No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    ‘অপুর সংসার’-এর সাফল্যের পর উচ্ছ্বসিত হয়ে সত্যজিৎ রায় বলেছিলেন ‘থার্ড টাইম লাকি’

    ‘অপুর সংসার’-এর সাফল্যের পর উচ্ছ্বসিত হয়ে সত্যজিৎ রায় বলেছিলেন ‘থার্ড টাইম লাকি’

    Story image

    “‘পথের পাঁচালি’র মতোই ‘অপরাজিত’র দুটি মৃত্যুর দৃশ্য নিয়েও আমি অনেক ভেবেছিলাম। মৃত্যুকে যেভাবে দেখাব বলে ঠিক করি, আমার ধারণা, সেটা কার্যকর হবে। পায়রার ঝাঁকের সঙ্গে গঙ্গার ঘাটগুলোর সম্পর্ক একেবারে অঙ্গাঙ্গী। নদীর ধারে উঁচু-উঁচু পুরনো সব অট্টালিকা রয়েছে। তাদের ফাঁকে-ফোকরে থাকে এই পায়রাগুলো। সকালবেলায় সিঁড়ির পাশের আটকানো পাথুরে চাতালের উপরে সাধুরা এসে দাঁড়ান। ...এই যে একইসঙ্গে শতখানেক কি তারও বেশি পাখির আকাশে উঠে পড়া, আর একইসঙ্গে একশো জোড়া ডানা ঝাপটানোর শব্দ, কাশীতে পৌঁছে প্রথম সকালেই এই দৃশ্য আর এই শব্দে আকি চমকে যাই। তখনই ঠিক করি, এটাকে আমার ছবির মধ্যে রাখতে হবে।”

    — কথাগুলি লিখছেন স্বয়ং সত্যজিৎ রায় তাঁর ‘অপুর পাঁচালি’ শীর্ষক গ্রন্থে। ঠিক এরকমই ছোটো ছোটো দৈনন্দিন দৃশ্যকল্প তাঁকে ভাবাত। আর তাই তো বারবার সিনেমার টেকনিক্যালিটির মধ্যে পরীক্ষানিরীক্ষা করেও ছবির ন্যারেটিভকে বর্ণনা করতে তিনি সবচেয়ে ভালো পারতেন। কাশীর শুটিং পর্ব নির্বিঘ্নেই শেষ হয়। ‘অপরাজিত’র এই শুটিং পর্ব চলাকালীন সত্যজিৎ রায় একটা দুর্ঘটনা বাধিয়ে বসেন। কাশীতে যেখানে ছবির ইউনিটের থাকার বন্দোবস্ত ছিল, সেখানে একদিন ঘাটের সিঁড়িতে পা হড়কে পড়ে যান। তাতে ডান পায়ের হাঁটু বেশ জখম হয়েছিল। শুটিংয়ের বাদবাকি কয়েকটা দিন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটাচলা করতেন। কলকাতা ফিরেই ছুটলেন ডাক্তারের কাছে। হাঁটু পরীক্ষার শেষে জানা গেল, সাইনোভাইটিস হয়েছে। অর্থাৎ কিনা হাঁটুতে জল জমেছে। পা প্লাস্টার করতে হবে। ফলে সেরে না ওঠা অবধি সব কাজ বন্ধ। এর মধ্যেই চলতে থাকে ষোলো বছরের অপুর খোঁজ। অপুকে নিয়ে তৃতীয় ছবি করার পরিকল্পনা তখনও শুরু হয়নি।

    ‘পথের পাঁচালি’ আর ‘অপরাজিত’র পর দর্শকদের সঙ্গে সঙ্গে সত্যজিৎবাবুরও খুব ইচ্ছা ছিল অপুকে নিয়ে আরও একটি ছবি করবেন— ‘অপুর সংসার’। বিভিন্ন চরিত্রে এমন কাউকে ভাবা হচ্ছে, যাঁরা একেবারে নতুন মুখ, পেশাদার নন। বিশেষ করে অপু, অপুর স্ত্রী অপর্ণা, তাদের ছেলে কাজল এবং অপুর বন্ধু পুলু। বাকি চরিত্রে পেশাদার অভিনেতা থাকলেও অসুবিধা নেই।

    অপু চরিত্রে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়

    ‘অপরাজিত’র শুটিং চলাকালীন কিশোর অপুর চরিত্রে অভিনয়ের জন্য ওই বয়সের একটি ছেলের খোঁজ চলছিল। তখন পোস্ট প্রোডাকশনের ব্যাপারে সত্যজিৎ রায়ের সহকারী নিমাই দত্ত এক তরুণকে নিয়ে যান সত্যজিতের কাছে। সেই তরুণের নাম সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। সত্যজিৎ রায় এ প্রসঙ্গে নিজেই লিখছেন, “চেহারার দিক দিয়ে সৌমিত্র ঠিকই ছিল, কিন্তু চরিত্রটির তুলনায় বয়স একটু বেশি, কুড়ি বছর। সৌমিত্র তখন সদ্য কলেজ থেকে বেরিয়েছে। তাকে সেদিন ফিরিয়ে দিতে হয়েছিল। এবারে তাকে আবার ডেকে পাঠিয়ে প্রধান ভূমিকাটা দিতে চাই। তখন সে রেডিয়োতে ঘোষকের কাজ করে, তবে অভিনয়ে খুব আগ্রহ।”

    অপর্ণা চরিত্রে শর্মিলা ঠাকুর

    এইভাবে তৈরি হলেন একজন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। অভিনয়ের একটা নিজস্ব যুগ। কিন্তু অপর্ণা? কাগজে বিজ্ঞাপন দেওয়া হল। বলা হল, ১৫ থেকে ১৭ বছরের মধ্যে যাদের বয়স, অপুর স্ত্রীর ভূমিকায় অভিনয় করতে ইচ্ছুক হলে তারা যেন তাদের ফটোগ্রাফ পাঠায়। আবেদন এসেছিল হাজারেরও বেশি। কিন্তু রায়বাবুর কাউকেই পছন্দ হল না। বেশ কয়েকদিন পর খবর পাওয়া গেল, চিলড্রেন’স লিটল থিয়েটারের এক অনুষ্ঠানে একটি মেয়েকে নাচতে দেখা গেছে। এ-ও শোনা গেল যে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে নাকি আত্মীয়তার সম্পর্ক আছে। মেয়েটির নাম শর্মিলা ঠাকুর। কিন্তু তাঁকে ডেকে পাঠাতেই তেমন একটা পছন্দ হল সত্যজিতের, বিশেষ করে তাঁর স্ত্রী বিজয়া রায়ের। শর্মিলা সেদিন ছিলেন হলুদ রঙের ফ্রক পরে, চুলে বব-ছাঁট। কিন্তু চোখ মুখের গড়ন একেবারে অপর্ণার মতো। সেই দিন শর্মিলাকে পরানো হল শাড়ি, চুলে ঝুঁটি বেঁধে দেওয়া হল৷ ব্যাস পরমুহূর্তেই সবকিছু ম্যাজিকের মতো কাজ করল। শর্মিলা হয়ে গেলেন আদ্যন্ত অপর্ণা। শর্মিলা সেদিন সত্যজিৎকে বলেছিলেন, “কীভাবে অভিনয় করতে হয়, সেটা কি আপনি দেখিয়ে দেবেন?” উত্তরে সত্যজিৎ বলেছিলেন, “ও নিয়ে তোমায় একটুও ভাবতে হবে না।”

    অপু সিরিজে ‘অপুর সংসার’ সত্যজিৎবাবুর তৃতীয় ছবি। তাঁর মতে ‘থার্ড টাইম লাকি’। এই ছবি পেয়েছিল রাষ্ট্রপতির স্বর্ণপদক। তাছাড়া, বছরের সবচেয়ে মৌলিক চলচ্চিত্র হিসাবে পেয়েছিল ব্রিটিশ ফিল্ম ইন্সটিটিউটের সাদারল্যান্ড ট্রফি। বক্স অফিসেও আসে প্রবল সাফল্য। বাংলা ছবির নায়ক তথা হার্টথ্রব হিসাবে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের আকর্ষণ বেড়ে যায় প্রবলভাবে। শর্মিলা ঠাকুরও মুম্বাইয়ে গিয়ে চলচ্চিত্র দুনিয়ায় বিপুল সমাদর পান। 

    সত্যজিতেরা এই বিস্তীর্ণ মহাকালে একবারই আসেন। আসেন আর ইতিহাস সৃষ্টি করে যান। কারণ সত্যজিৎ রায় বাংলা চলচ্চিত্রকে বিশ্বের মঞ্চে নিয়ে গেছেন বারবার। বারবার সিনেমার আখ্যান এবং দৃশ্যকল্পকে বুনেছেন স্বতন্ত্রভাবে। 

    তথ্যঋণ— অপুর পাঁচালি/ সত্যজিৎ রায়/ আনন্দ পাবলিশার্স/ প্রথম সংস্করণ, জানুয়ারি ১৯৯৫। 

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @