অনুরণন : এক ইচ্ছেপূরণের চাবিকাঠি

ইচ্ছা ঠাকরুনকে মনে পড়ে? ‘ইচ্ছাপূরণ’ নামক রবীন্দ্র গল্পে সেই যিনি অন্যের ইচ্ছে পূরণ করে বেড়ান। কলকাতা শহরে এহেন ইচ্ছা ঠাকরুন ঘুরে বেড়ান কিনা জানা নেই। কিন্তু এ শহরের আনাচে কানাচে রয়েছে অনেক ইচ্ছে। সেগুলো পূরণ হয় না। কত শিশুর জন্মদিনে কেক কাটা হয়নি, কত জন ট্রামে চাপতে পারেনি, কত জন শুধু জাদুঘর দেখার পরিকল্পনা করেই কাটিয়ে দিল! এরা সবাই শিশু নয়। কিন্তু ইচ্ছের বয়স হয় নাকি! শিশু থেকে বৃদ্ধ সকলেরই ইচ্ছেপূরণ দরকার। এই ইচ্ছেগুলো পূরণ করতে অনুরণন নামের একটি সংগঠনের জন্ম হয়েছিল ১৪ বছর আগে।
অনুরণন ছড়িয়ে পড়েছে বাংলার নানা প্রান্তে। কামারপুকুর থেকে সুন্দরবন কিংবা পুরুলিয়া। সর্বস্তরের মহিলা ও শিশু কিশোরের কাছে আনন্দের ঝুলি নিয়ে পৌঁছে যাওয়ার চেষ্টা করেছে এই সংগঠন।
স্বামী বিবেকানন্দের সার্ধ শতবর্ষে রেডিওতে রামকৃষ্ণ মিশন আয়োজিত অনুরণন নামে একটা অনুষ্ঠান হত। সেই অনুষ্ঠানে জীবনে অনেক লড়াই করা মানুষের ইচ্ছে পূরণের যাত্রা শোনানো হত। এই অনুষ্ঠান প্রচারের আগেই অবশ্য, ২০১১ সালে পথচলা শুরু হয়েছিল এই সংগঠনের। ২০১৬ সালে অনুরণনের কাজ পুরোদমে শুরু হয়। অনুরণন সংগঠনের চেয়ারপার্সন তমাল রায় বঙ্গদর্শন.কম-কে বলেন, “শিশুরা যাতে তাদের যোগ্য জায়গায় পৌঁছতে পারে, স্বপ্ন দেখতে পারে, অনুরণন সে চেষ্টাই করে। শিশুদের স্বপ্ন দেখতে উস্কে দেওয়া যায়, ইচ্ছেপূরণ তো করা যায়ই।”
তাই ঠাকুরপুকুর ক্যান্সার হাসপাতালের পেডিয়াট্রিক ওয়ার্ডের শিশুমুখগুলিকে আনন্দে ভরিয়ে দিয়েছিল অনুরণন। সেই দিনটা ছিল ‘ডে অফ জয়’ অর্থাৎ আনন্দের দিন। কচি মুখগুলিকে সারাদিন খাওয়াদাওয়া, খেলনাপাতি, আঁকার সরঞ্জাম ভুলিয়ে দিয়েছিল জীবনের যন্ত্রণার কথা। অনুরণনের উদ্যোগেই ওই হাসপাতালের শিশু বিভাগের নিচের লাইব্রেরিতে দেওয়া হয় উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, সুকুমার রায়, লীলা মজুমদার থেকে হ্যারি পটারের বই, যাতে শিশুরা হাসপাতালে ভর্তি থেকেও সাহিত্যপাঠের আনন্দ থেকে বঞ্চিত না হয়। প্রায় ৩০০ বইয়ের এই সংগ্রহ। এমন পাঠাগার গড়ে উঠেছে পার্ক সার্কাসের ইনস্টিটিউট অব চাইল্ড হেলথ, রামকৃষ্ণ বিবেকানন্দ মিশন আগরপাড়া ওপেন শেল্টার, আলিপুর মহিলা সংশোধনাগারে।
তমালবাবু বলেন, “আজকাল বই পড়ার আগ্রহটা দেখা যায় না। শিশুদের স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে গেলে বই পড়তেই হবে। তাই তাদের চিন্তা-ভাবনাকে মুক্ত করার জন্য আমরা ‘যা ইচ্ছে তাই’ নামের একটা বই প্রকাশ করি। এখানে শিশুদের মানসিক বিকাশের জন্য নানা বিষয় গুরুত্ব সহকারে প্রকাশ করা হয়। প্রথিতযশা লেখক, শিল্পীরা এখানে লেখেন শিশুদের জন্য। আরও কিছু বিষয়ভিত্তিক বই প্রকাশের ইচ্ছে আছে।”
অনুরণন তার কাজের জন্য রোটারি ক্লাব-এর তরফ থেকে পুরস্কার পেয়েছে। সেই পুরস্কারের টাকায় বিভিন্ন জায়গায় পাঠাগার খুলেছে এই সংগঠন।
ট্রামে চেপে কলকাতা ঘুরে বেড়ানোর ইচ্ছে কতজনের পূর্ণ হয়েছে বলতে পারেন? আমার আপনার তেমন ইচ্ছেগুলো দৈনন্দিনতায় হারিয়ে যায়। অনুরণন কিন্তু সেই ইচ্ছেপূরণ করেছে। ক্যান্সার বা থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশু, পথশিশু, যৌনপল্লির শিশুদের ৫-৬টি ট্রামে চাপিয়ে কলকাতা ঘুরে দেখিয়েছে। শিশুদের মাতিয়ে রাখতে উপস্থিত ছিলেন আকাশবাণীর এককালের গল্পদাদুর আসরের কথকরা। শিশুরা এই ট্রামেই কেটেছে কেক। বলা হয়েছিল, তাদের সকলের জন্মদিন উপলক্ষে এই কেক কাটা হয়েছে। এভাবেই অনুরণন নিজের আয়োজনে অনুরণিত করেছে মানুষের ইচ্ছেকে।
অনুরণন ছড়িয়ে পড়েছে বাংলার নানা প্রান্তে। কামারপুকুর থেকে সুন্দরবন কিংবা পুরুলিয়া। সর্বস্তরের মহিলা ও শিশু কিশোরের কাছে আনন্দের ঝুলি নিয়ে পৌঁছে যাওয়ার চেষ্টা করেছে এই সংগঠন। নানাভাবে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। পুরুলিয়ার কিশোরীটিও বাদ পড়েনি। তার জন্যও স্যানিটারি প্যাডের ব্যবস্থা করেছিল অনুরণন। মহিলাদের স্বাস্থ্য সচেতনতার ব্যাপারটাও সংগঠনের সদস্যদের ভাবিয়েছে।
কখনও বাঁকুড়ার কুষ্ঠ কলোনিতে হাজির হয়ে কিছু মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর ব্যবস্থা করেছে এই সংগঠন। কখনও বা শিশুদের নিয়ে তারা গিয়েছে শিক্ষামূলক ভ্রমণে-- জাতীয় গ্রন্থাগার থেকে সাঁতরাগাছির ঝিলে পরিযায়ী পাখি দেখাতে।
তমালবাবু বলেন, “যে শিশুরা নিজেদের পারিপার্শ্বিকতায় আবদ্ধ হয়ে আছে, তা থেকে মুক্ত হয়ে তারা যাতে আনন্দ খুঁজে পায়, সেজন্যই আমরা এ ধরনের উদ্যোগ নিয়েছি। সংশোধনাগারে যেমন খুশি সাজো আয়োজন করেছি। আমাদের সঙ্গে আবসিকরাও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে জুড়ে গিয়েছিলেন।”
প্রতি বছর জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহে শনিবার হয় অনুরণনের বার্ষিক অনুষ্ঠান। এই বছর ৮ জুন এই অনুষ্ঠান হয়ে গেল হৈ-হৈ করে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিল সরকারি হোমের ওপেন শেল্টারের ১৬১ জন ছাত্রছাত্রী। নাটক, ম্যাজিক নিয়ে জমজমাট ছিল সেই আয়োজন।
অনুরণন পরিচালনার জন্য যে অর্থ প্রয়োজন, তা দিয়ে থাকেন সদস্যরাই। বার্ষিক অনুষ্ঠানের পাশাপাশি বিভিন্ন ট্যুর এবং খাওয়াদাওয়ার খরচ তাঁরাই বহন করেন। এঁদের উদ্যোগে সন্তানের জন্মদিন পালনের অনুষ্ঠান বিলাসবহুল কক্ষ থেকে উঠে এসেছে দরিদ্র মানুষের বসতি এলাকায়।
অনুরণন তার কাজের জন্য রোটারি ক্লাব-এর তরফ থেকে পুরস্কার পেয়েছে। সেই পুরস্কারের টাকায় বিভিন্ন জায়গায় পাঠাগার খুলেছে এই সংগঠন। অনুরণনের সদস্যরা মনেই করেন, বই পড়ার আনন্দকে সর্বস্তরে ছড়িয়ে দেওয়া অন্যতম বড়ো কাজ।
এই সংগঠন এগিয়ে চলেছে আরও বড়ো লক্ষ্য অর্জনের দিকে। এখন অনুরণন ‘শিক্ষা দত্তক’ নেওয়ার কথা ভাবছে। কেমন সেই ভাবনা? এদেশের অনেকেই পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে না অর্থের অভাবে। অথচ পড়াশোনা করার ষোলআনা ইচ্ছে আছে তাদের। এই পড়ুয়াদের পড়াশুনোর ব্যয়ভার দত্তক নিয়ে বহন করতে চায় অনুরণন অর্থাৎ শিক্ষার দায়িত্ব নিতে চায়।
জ্ঞান ও আনন্দের এমন আশ্চর্য সমন্বয় ঘটিয়েছে যে সংগঠন, তাদের ইচ্ছে অনুরণিত হোক সবার বুকে, এ তো সক্কলের প্রার্থনা।