মৃণালবাবু ভেবেছিলেন, এঁদের জন্য কিছু করার প্রয়োজন আছে। গ্রামটাতে তিনি দেখতে পেয়েছিলেন অন্য কিছুর সম্ভাবনা। ছোট্ট একটা গ্রাম। চারদিক জঙ্গলে ঘেরা। গ্রামে ঢোকা আর বেরোনোর রাস্তা একটাই।
কলকাতায় ফিরে মৃণালবাবু চালচিত্র অ্যাকাডেমির অন্যান্য সদস্যদের জানালেন সেই জায়গাটার কথা। তাঁদের নিয়ে আবার গেলেন গ্রামটিতে। সেখানে কচিকাঁচাদের সঙ্গে মিশে তাঁরা ঠিক করলেন, এঁদের নিয়ে শুরু করবেন ছবি আঁকার ক্লাস। যেমন ভাবা তেমনই কাজ। স্থানীয় শিল্পী রামেশ্বর সরেন আর যজ্ঞেশ্বর হাঁসদা ক্লাস নেওয়া শুরু করলেন প্রত্যেক শনিবার। সময় সুযোগ মতো কলকাতার শিল্পীরাও মাঝেমধ্যে গিয়ে তালিম দিতে থাকলেন। একদিন ছবি আঁকার পাশাপাশি শুরু হল কাটুমকুটুম। এদিকে সেই গ্রামের বাড়িগুলোতে মাটির দেওয়াল দেখে কয়েকজন শিল্পীর মাথায় আসে, সমস্ত গ্রামটা জুড়ে একটা ওপেন স্টুডিও তৈরি করলে মন্দ হয় না। তারপর গ্রামের দেওয়ালগুলো ভরে উঠতে লাগল রংবেরং-এর ছবিতে। শবর গ্রামটির ঘরবাড়িগুলোকে দেওয়া হতে লাগল আর্টিস্টিক লুক। প্রথিতযশা শিল্পীদের পাশাপাশি সেই কাজে হাত লাগাল কচিকাঁচারাও।
প্রখ্যাত সাহিত্যিক শিবাজী বন্দ্যোপাধ্যায় কয়েকদিন আগে গ্রামটির নতুন নাম দিয়েছেন খোয়াবগাঁ। এখন চালচিত্র অ্যাকাডেমির উদ্যোগে প্রাপ্তবয়স্ক গ্রামবাসীদেরও শেখানো হচ্ছে কাঁথা সেলাই থেকে শুরু করে খেজুর পাতার চাটাই তৈরি, ছবি আঁকা, আলপনা দেওয়া। সেখানে গিয়ে কাজ করছেন কৃষ্ণনগরের আলপনা শিল্পী বিধান বিশ্বাস। নয়াগ্রামের পটুয়া মনু চিত্রকর, বাহাদুর চিত্রকর দেওয়ালে পটের আদলে আঁকছেন তাঁদেরি নিজস্ব বিবাহরীতি। গভর্নমেন্ট কলেজ অফ আর্ট অ্যান্ড ক্রাফটের অধ্যাপক সৌজিৎ দাস খোয়াবগাঁ ঘুরে এসেছেন সম্প্রতি। ‘বঙ্গদর্শন’-এর প্রতিনিধিকে তিনি জানালেন, “চালচিত্রের সদস্যরা এখানে যে প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছেন তা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। ছোটোদের সঙ্গে খেলার ছলে যে জ্ঞানের আদানপ্রদান ঘটছে, সেটা খুবই জরুরি। নতুন প্রজন্ম দেখলাম খুবই উৎসাহী। তার সঙ্গে চালচিত্র গ্রামের অন্যান্য মানুষদেরও স্বাবলম্বী করে তোলার চেষ্টা চালাচ্ছে। গ্রামটা সেজে ওঠাতে বেশ আনন্দ পাচ্ছেন গ্রামবাসীরা। তাঁদের দেওয়ালে ছবির মাধ্যমে যে সব লোককথা ফুটে উঠছে সেই কাহিনিগুলো আরও পাঁচজনের মধ্যে ছড়িয়ে না পড়লে আমাদের একটি সংস্কৃতির একটি অধ্যায় অনেকেরই অজানা থেকে যাবে। চালচিত্রের এই প্রচেষ্টা গ্রামবাসীদের আরও আত্মবিশ্বাসী ও সৃজনশীল করে তুলবে এই আশাই রাখি”।
আগামী এক বছরের মধ্যে খোয়াবগাঁয়ে একটি শিল্পগ্রাম তৈরি করা কাজ সম্পূর্ণ হবে বলে মনে করছেন চালচিত্র অ্যাকাডেমির শিল্পীরা। এই কাজে সঙ্গত দিচ্ছেন ‘প্যালেট’ অঙ্কন সংস্থার কর্ণধার শিল্পী সৌরভ ধবলদেব। চালচিত্র অ্যাকাডেমির সম্পাদক মৃণাল মণ্ডলের আর্জি, এই প্রকল্পের পাশে দাঁড়ান আরো মানুষ। কোনো সরকারি বা বেসরকারি সাহায্য ছাড়াই তাঁরা এই উদ্যোগ নিয়েছেন। সাধ্য মতো আপনিও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন এই গ্রামটিকে আরও সুন্দর করে তোলার জন্য। যাঁরা এই প্রকল্পে চালচিত্র অ্যাকাডেমিকে সহায়তা করতে ইচ্ছুক, তাঁরা +৯১ ৯৪৩৩২৪৫৫৭৪ নাম্বারে ফোনের মাধ্যমে যোগাযোগ করতে পারেন মৃণাল মণ্ডলের সঙ্গে।